আগের আসরগুলোতে আমরা বলেছি, মসজিদ হচ্ছে মুসলমানদের সর্বোত্তম সমাবেশস্থল ও তাদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। একটি সমাজের সুস্থতা ও টিকে থাকার মূলনীতিই হচ্ছে ঐক্য ও সংহতি।

এই ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মসজিদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মসজিদে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সব ধরনের চিন্তাধারার মানুষ একত্রিত হয়। এখানে ধনী-গরীব ও সাদা-কালোর ভেদাভেদ ভুলে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে নামাজ আদায় করতে দাঁড়িয়ে যায়।

একজন ঈমানদার মুসলমান নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে ওজু করে বিশেষ আদবের সঙ্গে পাঞ্জেগানা নামাজের পাশাপাশি জুমার নামাজ আদায় করতে মসজিদে যান। তিনি জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে একটি ধর্মীয় পরিবেশে প্রবেশ করেন এবং সেখানে সবার সঙ্গে সংহতির একটি অনুভূতি তার মধ্যে জাগ্রত হয়।

সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, লেখক ও ইসলাম বিশেষজ্ঞ মার্সেল এ. বায়োসার্ড এ সম্পর্কে বলেন, বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে মসজিদ। এ দিক দিয়ে মসজিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে যখন বর্তমান যুগের মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের প্রাথমিক যুগের মানুষের মতো ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তখন এর গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। মসজিদ এখন আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা এবং অত্যাচারী ও আধিপত্যকামীদের বিরুদ্ধে মুসলিম উম্মাহ’র জেগে ওঠার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।  মসজিদ এখন আর শুধু নামাজ পড়ার স্থান নেই। এর ভেতরে এখন তৈরি করা হচ্ছে পাঠাগার ও আলোচনার স্থান। কাজেই বোঝা যায়, মসজিদ ইবাদতের স্থানের পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তৎপরতারও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

 

ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মসজিদের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে মুসলিম সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে এমন মসজিদে নামাজ আদায় তো দূরের কথা প্রবেশ করতেই নিষেধ করে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় এরকম একটি মসজিদ ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।  আল্লাহর রাসূল মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পরপরই কুবা নামক স্থানে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এ কথা আমরা এই ধারাবাহিকের শুরুতে বর্ণনা করেছি।

পরবর্তীতে মুনাফিকরা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য কুবা মসজিদের কাছেই একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল।  আল্লাহর রাসূল যখন তাবুক যুদ্ধে যাচ্ছিলেন তখন মুনাফিকরা তাঁর কাছে এসে একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি চায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে জানান, যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানাবেন।কিন্তু মুনাফিকরা রাসূলে খোদার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে তাঁর অনুপস্থিতিতেই দ্রুত মসজিদটি নির্মাণ করে ফেলে। 

মুসলিম বাহিনী তাবুক যুদ্ধ থেকে যখন মদীনায় ফিরছিল তখন মুনাফিকরা এই মসজিদে নামাজ আদায় করে এটি উদ্বোধন করে দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)’র কাছে অনুরোধ জানায়। আল্লাহর রাসূল ওহীর মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জানিয়ে দেন, মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এ অবস্থায় তিনি যেরার মসজিদকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার এবং এর কাঠের তৈরি খুঁটিগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।

যেরার মসজিদ আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য একটি শিক্ষা হয়ে আছে। এখান থেকে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ফুটে ওঠে। এই গুরুত্ব এত বেশি যে, কখনো যদি কোথাও বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একটি মসজিদের পাশে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করা হয় তাহলে দ্বিতীয় মসজিদটি ভেঙে ফেলতে হবে।

জাফরি শিয়া মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম জাফর সাদেক (আ.) মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে নিজ অনুসারীদের বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্নী মুসলিম ভাইদের সঙ্গে প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করে তার উদাহরণ ওই মুসলিম মুজাহিদের মতো যে কিনা খাপ থেকে নিজের তলোয়ার বের করে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। ইমামের এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব দ্বীন ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যে মসজিদ যত বেশি মুসলমানকে একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ করে আল্লাহ তায়ালার কাছে তার মর্যাদা তত বেশি। একটি মসজিদে বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারীদের একত্রে নামাজ আদায় প্রমাণ করে মাযহাবগত মতপার্থক্য তাদের মধ্যকার ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারেনি।

