• পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব: বিশ্বখ্যাত ফার্সি সাহিত্য ও এর পথিকৃৎ

ইরানিরা সাহিত্য ও কাব্য প্রেমিক। প্রাচীন যুগ থেকেই কবিতা ও কাব্য ইরানিদের হাড়-মজ্জায় মিশে আছে।

ইরানে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাসের দিকে তাকালে ফিরে যেতে হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ সালে। এ সময় ইরানের হাখামানেশিয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। আলেকজান্ডার ইরান আক্রমণ করে দেশটির জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপরও চালান আগ্রাসন। সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়ক ইরানি পণ্ডিতদের যেসব বই আলেক্সান্ডারের কাছে ভালো লাগতো তা তিনি গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করিয়ে নিতেন এবং এরপর মূল ফার্সি বই ধ্বংস করে ফেলতেন।

 

কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছুকালের মধ্যেই ইরানি জ্ঞানী-গুণিরা আবারও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে চালকের আসনে আসীন হন। ইসলাম-পূর্ব যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য সংস্কৃতিতে ইরানিরা এতোটা এগিয়ে ছিল যে তা নবীন ইসলামী সভ্যতাকেও করেছে প্রভাবিত। ইসলাম-পূর্ব যুগের ইরানি কাব্য ও সাহিত্যের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে প্রাচীন কিলকিয় ভাষা, পাহলভি, আভেস্তা ও আরামি বা ইরামি ভাষায়।

 

ইসলামী যুগে ইরানি জ্ঞানী-গুণীদের অনেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য আরবিতে চর্চা শুরু করেন। তবে ইরানি সাফারিয় এবং সামানিয় শাসকদের আবির্ভাবের পর ইরানী শাসক এবং কবি সাহিত্যিকরা আবারও ফার্সি সাহিত্য-চর্চায় মশগুল হ ফলে ফার্সি ভাষা তার হারানো ঐশ্বর্য পুনরায় ফিরে পায় 

 

সামানীয়দের শাসনকালে সাহিত্য-ধর্মীয় ও বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ রচনা এবং অনুবাদের ব্যাপকতা দেখা দেয়। ফার্সি ভাষায় অনূদিত কালীলা ও দেমোনার নাম বলা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে সামানীয় শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় রুদাকি সামারকান্দি ফার্সি ভাষার শক্তিমান কবিতার ঝাণ্ডা হাতে তুলে নেন এবং ফার্সি কবিতার হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করে ফার্সি কবিতার জনক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। এ সময় আরো দুই বিখ্যাত কবির আবির্ভাব ঘটে। একজন হলেন ফেরদৌসী এবং অপরজন হলেন আনসারী।

 

আবু আবদুল্লাহ জাফর বিন মুহাম্মাদ রুদাকির জন্ম হয়েছিল সমরকন্দের রুদাক নামক পার্বত্য অঞ্চলে। বর্তমানে এটি পূর্ব উজবেকিস্তানের অংশ। হিজরি তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে বা খ্রিস্টিয় নবম শতকে তার জন্ম হয়েছিল বলে মনে করা হয়। প্রায় একই সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্ব-বিখ্যাত দুই ইরানি মনীষী জাকারিয়া রাজি ও আবু নাসের ফারাবি।  রাজি হলেন চিকিৎসক ও ফারাবি হলেন দার্শনিক।

 

রুদাকির জীবনী,তাঁর পড়ালেখা এবং সামারকান্দ থেকে বোখারায় তিনি কীভাবে এলেন-এইসব বিষয়ে যথাযথ কোনো তথ্য পাওয়া যায় না । রুদাকি সম্পর্কে লেখক মোহাম্মাদ আওফির কাছে কিছু তথ্য ছিল। তিনি রুদাকির তিন শতাব্দী পরের লেখক । আওফি তাঁর লুবাবুল আলবাব নামক গ্রন্থে রুদাকি সম্পর্কে লিখেছেন,রুদাকি শৈশবে খুবই মেধাবি ও তীক্ষ্ম বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল ভীষণ প্রখর । মাত্র আট বছর বয়সেই তিনি পুরো রআন শরীফ হেফ্জ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি কাব্য চর্চা শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠস্বরও ছিল আকর্ষণীয়। তিনি চাঙ্গ নামের প্রাচীন ইরানি বাদ্যযন্ত্রও খুব ভালোভাবে বাজাতে পারতেন। 

