• নূরনবী মোস্তফা (সা.) : পর্ব ৪১

ইসলামের শত্রুরা কেবল অন্ধ একগুয়েমী ও হিংসার কারণেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর প্রচারিত পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননা করছে৷

পাশ্চাত্যের তরফ থেকে ইসলাম ও বিশ্বনবী (সাঃ)'র এতো অবমাননা এবং এ ধর্মের বিস্তার প্রতিরোধের জন্যে এতো অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও মানবজাতির সর্বোত্তম কল্যাণের দিশারী বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রতি জনগণের সম্মান কমেনি বরং তা বেড়েই চলেছে৷

একইসাথে ইসলামের প্রতি জনগণের আকর্ষণও বৃদ্ধি পাচেছ৷ অন্যকথায় বিশ্বনবী (সাঃ)'র পুত-পবিত্র চরিত্র এবং তাঁর অসাধারণ মহতী গুণাবলীকে কালিমালিপ্ত করার জন্যে আধুনিক যুগের আবু জাহেল ও আবু লাহাবদের ষড়যন্ত্রগুলো অতীতের মতোই ব্যর্থ হয়েছে৷

যেসব লোক অপরিচছন্ন ও সংকীর্ণ চিন্তাধারায় অভ্যস্ত এবং নৈতিকতা ও যুক্তির ধার ধারে না, তারা সাধারণতঃ অন্যদেরকেও বিশেষ করে মহাপুরুষকেও নিজের মতোই খারাপ, যুক্তি-বিরোধী ও অপবিত্র মনে করে৷ ইরানী প্রবাদবাক্যে বলা হয় একজন অবিশ্বাসী বা কাফের অন্যদেরও কাফের মনে করে৷ অন্যদিকে যারা সত্যসন্ধানী, যুক্তিবাদী ও চিন্তাশীল তারা মানব জাতির পথ প্রদর্শক ও মহান ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করে থাকেন৷ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক অমুসলিম লেখক, গবেষক, মনিষী ও চিন্তাবিদ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র সম্পর্কে নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রকৃত বা বস্তুনিষ্ঠ এবং বিদ্বেষমুক্ত মতামত তুলে ধরেছেন৷

গত অনুষ্ঠানে আমরা এ ধরনের কয়েকজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের মতামত তুলে ধরেছি৷ আজও আমরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র নূরাণী ও তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধরনের আরো কয়েকজন খ্যাতনামা অমুসলিম ব্যক্তিত্বের মতামত তুলে ধরবো৷ পাশ্চাত্যের বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর. এফ. বুডলি মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবনী শীর্ষক বইয়ে মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদের নিন্দা করে লিখেছেন, মুহাম্মাদের জীবনী সংক্রান্ত একটি বই পড়েছি৷ এ বইয়ের লেখক যে কখনও বৃটেনের বাইরে পা রাখেন নি তা খুবই স্পষ্ট৷ কারণ, তিনি শুধু গীর্যাকে রক্ষার জন্যেই লিখেছেন৷ তিনি তার তিনশ পৃষ্ঠার বইটিকে অন্যায্য কথা দিয়ে কলংকিত করেছেন৷

এ লেখক তার বইটিতে মুহাম্মাদের নাম নিতে গিয়ে দজ্জাল শব্দটি ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করেন নি৷ অথচ লেখক এ বিষয়েরও কোন ব্যাখ্যা দেন নি যে এরকম একজন ব্যক্তি কী করে মানবজাতির অগ্রগতির জন্যে এত উন্নত ও সমৃদ্ধ বিধান দিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন? তিনি কিভাবে এমনসব মানুষকে গড়ে তুলেছেন যারা অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে এক বিশাল ও উন্নত সভ্যতার গোড়াপত্তন করতে এবং প্রথম দিকেই বড় বড় জাতিগুলোকে নিজেদের সাথে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন? মিস্টার বুডলি আরো লিখেছেন, মরূচারী এবং বেপরোয়া জীবনে অভ্যস্ত দূর্দান্ত আরবদের অনুগত করতে পারাটা মুহাম্মাদের অন্যতম বিস্ময়কর সাফল্য৷