বন্ধুরা, শুরুতে যেমনটি বলেছিলাম, আসরের এ পর্যায়ে আমরা তিউনিশিয়ার কাইরুয়ান জামে মসজিদের সঙ্গে পরিচিত হবো।

শিয়া-সুন্নি একসাথে নামাজ আদায়

 

৫০ হিজরি সালে মুয়াবিয়ার অন্যতম সামরিক কমান্ডার উকবা বিন নাফি ৯,০০০ বর্গমিটার জায়গার উপর এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তিউনিশিয়ার কাইরুয়ান শহরও প্রতিষ্ঠা করেন উকবা বিন নাফি। তিনি এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন বলে কাইরুয়ান জামে মসজিদকে উকবা জামে মসজিদও বলা হয়। এই মসজিদ থেকে আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম আযান উচ্চারিত হয়েছিল বলে ইসলামের ইতিহাসে এটির গুরুত্ব অপরিসীম। শুরুতে এই মসজিদের আয়তন ছিল অনেক ছোট এবং অত্যন্ত সাধাসিধেভাবে এটি তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন শাসনামলে এই মসজিদের আয়তন ও শান-শওকত বৃদ্ধি পায়। মসজিদটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, বাইরে থেকে এটি দেখলে মনে হবে একটি শক্তিশালী দুর্গ মসজিদটিকে বেষ্টন করে রয়েছে।  

কাইরুয়ান মসজিদে ৫টি গম্বুজ ও ৯টি প্রবেশ দ্বার রয়েছে। এই মসজিদের মেহরাবের কাছে নীচু ছাদবিশিষ্ট আরেকটি কক্ষ রয়েছে যার নাম মাকসুরা (مقصوره)। খলিফাদের নামাজ আদায় এবং তাদের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে এই মাকসুরা নির্মাণ করা হয়েছিল। এই কক্ষের ভেতরে দাঁড়িয়ে মসজিদে অবস্থানরত মুসল্লিদের দেখা যাওয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে এক জামায়াতে নামাজ আদায় করা যেত।  এই মাকসুরা নির্মাণের ঘটনা থেকে সাধারণ মানুষ ও মুসল্লিদের সঙ্গে তৎকালীন খলিফাদের দূরত্বের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ইসলামের ইতিহাসে মুয়াবিয়া সর্বপ্রথম দামেস্কের উমাইয়া জামে মসজিদে নিজের জীবন রক্ষার লক্ষ্যে মাকসুরা নির্মাণ করেন।

কাইরুয়ান জামে মসজিদের প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে ইট ও পাথর দিয়ে। এই প্রাচীরের ভেতরেই তৈরি করা হয়েছে বড় বড় স্তম্ভ। এই মসজিদের মিনারে যে চমৎকার কারুকার্য করা হয়েছে, আফ্রিকার অন্য কোনো মসজিদে তার নজির পাওয়া যায় না। আয়তাকার এসব কারুকার্য তিন স্তরবিশিষ্ট। এর দ্বিতীয় স্তরের কারুকাজ প্রথম স্তরের চেয়ে ছোট এবং তৃতীয় স্তরেরটি দ্বিতীয় স্তরের চেয়ে ছোট। কিন্তু নীচে দাঁড়িয়ে মিনারের দিকে তাকালে তিন স্তরের কারুকাজই সমান মনে হয়।

কাইরুয়ান জামে মসজিদের মিম্বর খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দিতে নির্মিত হয়েছে এবং এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পুরনো মিম্বর হিসেবে পরিচিত।  মসজিদের মিহরাবের একাংশে টাইলস বসানো এবং টাইলসের উপরে রয়েছে খোদাই করা ক্যালিগ্রাফি। এ থেকে বোঝা যায়, এক হাজার বছর আগেও তিউনিশিয়ায় টাইলসের প্রচলন ছিল। সার্বিকভাবে এই মসজিদটি আফ্রিকা মহাদেশে ইসলামি স্থাপত্যশিল্পের একটি অনন্য নিদর্শন হয়ে রয়েছে।

তো শ্রোতাবন্ধুরা, আজকের আসরের সময়ও শেষ হয়ে এসেছে। এবার বিদায় নেয়ার পালা। আগামী আসরে আমরা ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মসজিদের ইমামের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি ইরানের গওহর শাদ মসজিদকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। আশা করছি সে আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাব। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/৩০

২০১৮-০১-৩০ ২০:০৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য