• মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৪৬

গত পর্বে যেমনটি বলেছিলাম,ইরানে ইসলাম আগমনের ফলে ইরানের ভাষা, কবিতা ও সাহিত্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। হিজরি সপ্তম, অষ্টম এবং নবম শতকে ইরানে বড় বড় অনেক কবি সাহিত্যিকেরও জন্ম হয়।

সাদি, মৌলাভি, হাফেজের মতো জগদ্বিখ্যাত ইরানী মুসলিম কবিগণ সেই সময় থেকেই বিশ্ব সাহিত্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ‌ পর্বে আমরা তাঁদের সাথে সংক্ষেপে পরিচিত হবার চেষ্টা করবো।

"মৌলাভি" নামে খ্যাত মাওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ ইরানের একজন মহান মনীষী, চিন্তাবিদ, কবি ও আরেফ ছিলেন। বর্তমান আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় বাল্‌খে হিজরি ৬০৪ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইরানের এই মহান কবি আত্মা, পরকাল, খোদা, বিশ্ব প্রভৃতি বিষয়ে কবিতা লেখেন। সাইত্রিশ বছর বয়সেই মাওলানা সমকালের একজন আরেফ, একজন মনীষী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর ভক্ত-অনুরক্ত তথা মুরিদেরা তো বটেই সাধারণ জনগণও তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু অর্জন করেন। কবিতা বা কবিত্ব তাঁর মাঝে এসেছিল বা বিকশিত হয়েছিল শাম্‌স তাব্রিযির সাথে পরিচিত হবার পর থেকে। তাঁর সাহচর্য পেয়েই তিনি আধ্যাত্মিক বা মরমি কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর কবিতায় বিধৃত হয়েছে আধ্যাত্মিকতার গভীর দর্শন। কবিতার আঙ্গিকে তিনি মূলত গল্প বলেছেন। সেই গল্পগুলো ছিল খুবই চিত্তাকর্ষক। এই গল্পের মধ্যেই তিনি তাঁর দর্শন, আধ্যাত্মিকতার ঐশ্বর্যপূর্ণ চিন্তাদর্শগুলো প্রচার করার চেষ্টা করেছেন।

মৌলানার কবিতায় গল্পগুলো মূলত বাহানা বা রূপকমাত্র। গল্পের ভেতরে যে বিরাট রহস্য রয়ে গেছে তার মধ্য দিয়ে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। মৌলাভির শিল্প ভাণ্ডার এখন আর কোনো স্থান-কাল কিংবা পাত্রের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, এই শিল্পকর্ম এখন সমগ্র বিশ্ববাসীর। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইরানীরা কিংবা ফার্সি ভাষাভাষীরা মৌলানার কবিতা থেকে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি অর্জন করতে পেরেছে। মৌলানার গুরুত্বপূর্ণ অনেক শিল্পকর্ম এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। এগুলোর মাঝে অন্তত দুটি কাব্যগ্রন্থের নাম উল্লেখযোগ্য। একটি হলো "মাসনাভিয়ে মা'নাভি" এবং অপরটি "গাযালিয়তে শামস" বা শামসের গযল সম্ভার। এই দুটি গ্রন্থই ফার্সি ভাষায় লেখা। এগুলো এককথায় তুলনাবিহীন ও অনবদ্য। মাসনাভিয়ে মা'নাভি হলো শিক্ষামূলক, দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ রহস্যে ভরা কবিতার আঙ্গিকে লেখা গল্পের পর গল্পের ভাণ্ডার।

মৌলানার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়পর্বের অর্জন হলো মাসনাভি। মাসনাভির শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই যে এটি আজকের পৃথিবীর পথহারা হতবিহ্বল মানব জাতির জন্যেও মুক্তি এবং স্বাধীনতার পথ প্রদর্শন করে যাচ্ছে। ছাব্বিশ হাজার পংক্তি সম্বলিত মাসনাভিকে যদি সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হয় তাহলে যেতে হবে মৌলানার ছয় খণ্ডে লেখা মাসনাভির প্রথম খণ্ডের সূচনায়। এই সূচনাপর্বটি "নেইনামা" নামে বিখ্যাত। 'নেইনামা' ফার্সি অপরাপর কবিতা বা গদ্যের চেয়ে একেবারেই আলাদা। নেইনামা শুরু হয়েছে এই পংক্তিটি দিয়েঃ

