কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা লুকমানের ১৪ থেকে ১৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ (14)

“আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। এবং তার দুধ ছাড়ানোর বয়স দু’বছর। (আমি তাকে এ নির্দেশ দিয়েছি যে) আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (তোমাদের সবাইকে) অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।" (৩১:১৪)    

গত পর্ব থেকে সন্তানের প্রতি হযরত লুকমানের উপদেশাবলী বর্ণনা শুরু হয়েছে। হযরত লুকমান পিতার স্নেহ দিয়ে সন্তানকে উপদেশ দিতেন এবং তাকে শিরক থেকে বিরত থাকতে বলতেন। এই দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা প্রথমে সন্তানকে পিতামাতার মর্যাদা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিয়েছেন এবং এরপর সন্তান প্রতিপালনে পিতামাতার ভূমিকার কথা জানিয়েছেন।

এই আয়াতে আরো বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ পিতা এবং মাতা দু’জনেরই সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, এই দুনিয়াতে কোনো সন্তানের আগমনের পেছনে পিতা-মাতা দুজনেরই ভূমিকা থাকে। মায়ের গর্ভে সন্তানের ভ্রুণ সৃষ্টিতে পিতা-মাতা দু’জনেরই ভূমিকা থাকলেও এরপর নয় মাসের গর্ভধারণ এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশুকে দুই বছর দুধ খাওয়ানোর দায়িত্ব মাকে একাকেই পালন করতে হয়।

যখন একটি শিশু সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকে তখন মা তাকে বুকের দুধ পান করিয়ে- প্রাণের সব মমতা ঢেলে দিয়ে সন্তানকে একটু একটু করে বড় করে তোলেন। নবজাতককে জন্ম দিতে এবং এরপর দুই বছর তাকে দুধ খাওয়াতে গিয়ে মায়ের অসহনীয় কষ্ট হয় এবং তিনি এজন্য দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এ কারণে আয়াতের পরবর্তী অংশে বিশেষভাবে মায়ের পরিশ্রম ও কষ্টের কথা উল্লেখ করে সন্তানকে বলা হচ্ছে, মায়ের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হবে। কাজেই, আমাদেরকে সার্বিকভাবে সব নেয়ামতের জন্য মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে ঠিকই, সেইসঙ্গে পিতামাতার অনুগ্রহের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের আয়াতে সরাসরি পিতামাতার প্রতি যত্নবান ও তাদের প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

১. পিতামাতার প্রতি সম্মান দেখানো মানুষের মানবিক দায়িত্ব। কাজেই কোনো নও মুসলিম সন্তানের পিতামাতা যদি কাফেরও হয় তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। কাফের পিতামাতার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অনুমতি ইসলাম দেয়নি।

২. ইসলামে মায়ের মর্যাদা অতুলনীয়। সন্তানের জন্ম থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত মায়ের পরিশ্রম ও কষ্টের কথা বিবেচনা করে এই মর্যাদা তাকে দেয়া হয়েছে।

৩. তবে তারপরও আমাদের জীবনযাপনে পিতামাতার চেয়ে মহান আল্লাহর অবদান যে বেশি সেকথাও ভুলে গেলে চলবে না। পিতামাতার প্রতি কর্তব্য করতে গিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি যেন উদাসীন হয়ে না যাই সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

সূরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (15)

“এবং পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে,আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জানাবো।” (৩১:১৫)

