• মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৪৪

আব্বাসীয় যুগের আরেকজন কবি হলেন 'মাহিয়র দেইলামি'। হিজরি ৪২৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শরিফ রাজি'র ছাত্র ছিলেন তিনি। মাহিয়র দেইলামি সাইয়্যেদ রাযির কবিতার স্টাইল অবলম্বন করেছিলেন।

মাহিয়র দেইলামি জরাথ্রুস্ট ধর্মানুসারী ছিলেন। পরে তাঁর শিক্ষকের পরিচালনায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আহলে বাইতের প্রতি অনুরক্ত হন।তিনি নবুয়্যতি খান্দানের প্রশংসা করেন এবং ইরানীদের অন্তরাত্মায় পরিবর্তন আনার কারণে নবীজীর আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য আলী (আ.)কে প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতেন। ইমাম হোসাইন (আ.)এর শাহাদাতের ব্যাপক প্রভাব পড়ে তাঁর ওপর। সত্যান্বেষী এই ইমামের শত্রুদের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি একজন বড়ো কবি ছিলেন এবং সমসাময়িককালের অন্যান্য কবিদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে পরিগণিত ছিলেন।

তাঁকে প্রাঞ্জল ও আলঙ্কারিক আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক বলে মনে করা হতো। কবিতার কোনো কোনো দিক থেকে তিনি তাঁর শিক্ষক শরিফ রাযি'র চেয়েও মেধাবি ছিলেন। ইমাম হোসাইন (আ) এর ওপর প্রচুর মর্সিয়া রচনা করেছেন এবং আহলে বাইতের প্রশংসা করেও বহু কবিতা লিখেছেন।বিখ্যাত ফকিহ ইবনে তাউস "আলআযহার" নামে যে গ্রন্থটি রচনা করেছেন সেটিও আসলে মাহিয়ারেরই "কাসিদায়ে লামিয়ার" ব্যাখ্যা-বিশ্লষণ। সর্বোপরি ইসলামী যুগে আরবি কবিতার ওপর যদিও অনেক কাজ হয়েছে এবং এমনকি বড় বড় অনেক কবি সাহিত্যিকেরও জন্ম হয়েছে তবুও কিন্তু এ কথা বলা যাবে না যে, সে সময়কার সকল কবিতাই ছিল ধর্মীয় বা ধর্ম বিষয়ক। বরং আরব কবিগণ বিচিত্র পটভূমিতে কবিতা লিখেছেন। এসব কবিতার বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রজ্ঞা ও ইবাদাত, প্রশংসাগীতি, দর্শন, বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা, প্রবাদ প্রবচন ও বাগধারা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি।

এ সময়কার কবিদের একজন হলেন "বুসিরি"। হিজরি ৬০৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রশংসায় কবিতা লিখেছেন। বুসিরি অবশ্য বহুগুণে গুণান্বিত ছিলেন। তিনি একাধারে ছিলেন একজন দক্ষ ক্যালিগ্রাফিস্ট,হাদিসবিদ, ফকিহ,পবিত্র কোরআনের মহান আবৃত্তিকার ইত্যাদি। এতোসব সত্ত্বেও তিনি কিন্তু কবি হিসেবেই বিশেষ করে নবীজীর গুণবৈশিষ্ট্য প্রকাশক কবিতার জন্যেই-যাকে নাত'ও বলা হয়-খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর কবিতার শব্দশৈলী,ছন্দোবদ্ধতা ইত্যাদি যথেষ্ট প্রশংসনীয়। তবে বুসিরির কবিতার অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে নবীজীর প্রশংসা। নবীজীর প্রশংসামূলক কাসিদার মধ্যে অন্যতম হলো "বুর্দা" নামে বিশ্বব্যাপী খ্যাত তাঁর বইটি। এই কাসিদাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

বুর্দার কাসিদাগুলো আবৃত্তি করার জন্যে বিশেষ ধরনের মজলিসের আয়োজন করা হতো। সেইসাথে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার সাথে শিষ্টাচার বজায় রেখে কাসিদাগুলো আবৃত্তি করা হতো। বুসিরি ছিলেন শিষ্টাচার, নৈতিকতা, সাহিত্য ও ইতিহাসের শিক্ষক। নবীজী (সা.) এর জীবন চরিতের একটা বিশাল অংশের সাথে তিনি জনগণকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এই কাসিদার মধ্য দিয়ে। কাসিদায়ে বাদিইয়্যা সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাসিদায়ে বুর্দার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বুর্দা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মুসলিম বিশ্বের পশ্চিমাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া বা স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলেও বড় বড় অনেক কবির বাস ছিল যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। এঁদেরই একজন হলেন "ইবনে হানি।" হিজরি ৩৬২ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন স্পেনে কবিতার পতাকাবাহী। কোরআনের আয়াতের হাফেজদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং আরবের খবরাখবর ও কবিতা মুখস্থ করার ক্ষেত্রে বড় বড় কবিদের প্রবণতা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনিও কবিতা মুখস্থ করেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো আহলে বাইত (আ.) এর যথার্থতা এবং তাঁদের মাজলুমিয়াতের পক্ষে প্রমাণ দিতে গিয়ে কোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিতেন। আহলে বাইতের ফযিলত এতো সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন যে সর্বকালের পাঠক শ্রোতার কাছেই তার সৌন্দর্য প্রকাশ্য এবং গ্রহণীয়।