بشنو این نی چون شکایت می‌کنداز جدایی‌ ها حکایت می‌ کند

শোনো! বাঁশিটি যেন অভিযোগ করছেবিচ্ছেদের কাহিনী সে বর্ণনা করছে।এই পংক্তিতে বাঁশিটি আসলে স্বয়ং মৌলানাই। তিনি আধ্যাত্মিক জগতের সত্যাসত্যের সাথে পরিচিত ও সচেতন একজন মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে বস্তুতান্ত্রিক এই বিশ্বে বন্দী বলে মনে করছেন এবং অভিযোগ করে বলছেনঃ কেন তাঁর মুক্ত-স্বাধীন আত্মাকে আধ্যাত্মিক জগতের নীপবন থেকে কেটে আলাদা করে ফেলা হলো। "শামসের গযল" সম্ভারটিও আধ্যাত্মিক গযলের একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। শামসের গযল তাই বিশ্ব মরমি সাহিত্যের অঙ্গনে এক উজ্জ্বল সংযোজন। এই গযল সংকলনের অধিকাংশই ফার্সি ভাষায় লেখা হয়েছে। অবশ্য অন্যান্য ভাষাতেও কিছু কিছু পংক্তি লেখা হয়েছে। পঁয়ত্রিশ হাজার পংক্তি ফার্সিতে আর হাজার খানেক আরবি ভাষায় এবং দুইশ' পংক্তিরও কম লেখা হয়েছে তুর্কি ও গ্রিক ভাষায়।হিজরি সপ্তম শতকের আরেকজন নামকরা ইরানি কবি হলেন "শায়খ মোসলেহ উদ্দিন সাদি শিরাযি"। ইরানের এই জগদ্বিখ্যাত কবি তাঁর সমৃদ্ধ ও দীর্ঘ জীবনকালে প্রচুর ভ্রমণ করেছেন এবং মূল্যবান অনেক কীর্তি রেখে গেছেন। তাঁর লেখা সবচে সুন্দর গযলগুলো ফার্সি ভাষায় লেখা। এতো সহজ সাবলিল ভাষায় তিনি লিখেছেন যে, পড়লে মনে হবে এ যেন সাদির কথা নয়, পাঠকের নিজস্ব মনেরই কথা, পাঠকেরই কল্পনা আর অভিজ্ঞতার কথা। এ কারণেই সাদির কবিতাগুলো পাঠকমাত্রই আপন করে নিয়েছে।

সাদির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর একটি হচ্ছে "বোস্তান"। হিজরি ৬৫৫ সালে (১২৩৩ খ্রিস্টাব্দে) এটি রচিত হয়। দর্শন, বিচিত্র শিক্ষা ও উপদেশ ছাড়াও মানবিকতা, আত্মত্যাগ, বীরত্ব আর দয়া ও মহানুভবতায় পূর্ণ সাদির এই বোস্তান। সাদির আরেকটি বিখ্যাত বই হলো "গুলিস্তান"। বোস্তান লেখার এক বছর পর গুলিস্তান লিখেছেন তিনি। এই বইটিও ফার্সি ভাষায় লেখা। সাদি সম্ভবত ইরানের একমাত্র বড় কবি যিনি সমাজ, রাষ্ট্র, নৈতিকতা, পৃথিবী, দ্বীন, আধ্যাত্মিকতাসহ প্রায় সকল বিষয়েই কবিতা লিখেছেন। হিজরি সপ্তম শতকের শেষ দিকে এই মহান কবি মৃত্যুবরণ করেন।

ইসলামী সভ্যতার সবচে প্রভাব বিস্তারকারী ইরানী কবিদের একজন হলেন খাজা শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ। তিনি অবশ্য হাফেজ নামেই বেশি পরিচিত। হিজরি অষ্টম শতকে এই কবিও শিরাযে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলাতেই তিনি পবিত্র কোরআন মুখস্থ করেছিলেন বলে তিনি হাফেজ উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর লেখা কবিতার বেশিরভাগই গযল। এগুলোই হাফেজের গযল হিসেবে পরিচিত। পরবর্তী কবি প্রজন্মের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী কবিদের মধ্যে হাফেজ অন্যতম। আঠারো এবং উনিশ শতকে হাফেজের কবিতা ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। এর ফলেই পশ্চিমা বিশ্বের সাহিত্যাঙ্গনে হাফেজের কবিতা সমাদৃতি পায়। "দেওয়ানে হাফেজ" এর মতো ফার্সি ভাষার আর কোনো কাব্যগ্রন্থ বোধ হয় এতোটা সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে ওঠে নি। আজকাল বোধ হয়- অন্তত ইরানে-এমন কোনো বাসা পাওয়া যাবে না যে বাসায় "দেওয়ানে হাফেজ" কাব্য সংকলনটি নেই।

সমকালীন জ্ঞানের প্রতিটি শাখাতেই হাফেজের বিচরণ ছিল। কোরআন বিষয়ক জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল অনেক উচ্চে। তাঁর কবিতাজুড়েও কোরআনের শৈল্পিক প্রভাব অনস্বীকার্য। এলমে কালামেও তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ ছিলেন। বলেছিলাম যে হাফেজের কবিতা অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় লেখা,তবে তাঁর কবিতার গূঢ়ার্থ ও গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন। তাঁর লেখায় কবিসুলভ রসিকতাগুলোও নজিরবিহীন। হাফেজের 'ফালনামা' তাঁর কবিতার একটি নির্বাচিত সংকলন,এটি খুবই জনপ্রিয় ইরানে। জার্মানির বিখ্যাত কবি গ্যাটে কবি হাফিজকে তাঁর বই উৎসর্গ করেছেন এবং তাঁর কবি সত্ত্বার ওপর হাফেজের প্রভাবের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। মহান এই ইরানী কবি অবশেষে হিজরি ৭৯২ সালে শিরাযে মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্বের কবি সাহিত্যকগণ এবং কবিতাপ্রেমিগণ সারা বছর জুড়েই হাফেজের মাযার যিয়ারত করতে শিরাযে ভিড় জমান।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ/ ৬

২০১৮-০১-০৬ ২১:০৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য