আগের আয়াতের সূত্র ধরে এই আয়াতে সন্তানের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলা হচ্ছে, পিতামাতার প্রতি সদ্ভাবের অর্থ এই নয় যে সন্তান তার বিচারবুদ্ধিকেও পিতামাতার হাতে ন্যস্ত করবে। পিতামাতা যা নির্দেশ দেবে চোখ-কান বন্ধ রেখে তা মেনে নেয়া যাবে না।  যেসব অভিভাবক ভ্রান্ত মতবাদ অনুসরণ করে এবং আল্লাহর সঙ্গে অন্য ব্যক্তি বা বস্তুকে শরীক করে তারা তাদের সন্তানকেও একই পথ অনুসরণ করানোর চেষ্টা করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহ এটা পছন্দ করেন না। অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ককে ব্যবহার করে পিতামাতা তাদের ভ্রান্ত ধারণা সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেবেন- তা আল্লাহ চান না। এমনকি অভিভাবক যদি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করেও দেয় তারপরও তাদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা যাবে না।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে, পিতামাতা মুশরিক হলে তাদের আকিদা বা বিশ্বাস গ্রহণ করা না গেলেও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার চালিয়ে যেতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পিতামাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার অধিকার ইসলাম দেয়নি। বরং তারা যতদিন বেঁচে থাকেন ততদিন তাদের প্রতি সম্মান জানাতে হবে এবং তাদের সঙ্গে উগ্রভাবে কথা বলা যাবে না। মুশরিক পিতামাতার বিচার করার দায়িত্ব মহান আল্লাহর। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। কাজেই তার দায়িত্ব যেন কোনো সন্তান নিজের কাঁধে তুলে না নেয়।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. পিতামাতার আনুগত্য শর্তসাপেক্ষ, চিরন্তন নয়। তাদের নির্দেশ ততক্ষণ পর্যন্ত মানা যাবে যতক্ষণ তা আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধে না যায়।

২. পূর্ব-পুরুষরা ভুল করে এসেছেন বলে আমাদেরকেও সে ভুল পথের অনুসরণ করতে হবে এমন কোনো কথা নেই বরং বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে এবং ইসলামের দিকনির্দেশনার সঙ্গে তাকে মিলিয়ে দেখতে হবে। পূর্বপুরুষরা ভুল করে থাকলে তা পরিহার করে সঠিক পথ অনুসরণ করতে হবে।

৩. অমুসলিমদের সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা যাবে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস আমাদের ওপর প্রভাব না ফেলে এবং আমরা তাদের বিশ্বাসকে অনুসরণ করতে শুরু না করি।

সূরা লুকমানের ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِي صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ لَطِيفٌ خَبِيرٌ (16)    

“হে আমার সন্তান! কোন বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি পাথরের ভেতরত অথবা আকাশে কিংবা ভূ-গর্ভেও (লুকায়িত) থাকে, তবে আল্লাহ তা (কিয়ামতের দিন হিসাব নিকাশের জন্য) উপস্থিত করবেন। কারণ, আল্লাহ গুপ্ত বিষয় জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।” (৩১:১৬)

মানুষ সাধারণত নিজের কাজের হিসাবনিকাশ করার সময় বড় কাজগুলোকে বিবেচনা করে। ছোটখাটো বিষয়কে সে ভুলে যায় বা উপেক্ষা করে। অথচ ছোট ছোট কাজের পুনরাবৃত্তি মানুষকে  বড় কিছু করার অনুপ্রেরণা যোগায়। এই কথা ভালো এবং মন্দ দুই ধরনের কাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে ছোট ছোট কাজের গুরুত্ব  বড় কাজের তুলনায় কোনো অংশ কম নয়।

এই আয়াতে সন্তানের প্রতি হযরত লুকমানের বক্তব্য সরাসরি তুলে ধরে তার উচ্চারণে বান্দার কাজের হিসাব নেয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর সক্ষমতার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তোমার কাজ ছোট বা বড় কিংবা গোপন বা প্রকাশ্য যেরকমই হোক না কেন, তার হিসাব আল্লাহ নেবেন। এমনকি ক্ষুদ্রতম কাজ যদি পৃথিবীর গোপনতম স্থানেও করা হয় সে খবরও আল্লাহ জানেন। কিয়াতমের বিচারের দিনে মহান আল্লাহ সেসব কাজ প্রকাশ করে দেবেন এবং তার ভিত্তিতে বান্দাকে পুরস্কার অথবা শাস্তি দেবেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কিয়ামতের বিচার দিবসের ব্যাপারে সন্তানকে হুঁশিয়ার করে দেয়া প্রতিটি পিতামাতার অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব।

২. মহান আল্লাহ আমাদের ছোট-বড় সব কাজ সম্পর্কে জানেন। কিয়ামতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং সেদিন মহান আল্লাহর বিচার করার ক্ষমতার কথা স্মরণ করলে ভ্রান্ত পথে থাকা মানুষ সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে।

৩. মানুষের আমল ধ্বংস হয়ে যায় না বরং কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ তা সঙ্গে করে বয়ে নিয়ে চলে।#

২০১৭-১২-০৭ ১৭:৫১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য