ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকেই নামাজ আদায় করা ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক কাজে মসজিদ ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

মুসল্লিদের পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময়, একে অপরের  খোঁজ খবর নেয়া, মুসলিম বিশ্বের খবরাখবর জানা ইত্যাদি কাজ মসজিদেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। এখানেই একজন মুমিন আরো অনেক মুসলমানের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। ধর্মকর্ম পালন এবং আল্লাহর ইবাদতের দিক দিয়ে একই পর্যায়ের এই মানুষগুলোর মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয় মসজিদ।

সামাজিক জীবনে প্রতিটি মানুষেরই ভালো বন্ধু প্রয়োজন।  ভালো বন্ধু জীবনে চলার সাথী এবং দুঃখের দিনগুলোর সহমর্মী।  মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্যও একজন মানুষের ভালো বন্ধু প্রয়োজন। এ ছাড়া, বন্ধুর মাধ্যমে মানুষের সামাজিক অবস্থান প্রকাশ পায়। যেসব স্থানে ভালো ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে মসজিদ সর্বোত্তম। মসজিদে গিয়ে ঈমানদার মানুষেরা আল্লাহর নেক বান্দাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পায়। নিয়মিত মসজিদে যাতায়াতকারী এবং সুন্দর স্বভাবের মানুষ যে ভালো বন্ধু হওয়ার যোগ্য সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আলেমদের মতে, ভালো বন্ধু একজন মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিমে চলতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।  হাদিসে মুমিন ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, তাদের খোঁজ-খবর নেয়া এবং পরস্পরের প্রয়োজনে একে অন্যকে সাহায্য করার ওপর যথেষ্ট তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর মসজিদকে কেন্দ্র করে এই কাজগুলো করা হলে মুমিন ব্যক্তিদের মধ্যে একটি ভালো সামাজিক বন্ধন গড়ে ওঠে।  ইমাম আলী (আ.) নিয়মিত মসজিদে যাতায়াতের ৮টি সুফলের কথা উল্লেখ করেছেন যার প্রথমটি হচ্ছে দ্বীনি ভাই খুঁজে পাওয়া যিনি মানুষকে ঈমানের পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করবেন।

ভালো মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়া সম্ভব হলে মানুষ যদি আধ্যত্মিক দিক দিয়ে এতটা উন্নত নাও হয় যে, আল্লাহর ভয়ে খারাপ কাজ ত্যাগ করছে তাহলে অন্তত বন্ধুরা খারাপ বলবে- এই চক্ষুলজ্জার কারণেও মানুষ খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকে।  ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন, মসজিদে যাতায়াতকারী ব্যক্তি তিনটি সুফল নিয়ে মসজিদ থেকে ঘরে ফেরে। এর একটি হচ্ছে, সে এমন বন্ধু খুঁজে পায় যে তাকে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা কায়রোর প্রখ্যাত মসজিদ রা’সাল হোসেইনের সঙ্গে পরিচিত হব।  কায়রো শহরের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হচ্ছে রা’সাল হোসেইন মসজিদ যেটি মিশরবাসীর কাছে মাশহাদে রা’সাল হোসেইন (আ.) নামে বেশি পরিচিত। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সা.)’র দৌহিত্র ইমাম হোসেইন (আ.)’র মস্তক মুবারককে বিভিন্ন শহরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জনসমক্ষে প্রদর্শন করার নির্দেশ দেয় ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া। তার উদ্দেশ্য ছিল নিজের সেনাবাহিনীর বিজয়কে জনগণের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা। এভাবে এক শহর থেকে আরেক শহর ঘুরিয়ে অবশেষে মিশর ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী আসকালন শহরে এসে ইমাম হোসেইনের মস্তক মুবারকের প্রদর্শনী শেষ হয়।

আসকালনের গভর্নর ওই মস্তক ওই শহরেই দাফন করেন। পরবর্তীতে ফাতেমীয়রা মিশরের ক্ষমতায় আসার পর ওই মস্তক মুবারককে যথোপযুক্ত সম্মানের সঙ্গে আসকালন থেকে কায়রোয় নিয়ে আসা হয়। এরপর খলিফার দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ওলামা ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা মিলে এই মস্তক মুবারক অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দাফন করেন। দাফনের স্থানটিতে নির্মিত হয় রা’সাল হোসেইন মসজিদ। বর্তমানে এখানে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল হওয়ার পাশাপাশি এটি জিয়ারতের জন্য সমবেত হন হাজার হাজার শিয়া ও সুন্নী মুসলমান।

