ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক দেয়া বক্তব্য জনগণের সাথে একধরনের রসিকতা বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক আবুল মকসুদ। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পাবলিকলি বাহবা নেবার জন্য তিনি এমন বক্তব্য দিলেন। শিক্ষাকে একেবারে সর্বনাশের শেষ কিনারে নিয়ে গেছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের একটি বক্তব্য নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তিনি শিক্ষা বিভাগের এক অনুষ্ঠানে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে  বলেছেন, "আপনাদের কাছে অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, কিন্তু সহনশীল হয়ে খাবেন। কারণ, আপনারা ঘুষ খাবেন না -তা বলার সাহস আমার নেই।" মন্ত্রীর এই বক্তব্য কীভাবে দেখছেন আপনি?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত বিতর্কিত একজন মন্ত্রী। শিক্ষাকে তিনি অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা অতীতে আর ঘটে নি। কারণ গুণগত দিক থেকে দেখতে গেলে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত মানটা একেবারে সর্বনাশের শেষ কিনারে নিয়ে গেছেন।

তারপর শিক্ষাখাতের দুর্নীতির বিষয়টি চলে আসে। শিক্ষা বিভাগের দুর্নীতি এর আগেও ছিল এখনও আছে। শিক্ষামন্ত্রী নিজেই যেখানে বলছেন দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নেবেন অর্থাৎ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। আর সেই অসহনীয় দুর্নীতির বিষয়টিকে এইভাবে পাবলিকলি বলে হয়ত উনি মনে করেছিলেন যে বাহবা পাওয়া যাবে। সবাই মনে করবে যে, তিনি অতি সৎ মানুষ, তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সবাই দুর্নীতি করে এবং ঘুষ খায়।

তিনি মন্ত্রী, তিনি জানেন তার মন্ত্রণালয়ে কী হয়? বইখাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরিসহ যাবতীয় ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুর্নীতির একটি আখড়ায় পরিণত হয়েছে। পত্র পত্রিকায় এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় এ বিষয়টি নিয়মিত লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে কিন্তু তিনি এ বিষয়টির প্রতি কখনও কোনো গুরুত্ব দেন নি। আরেকটা বিষয় মন্ত্রণালয়ে ঘুষ দুর্নীতি কারা করে সে বিষয়টি তো মন্ত্রীর জানা বিষয়। অথচ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পাবলিকলি বাহবা নেবার জন্য বক্তব্য দিলেন। এ কাজটা তিনি ঠিক করেন নি।

রেডিও তেহরান: শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠার পর মন্ত্রী বলেছেন, তিনি বিএনপি-জামায়াত সরকারকে ইঙ্গিত করে বক্তব্য দিয়েছেন এবং তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু পরে মানবজমিন মন্ত্রীর বক্তব্যের রেকর্ড থেকে যা তুলে ধরেছে তাতে দেখা যায় মন্ত্রীর দাবি সঠিক নয় কী বলবেন আপনি?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, মানুষ অনেক সময় আত্মরক্ষার জন্য গোজামিলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। আর গোঁজামিল দেয়ার কারণে পরিস্থিতিটা সহজ না হয়ে বরং খারাপের দিকে যায়। মানুষের কাছে বিষয়টি আরো বেশি দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। শিক্ষামন্ত্রী প্রথম যখন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে ঘুষ দুর্নীতি নিয়ে কথা বললেন সেটা মানুষ একভাবে নিয়েছিল। মানুষ মনে করে যেহেতু শিক্ষা বিভাগে দুর্নীতি হচ্ছে তাই মন্ত্রী এমন কথা বলেছেন।

তিনি তাঁর প্রথমে দেয়া বক্তব্যের বিপরীতে বলতে পারতেন আমি আসলে ওভাবে মিন করতে চাই নি,  আবেগের বশে  এবং একধরনের হতাশা থেকে কথাগুলো বলেছি। তাহলেও শিক্ষামন্ত্রীর কথা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতো। সেটা না করে তিনি দোষারোপের এবং অস্বীকারের রাজনীতি করলেন। মানুষ এমনিতেই বর্তমান সরকারের নানা কার্যকলাপে তাদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে তার ওপর মন্ত্রীর এই ধরনের বক্তব্যকে মানুষ ভালোভাবে নেয় নি।

মানুষ শিক্ষা মন্ত্রীর দেয়া প্রথম বক্তব্যকে হয়ত গুরুত্ব দেয় নি কিন্তু পরের দেয়া বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। মানুষ ভাবছে শিক্ষামন্ত্রী জনগণের সাথে একধরনের রসিকতা করছে।