 

রুদাকি ছিলেন তাঁর সমকালীন শ্রেষ্ঠ কবি ও সঙ্গীতবিদ। তাঁর কবিতা আবৃত্তি এবং সঙ্গীত চর্চার কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। খোরাসানের তৎকালীন শাসক নাসর সামানী রুদাকির কাব্য ও সঙ্গীত প্রতিভার কথা শুনে তাঁকে রাজদরবারে আমন্ত্রণ জানান। সে সময় অবশ্য সঙ্গীতের সাথে কবিতার দূরত্ব বা পার্থক্য তেমন ছিলো না বললেই চলে। কেননা কবিতাও সে সময় মিউজিক সহযোগেই উপস্থাপিত হতো। তার মানে কবিতা তখন পড়া নয় গাওয়া হতো । তাই যেসব কবি মিউজিক জানতেন না, তাঁরা নিজেদের কবিতা চর্চার জন্যে বিশেষ করে প্রশংসাগীতির জন্যে কাউকে নিয়োগ দিতেন,এদেরকে রাভি বলা হতো । এই রাভিগণ কবিতাকে মিউজিক সহযোগে গাইতেন। কিন্তু রুদাকি তৎকালীন কবিতার অনিবার্য এই দুটি বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে ছিলেন প্রাজ্ঞ। তাই তিনি নিজেই কবিতা লিখতেন,আবার নিজের লেখা কবিতা মিউজিক সহযোগে নিজেই গাইতেন।

 

সামানীয়দের রাজদরবারে আসার পর রুদাকি সামানী রাজবংশের তৃতীয় বাদশাহ নাস সামানীর প্রিয়ভাজন হন । তিনি তাঁর প্রশংসামূলক গীতিকাব্যে নাস ইবনে আহমাদের নাম বি শেষভাবে উল্লেখ করেন । এ সময় রুদাকি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মন্ত্রী আবুল ফাযল বালামি'র মতো মহান ব্যক্তিদের সাথে পরিচিত হন। তৎকালীন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী,কবি ও দার্শনিক শাহিদ বালখি এবং আবুল হাসান মুরাদির সাথেও রুদাকির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে 

 

রুদাকি তার কবিতায় ফার্সি ভাষাকে বেশ নিপুনভাবে ব্যবহার করেছেন। রুদাকির কবিতাগুলো যুগ যুগ ধরে ফার্সি ভাষার অভিধানেও প্রবাদ বাক্যের মতই ব্যবহৃত হয়েছে। রুদাকি আরবি কবিতার রীতি ও আরবি ভাষা সম্পর্কেও যথেষ্ট পাণ্ডিত্য রাখতেন। ইসলাম-পূর্ব যুগের নানা জাতি, তাদের কবিতা ও সাহিত্য এবং নানা ধর্ম সম্পর্কেও ব্যাপক জ্ঞান রাখতেন রুদাকি। তার কবিতাগুলো পড়লেই এইসব বিষয়ে তার অসাধারণ জ্ঞানের বিষয়টি ফুটে ওঠে।

 

রুদাকি বেশ সম্পদশালী ছিলেন। তাঁর এই সম্পদ কবিতা এবং মিউজিক থেকেই অর্জিত হয়েছিল । কবিতার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বেশ সমৃদ্ধির অধিকারী । তাঁর সমকালে তাঁর সাথে তুলনা করা যায় এমন কোনো কবি ছিলেন না । আবু আব্দুল্লাহ জাফর ইবনে মোহাম্মাদ রুদাকি বয়সের চাপে অর্থাৎ বার্ধক্য জনিত কারণে এবং চোখে দেখতে না পারার কারণে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে খুব কষ্টে জীবনপাত করেছিলেন। অবশেষে ৩২৯ হিজরী মোতাবেক ৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে রুদাকেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন#

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/৪

২০১৭-১২-০৪ ১৭:৪৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য