এ বিষয়টিকে তার সবচেয়ে বড় মো'জেজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর সমতুল্য বলা যায়৷ তিনি সব আরব গোত্রকে বিস্ময়কর সূত্রে ঐক্যবদ্ধ করেন৷ মুহাম্মদের জীবনী নিয়ে চিন্তা করলে চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার ব্যাপারে বিস্ময়ে হতবাক হতে বাধ্য এবং তারা মুহাম্মাদকে এক চিরঞ্জীব ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পান৷

 বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে বৃটেনের চিন্তাবিদ টমাস কার্লাইল বলেছেন, বর্তমান যুগের একটা বড় ত্রুটি হলো এ যুগের সুসভ্য মানুষ এমন কিছু লোকের কথা শুনছে যারা মনে করেন ইসলাম মিথ্যা ধর্ম এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) একজন প্রতারক! এ ধরনের ভিত্তিহীন ও লজ্জাজনক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সময় এসেছে৷ কারণ যে ধর্ম-বিধান ও মিশন মুহাম্মাদ (সাঃ) এনেছেন তা শত শত বছর ধরে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার মতো আলো ছড়িয়ে দিচেছ৷ ভ্রাতৃবৃন্দ!

আপনারা কি কখনও এমন কাউকে দেখেছেন যে একজন মিথ্যাবাদী ব্যক্তি একটি নতুন ধর্ম প্রনয়ন করতে এবং একই সাথে ঐ ধর্মকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে? প্রভুর শপথ, এ ধরনের অপবাদ খুবই অদ্ভুত বা বিস্ময়কর! কারণ একজন অজ্ঞ ব্যক্তি একটি ঘর নির্মাণেরও ক্ষমতা রাখে না, অথচ এমন অজ্ঞ ব্যক্তি ইসলামের মতো এক ধর্মকে মানব সমাজে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলেন? কার্লাইল আরো লিখেছেন, এটা খুবই বড় ধরনের সমস্যা ও দুঃখ যে বিশ্বের জাতিগুলো যুক্তি ও প্রজ্ঞা ছাড়াই এ ধরনের অপবাদ মেনে নিচেছ৷

আমি বলবো এটা অসম্ভব যে এই মহান ব্যক্তি তথা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বাস্তবতা বা সত্য-বিরোধী কথা বলেছেন৷ তাঁর জীবন-ইতিহাসে দেখা যায় তিনি যৌবনকাল থেকেই জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ছিলেন৷ রাসূলে পাক (সাঃ)'র সমগ্র জীবন ও সুন্দর গুণাবলীসহ তাঁর সমস্ত তৎপরতা ছিল সত্য ও পবিত্রতা ভিত্তিক৷ আপনারা তাঁর বাণীর দিকে লক্ষ্য করুন- তাঁকে কবি বা নবী যা-ই মনে করুন- তাঁর বাণীকে কি অনুপ্রেরণা ও খোদায়ী প্রত্যাদেশ মনে হয় না? এই মহান ব্যক্তি অস্তিত্বের অসীম উৎসের বার্তাবাহক বা রাসূল যিনি মানুষের জন্যে বার্তা বয়ে এনেছেন৷ বিধাতাই এই মহাপুরুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিখিয়েছেন৷" অমুসলিম চিন্তাবিদ বা মনীষীরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে এটি উল্লেখ করেছেন যে মূলতঃ অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং উন্নত ধর্মের কারণেই রাসূলে পাক (সাঃ)'র নাম বিশ্বে অমরত্ব বা স্থায়ীত্ব লাভ করেছে৷

পবিত্র কোরআন ও এর প্রাণসঞ্জীবক শিক্ষা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবন ও আত্মার মর্মমূলে প্রবেশ করেছিল এবং তিনি ছিলেন আদর্শ ও সর্বোত্তম মানুষের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷ রাসূলে পাক (সাঃ) তাঁর বিচক্ষণ দৃষ্টির মাধ্যমে এ বিশ্ব জগতের বাহ্যিক পর্দা বা আবরণের আস্তর ভেদ করে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারতেন৷ তিনি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপূর্ণতা ও সচেতনতার অধিকারী৷ তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল পুরোপুরি যথাযথ এবং তিনি মানবজাতির মুক্তির জন্যে সবচেয়ে ভালো কর্মসূচী উপহার দিয়েছেন৷