ফাতেমীয় খলিফাদের শাসনামল শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে এই মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও এর প্রসার ঘটানো হয়েছে। মসজিদটির বর্তমান মেহরাব ১৩০৩ হিজরিতে সাদা ও লাল পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়। এই মসজিদের একমাত্র মিনার এটির পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত।  রা’সাল হোসেইন মসজিদে তিনটি দরজা রয়েছে যার একটি মসজিদের পশ্চিম দিকে, একটি পূর্বদিকে এবং তৃতীয়টি মসজিদের ওজুখানার ওপর স্থাপিত।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে কায়রোর সাইয়্যেদা জয়নাব মসজিদ সম্পর্কে খানিকটা আলোচনা করব। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার পর ইমাম হোসেইন (আ.)’র বোন বিবি জয়নাব সালামুল্লাহি আলাইহাকে বন্দি করে সিরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার বন্দিদশা শেষ হওয়ার পর বিবি জয়নাব বেশিদিন বেঁচে থাকেননি।  কারবালার ময়দানে তিনি যে নৃশংসতা দেখেছিলেন তা সহ্য করা একজন নারীর পক্ষে কঠিন।  প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ৬২ হিজরিতে অর্থাৎ ইমাম হোসেইন (আ.) শহীদ হওয়ার পরের বছরই ইন্তেকাল করেন। তাঁর পবিত্র কবর কোথায় অবস্থিত তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতান্তর রয়েছে। 

কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন, সিরিয়া থেকে বিবি জয়নাবকে মদীনায় পাঠিয়ে দেয়ার পর মদীনার জনগণ ইমাম হোসেইনের জন্য শোকপালন শুরু করেন এবং উমাইয়া শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনরোষ ফুঁসে উঠতে থাকে। এ অবস্থায় মদীনার গভর্নর ইয়াজিদের কাছে চিঠি লিখে মদীনার পরিস্থিতি বর্ণনা করে তাকে জানান যে, হযরত জয়নাব (সা.আ.) সাধারণ মানুষকে শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। চিঠির উত্তরে ইয়াজিদ মদীনার গভর্নরকে নির্দেশ দেয় ওই শহর থেকে বিবি জয়নাবকে বহিস্কার করতে।  এ অবস্থায় হযরত জয়নাব (সা. আ.) মদীনা ছেড়ে মিশরে চলে যান। সে সময় মিশর আহলে বাইত প্রেমীদের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। বিবি জয়নাব মিশরেই বসবাস করতে থাকেন এবং ৬২ হিজরির রজব মাসে ধুলির ধরা ত্যাগ করেন। এই বর্ণনায় এসেছে, আজ যেখানে সাইয়্যেদা জয়নাব মসজিদ অবস্থিত সেখানেই সমাহিত রয়েছেন ইসলামের এই মহীয়সী নারী।

এই মসজিদ নির্মাণ সম্পর্কে ইতিহাসে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হলো, ৮৫ হিজরিতে হযরত জয়নাবের কবরের ওপর প্রথম একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দিতে কায়রোর গভর্নর ফাখরুদ্দিন জাফারি এই মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও এটির আয়তন বৃদ্ধি করেন।  হিজরি দশম শতাব্দিতে তৎকালীন ওসমানীয় বাদশাহ সুলতান সালিমের শাসনামলে মিশরের গভর্নর মসজিদটিকে মেরামত করেন।  ১১৭৪ হিজরিতে সাইয়্যেদা জয়নাব মসজিদটি আরেকবার পুনর্নির্মাণ করেন মিশরের রাজ দরবারের অন্যতম সম্ভ্রান্ত পারিষদ আব্দুর রহমান কাদখোদা। ১২৯৪ হিজরিতে মোহাম্মাদ তৌফিক পাশা মাকামে জয়নাবের উপরের গম্বুজটিকে মিশরীয় ও ইস্তাম্বুলি মরমর পাথর দিয়ে ঢেকে দেন। এর তিন বছর পর মসজিদ, গম্বুজ ও মিনার আরেকবার পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ১৩২০ সালের এগুলোর নির্মাণ কাজের সমাপ্তি ঘটে।

অবশ্য, হযরত জয়নাবের কবর সম্পর্কে তিনটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মতটি হচ্ছে, তাকে বর্তমান সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের দক্ষিণ শহরতলীতে দাফন করা হয়। আরেকটি মতে, তার কবর মিশরের রাজধানী কায়রোর সাইয়্যেদা জয়নাব মসজিদের ভেতরে অবস্থিত।  আর তৃতীয় মতটি বলছে, বিবি জয়নাবকে মদীনায় জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়েছিল।  এই তিন মতের যেটিই সঠিক হোক না কেন তাতে কিছু আসে যায় না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইসলামের এই মহিয়সী নারীর নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হলেও তাঁর নাম বরং ছড়িয়ে পড়েছে মুসলিম বিশ্বের দিকে দিকে।  সিরিয়ায় ইয়াজিদের প্রাসাদে তাকে উদ্দেশ করে বিবি জয়নাব বলেছিলেন: “আল্লাহর শপথ তুমি যত চেষ্টাই করো আমাদের নাম, ঠিকানা ও আমাদের স্মরণকে বিশ্ববাসীর অন্তর থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। ”

তো শ্রোতাবন্ধুরা, আজকের আসরের সময়ও ফুরিয়ে এল। এবার বিদায়ের পালা। আগামী আসরে আমরা সানায় অবস্থিত জামে আল-কাবির মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। আশা করছি তখনো আপনাদের সঙ্গ পাব।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২

২০১৮-০১-০২ ২০:২৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য