রেডিও তেহরান: শিক্ষামন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে আরো বলেছেন, "শুধু অফিসার চোর তা না, মন্ত্রীরা চোর, আমিও চোর।" শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য কী সততার বহিঃপ্রকাশ? আপনি কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, শিক্ষামন্ত্রীর ওই কথার অর্থটা হচ্ছে আসলে সত্যিকারের চোর কখনও বলে না আমি চোর। শিক্ষামন্ত্রীর ভাবনায় এটা ছিল- 'আমি চোর নই, আমি সৎ মানুষ' একথাটা মানুষ খুব বেশি করে বিশ্বাস করবে। মানুষ ভাববে-বাপরে বাপ' মন্ত্রী যখন নিজেকে নিজেই 'চোর' বলেছেন-তখন আসলে তিনি মন্দ মানুষ নন, তিনি অনেক সাধু একজন মানুষ। দেখুন, আমরাও একথা বলতে পারছি না যে উনি নিজে দুর্নীতি করেছেন বা ঘুষ খেয়েছেন কারণ আমাদের কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু জনগণের ধারনা হচ্ছে-তাঁর মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী-তার মন্ত্রণালয়ের  কর্মকর্তা, অন্যান্য মন্ত্রী এবং নিজেকে চোর বলায় সরকার বিব্রত হয়েছে। আমি যতটুকু জানি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ শিক্ষামন্ত্রীরও উপরের যেসব মন্ত্রী বা ব্যক্তিরা আছেন তাঁরা বিরক্ত হয়েছেন, তাঁর ক্যাবিনেটও বিরক্ত হয়েছে। তাছাড়া এতদিন শিক্ষামন্ত্রী এভাবে জনগণকে বিরক্ত করছিলেন। বেশি বেশি পাস করানো, যারা লেখাপড়া শেখে নি তাদেরকেও সার্টিফিকেট দেয়া হলো। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষ পুরোপুরি আস্থাহীন হয়ে পড়েছে।

রেডিও তেহরান: শিক্ষামন্ত্রীর এইসব বক্তব্য কী একটা চিত্র তুলে ধরে যে, দেশে ব্যাপকমাত্রায় ঘুষ-দুর্নীতি চলছে?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: জ্বি, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যই এ চিত্র তুলে ধরছে যে দেশে ব্যাপকমাত্রায় ঘুষ-দুর্নীতি চলছে। এটি তারই চিত্র। সর্বত্র দুর্নীতি চলছে। আমি  একথা বলছি না যে কেবলমাত্র এই সরকারের আমলেই দুর্নীতি হচ্ছে। দুর্নীতি এর আগের সরকারের আমলে হয়েছে, তার আগেও হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে হয়েছে পাকিস্তানি আমলেও হয়েছে। তবে দুর্নীতি এখন প্রকাশ্য জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখন দুর্নীতি যেন কোনো নিন্দনীয় বিষয় নয়। এখন একজন ঘুষখোর সামাজিকভাবে নিন্দনীয় নয়। এখন ঘুষখোররা সামাজিকভাবে বুক ফুলিয়ে চলছে। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নয় অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও যারা ঘুষ খাচ্ছেন তারাও বুক ফুলিয়ে বলবে- হ্যাঁ আমরাও ঘুষ খাচ্ছি, ঘুষ খেয়ে ঠিক করেছি।

এরআগে মানুষ সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি করাকে ঘৃণা করত। এসব কাজ লুকিয়ে করত। আজ সেইসব জায়গা থেকে আমরা অনেকটা সরে এসেছি। এখন ঘুষের বিষয়টি প্রকাশ্য এবং স্বাভাবিক একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

রেডিও তেহরান: সমাজ থেকে এ ধরনের দুর্নীতি দূর করার জন্য দুদকের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে তারপরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, দুদক গঠনের পরও অবস্থার কোনোই পরিবর্তন হয় নি।  কেন এ অবস্থা?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: দুদক যখন প্রথম কাজ শুরু করে তখন বেশ কয়েকটি বড় বড় দুর্নীতির বিষয় সামনে নিয়ে আসে যা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল কিন্তু তারপর আমরা কী দেখছি? আসলে এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। সেটা আমরা দেখছি না। যেমন ধরুন বর্তমান সরকার গত ৯ বছর যাবত ক্ষমতায় আছে। এই সময়ের মধ্যে আমরা যদি দেখতাম মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব এ ধরনের কোনো ব্যক্তি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং উপযুক্ত শাস্তির বিধান করা গেছে তাহলে দুদকের ওপর একটা আস্থা সৃষ্টি হতো। দুদক সেটা করতে পারে নি। দুদক মাঝে মাঝে অনেককে ধরছেন আবার তারা ছাড়াও পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে ঘুষ-দুর্নীতি কমে নি। আর কমবেই বা কেন-এর আগে সম্ভবত অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন অর্থনীতি বড় হলে বিরাট বাজেট হবে। আর বিরাট বাজেট হলে দুর্নীতিও বড় ধরনের হবে। সুতরাং দুর্নীতি কমেনি বরং বেড়েছে।

রেডিও তেহরান: এ সমস্যা দূর করতে আরো কী করণীয় আছে?

সৈয়দ আবুল মকসুদ: ঘুষ-দুর্নীতি দূর করতে প্রথমত রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। তবে আমরা একথা বলছি না সবাই দুর্নীতি করছেন। আমরা বলতে চাচ্ছি-যারা দুর্নীতি করছেন তাদের প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকেই কঠোর হতে হবে। বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে, বিতর্কিত কথাবার্তা বলে কিংবা তামাশামূলক বক্তব্য দিয়ে দুর্নীতি রোধ করা যাবে না। দেশের বিচার বিভাগকে শক্ত হতে হবে। নিম্ন আদালত তো ঘুষ-দুর্নীতি বিষয়ে ঠিকমত হ্যান্ডেল করতে পারে না। আর উচ্চ আদালত যদি শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে বড় বড় দুর্নীতিবাজদেরকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে পারে তাহলে দুর্নীতি অনেকটা কমে আসবে বলে আমি মনে করি।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২

 

 

 

২০১৮-০১-০২ ২১:২২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য