তাঁর অনুসারীরা ছিল নিষ্ঠাবান ও পবিত্র৷ পবিত্র অন্তর ও আলোকিত চেহারা নিয়ে তারা রাসূলে পাক (সাঃ)'র পাশে বসবাস করতেন৷ আসলে বুদ্ধিবৃত্তি বা বিবেকের সাথে ইসলামের সঙ্গতি থাকাতেই এই মহান ধর্মের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত কল্যাণ মানুষকে প্রভাবিত করেছে৷ বিখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ জন ডেভেনপোর্ট বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An apology for Muhammad And Quraan,বা মুহাম্মাদ (সাঃ) ও কোরআনের কাছে ক্ষমা শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, যারা ইসলামের নবী (সাঃ) সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করছে তাদের জেনে রাখা উচিত বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে তাঁর অধ্যাবসায় ও দৃঢ়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ আর এ বিষয়টিকে তিনি তাঁর জীবনের লক্ষ্যবস্তুতে বা টার্গেটে পরিণত করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নে অসাধারণ জোর দিতেন৷ আর এ কারণে সবাই তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য হন৷

এছাড়াও যারা মনে করেন, ইসলামের নবী (সাঃ) তরবারীর মাধ্যমে তাঁর ধর্ম ছড়িয়ে দিয়েছেন, তারা মারাত্মক ভুল করছেন৷ কারণ সকল পর্যবেক্ষক ও চিন্তাবিদ অত্যন্ত স্পষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে এ সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন যে মুহাম্মাদ (সাঃ) রক্তপাত বা সহিংসতার অবসান ঘটিয়েছিলেন৷ তিনি মানুষকে দেব-দেবী বা মূর্তির জন্যে হত্যার বা উৎসর্গ করার প্রথা বাতিল করে মানব জাতির জন্যে নামাজ ও যাকাতের প্রথা চালু করেছেন এবং তাঁর ধর্ম স্থায়ী যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে মানুষের আত্মায় সঞ্চারিত করেছে কল্যাণকামীতা, মানবপ্রেম ও সামাজিক গুণাবলীর চেতনা৷

জন ডেভেনপোর্ট তার বইয়ের একটি অধ্যায়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ওপর আরোপিত অপবাদগুলোর জবাব দিয়েছেন৷ তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, হিজাজ বা গোটা আরব ভূখন্ড মূর্তি পূজার মতো ক‚প্রথায় নিমজ্জিত ছিল৷ মুহাম্মাদ (সাঃ) এই ভূখন্ডে আমূল ও স্থায়ী সংস্কার সাধনের মতো অসাধ্য সাধন করেন৷ তিনি শিশুদের হত্যা করা ও কণ্যা শিশুদের জীবন্ত কবর দেয়াকে নিকৃষ্ট ও অপছন্দনীয় বলে মনে করতেন এবং মদপান ও জুয়া খেলাকে নিষিদ্ধ করেন৷ আর এ ধরনের ব্যক্তিত্বের রেসালাত কি তার নিজের আবিষকৃত হতে পারে? মুহাম্মাদ (সাঃ) কখনও দুনিয়ার ক্ষমতা ও দুনিয়াবী শান-শওকতের প্রত্যাশী ছিলেন না৷

তিনি মানুষকে ন্যায়সঙ্গত আচার-আচরণ করতে বলতেন৷ তিনি মানবিকতা, দয়া ও উদারতার প্রেমিক ছিলেন৷ নিঃসন্দেহে পৃথিবী মুহাম্মাদের (সাঃ) মতো পবিত্রতম ও দূর্লভ ব্যক্তিত্ব আর সৃষ্টি করতে পারে নি৷ তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে মহত ও অতুলনীয় মহান ব্যক্তিত্ব বলে মেনে নেয়া উচিত এবং পৃথিবী তাঁর এই মহত্তম সন্তানকে নিয়ে সব সময়ই গর্ব করতে পারে৷ শ্রোতা ভাই-বোনেরা আমরাও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র শানে মহান আল্লাহর পর সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে উপযোগী প্রশংসা নিবেদন করে আজকের এই আলোচনা শেষ করছি এবং সত্যের পথে চলার ব্যাপারে রাসূলে পাক (সাঃ)'র মদদ বা সাহায্য কামনা করছি৷#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/আবু সাঈদ/ ২৭

২০১৭-১২-২৭ ১৯:৫৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য