আরব্য প্রতিভার মাঝে লেখক আব্দুল্ল.. ইবনে মোকাফফা নামটি বেশ উজ্জ্বল। ১৪২ হিজরিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সৃজনশীল সাহিত্যিকদের মাঝে তাঁর খ্যাতি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। ইবনে মোকাফফা অবশ্য রুযবেহ নামেই বেশি পরিচিত। হিজরি দ্বিতীয় শতকের খ্যাতিমান এই মনীষী ছিলেন ইরানের অধিবাসী। ইরানের ফার্স অঞ্চলে তথা ফিরোযাবাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। পাহলভি ভাষায় বেশ দক্ষ ছিলেন, দক্ষ ছিলেন আরবি ভাষাতেও। সেজন্যে পাহলভি থেকে আরবি ভাষায় তিনি অনেক বই অনুবাদ করেছেন চমৎকারভাবে। ইবনে মোকাফফা বিশেষভাবে খ্যাতিমান ছিলেন তাঁর "রেসালাতুল আদাবুল কাবির" এর জন্যে। ইসলামি যুগের খুব কম কবি সাহিত্যিককেই পাওয়া যাবে যিনি এই গ্রন্থটির কাছে ঋণী নন। "কালিলা ও দিমোনা" এবং "খোদায়িনামা"র মতো কালজয়ী গ্রন্থগুলো তিনি অনুবাদ করেছেন। সাহিত্য ছাড়াও তিনি ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন। বলাবাহুল্য, খোদায়িনামা হলো ফেরদৌসির শাহনামার অন্যতম প্রধান একটি উৎস।

সেসময় আন্দালুসিয়াতেও অনেক বড় বড় কবি-সাহিত্যিক ছিলেন। বিখ্যাত ক'জনের মধ্যে ইবনে আব্দে রাব্বু, আবু ওমর শাহাবুদ্দিন আহমাদ বিন মুহাম্মাদের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এই শতকের অপর একজন সাহিত্যিকের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি হলেন আব্দুল কাহের জুরজানি। ৪৭১ হিজরিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- আব্দুল কাহের জুরজানী ছিলেন ইরানী। ইরানের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জুরজানে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর লেখা বিখ্যাত একটি বই হলো এসরারুল বালাগা। উপমা রূপক বিষয়ক বর্ণনাধর্মী বই এটি। হিজরি তৃতীয় শতকের শুরু থেকে আরব মুলুকে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। মিশর, সিরিয়া, লেবাননে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। দৈনিক পত্রিকা এবং ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতে থাকে। এসবের ফলে সাহিত্য ও জ্ঞান বিজ্ঞানের অঙ্গনে পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে বড় বড় সাহিত্যিকেরও জন্ম হয়। তাঁরা চেষ্টা করেন সাহিত্যের প্রাচীন প্যাটার্ন বাদ দিয়ে নতুন আঙ্গিকে লেখালেখি করতে। এই প্রচেষ্টার জের ধরেই আরবদের সামাজিক ও জাতীয় বিষয়গুলো সাহিত্যের বিষয় হয়ে ওঠে। আরবি সাহিত্যে তাই ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে।

এই উন্নতির পেছনে যাঁদের অবদান ছিল অনন্য তাঁদের কজন হলেন জর্জি যায়দান। তিনি ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে লেবাননের বৈরুতে জন্মগ্রহণ করেন। বিখ্যাত এই আরব লেখক রাজনীতি বিষয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেন এবং ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে আলহেলাল নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর পরবর্তীকালে তারিঁ সন্তান শোকরি যায়দান এবং এমিল যায়দান পত্রিকাটি প্রকাশের কাজ চালিয়ে যান। "সভ্যতার ইতিহাস" তাঁর লেখা অনন্য সাধারণ একটি বই। অবশেষে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত এই আরব লেখক মৃত্যুবরণ করেন।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ/ ৩

২০১৮-০১-০৩ ১৯:৪৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য