বন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের হাটবাজারে বিদ্যমান বিচিত্র পণ্য সামগ্রীর সঙ্গে পরিচয়মূলক নতুন ধারাবাহিক "ইরানের পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক আসরের আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।

গত আসরে আমরা ইরানের বিখ্যাত পণ্য লাল স্বর্ণ খ্যাত "জাফরান" নিয়ে কথা বলেছি। আশা করি ভালোই লেগেছে আপনাদের। আজকের আসরেও আমরা জাফরান নিয়ে আরও কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

 

গত আসরে জাফরানের ওষুধি গুণ কথা বলতে বলতে আসরের পরিসমাপ্তি টেনেছিলাম। কথা বাকি থাকতেই সময়ের স্বল্পতার কারণে শেষ করতে হয়েছিল আলোচনা। বলছিলাম প্রাচীনকালে ইরানের বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ জাকারিয়া রাজি, আবু আলি সিনা এবং আবু রেইহান বিরুনির মতো মহান মনীষীগণ জাফরানের ওষুধি গুণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত রেখে গেছেন। বহু রোগের নিরাময়ে এই জাফরান ব্যবহার করেছেন এবং ব্যবহার করার কথা বলে গেছেন তাঁরা। বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান দুরারোগ্য রোগ আলজেইমার, ক্যানসার কিংবা পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় এই জাফরান খুবই কার্যকর। এই ওষুধিগুণ নিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়ে চলুন আজকের আলোচনা শুরু করা যাক। আপনারা আমাদের সঙ্গেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।

যেসব দুরারোগ্য রোগের উপশমের কথা বললাম এতোক্ষণ সেগুলোর বাইরেও শারীরিক অনেক রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও বেশ উপকারী এই জাফরান। সর্দি, বদহজম, জন্ডিস, হেপাটাইটিস এবং ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগের উপশম বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কার্যকরী এই জাফরান। যকৃত, কিডনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে জাফরানের ভূমিকা অপরসিীম। একইসঙ্গে ব্রংকাইটিসের চিকিৎসাসহ উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের চর্বি ইত্যাদি কমানো এবং ব্যথা নিরাময়ের ক্ষেত্রেও জাফরানের ইতিবাচক ভূমিকা অনস্বীকার্য। খিচুনি বা মৃগীরোগ বিরোধী ওষুধি গুণও রয়েছে জাফরানে। মানসিক অস্থিরতা দূর করে নিদ্রা নিয়ে আনে এই জাফরান। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে এবং মুখস্থ করার শক্তি বাড়ায় জাফরান। জাফরানে রয়েছে ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৬ এবং ভিটামিন সি।

ডিপ্রেশন মানে বিষন্নতা একটি প্রাচীন সমস্যা। বিভিন্ন রূপে এই বিষন্নতা মানুষের মনকে অস্থিরতা অবসাদে আক্রান্ত করেছে। সুন্দর রঙ এবং ঘ্রাণময় উদ্ভিদ জাফরান সেই অবসন্নতা দূর করতে সাহায্য করে। জাফরান দিয়ে তৈরি এক কাপ গরম চা পানকারীর দেহমনের ভেতর সতেজতা ও প্রফুল্লতা এনে দেয়। তবে বেশি বেশি জাফরান ব্যবহার করাও ঠিক নয়। সকল খাবারেই জাফরান ব্যবহার করতে হবে পরিমিত। পরিমাণের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা খুবই জরুরি। বলা হয়ে থাকে এক মাসে সর্বমোট তিন গ্রাম জাফরান ব্যবহার করা যেতে পারে। এই পরিমাণ জাফরান ব্যবহার করা উত্তম এবং উপকারী। পাঁচ গ্রামের বেশি জাফরান ব্যবহার করা উত্তম তো নয়ই বরং ক্ষতিকর। সুতরাং সতর্ক হতে হবে।

খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও জাফরানের ব্যবহার প্রচুর। আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন এফডিএ'সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব গবেষণা হয়েছে তা থেকে প্রতীয়মান হয়েছে যে জাফরান হলো খাদ্যপণ্যকে প্রাকৃতিক রঙ দেয়ার নিরাপদ মাধ্যম। সুতরাং খাবারে প্রাকৃতিক রঙ ও খুশবু দেওয়ার জন্য এবং খাবারকে সুস্বাদু করার জন্য জাফরান ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। খ্যাদ্যে জাফরান ব্যবহারের প্রচলন বেশ পুরোনো। সেই প্রাচীনকাল থেকেই ইরানিরা ঈদে, আনন্দ উৎসবে বা যে-কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবারের মধ্যে জাফরান ব্যবহার করে আসছে। কখনো সুন্দর রঙের প্রয়োজনে, কখনো উপভোগ্য স্বাদ ও ঘ্রাণের প্রয়োজনে আবার কখনো মিষ্টি জাতীয় পণ্যসামগ্রি যেমন আইসক্রিম, ডেজার্ট ইত্যাদিকে সুন্দর করে সাজানোর প্রয়োজনে এমনকি কাবাব,পোলাওসহ বিভিন্ন রেসিপিতেও জাফরানের ব্যবহার আজও নিত্যনৈমিত্তিক।

লাল স্বর্ণ খ্যাত "জাফরান"

 

বিভিন্ন শিল্পের ভুবনেও জাফরানের ব্যবহার ছিল সহজলক্ষ্য। স্থায়ী এবং প্রাকৃতিক রঙ হিসেবে ইরানি শিল্পীরা তাদের ক্যালিগ্রাফিতে,বই-পুস্তক অলংকরণে,কার্পেট ডিজাইনে ব্যাপকভাবে জাফরানের রঙ ব্যবহার করে এসেছে। পবিত্রতার দিক থেকেও জাফরান একটি মূল্যবান জিনিস। সে কারণে শিল্পের পাশাপাশি দীর্ঘকাল পর্যন্ত কুরআনসহ দোয়ার বই কিংবা অন্যান্য পবিত্র গ্রন্থাদি অলংকরণের জন্য এই জাফরান ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানি জাফরান গুণগত দিক থেকেও বেশ উন্নত। সে কারণে স্পেনসহ বিশ্বের বহু দেশ ইরানি জাফরান আমদানি করে। বলা বাহুল্য স্পেনেও প্রচুর জাফরান উৎপন্ন হয়। তবে গুণগত দিক থেকে নীচুমানের হবার কারণে ইরান থেকে তারা জাফরান কিনে নিয়ে নিজেদের নামে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে থাকে। অবশ্য জাফরান উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জাপান, তাইওয়ান, ফ্রান্স, ইতালি এবং জার্মানির নামও রয়েছে।                       

 

সম্প্রতি ইরানে অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা চালাচ্ছে। জাফরান নিয়েও গবেষনা চলছে। কী করে জাফরানের ফলন, গুণগত মান বৃদ্ধি করা যায় সেসব নিয়েও কাজ হয়েছে। বিশেষ করে জাফরানের যেসব ওষুধি গুণ রয়েছে সেসব যাতে নষ্ট না হয় বরং আরও বাড়ানো যায় সে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় জাফরান ফুল মানে বেগুণি রঙের দলগুলো এই মূল্যবান ফুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে এই দলগুলোর কোনো ব্যবহার ছিল না,ফেলে দেওয়া হত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের প্রাচুর্যের কারণে ওই দলগুলোর ব্যাপক ভেষজ গুণ রয়েছে। জাফরানকে কী করে আরও বেশি গ্রাহকবান্ধব করে তোলা যায়, কী করে আরও সহজলভ্য করে তোলা যায়, সে জন্য বিভিন্নভাবে প্যাকিং করার চিন্তাভাবনা চলছে।

যেমন ট্যাবলেটের মতো করে জাফরানকে গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া যায় কিনা সে নিয়ে ভাবা হচ্ছে। কিংবা চায়ের মতো করে পানিতে ছেড়ে দিলে মিশে যায়-এরকম কোনো সিস্টেম করা যায় কিনা তাও ভাবা হচ্ছে। সর্বোপরি কথা হলো জাফরান যেহেতু মানবদেহ ও মনের জন্য খুবই উপকারী সেজন্য এর ব্যবহার বৈচিত্র্য মানবকল্যাণ ডেকে আনবে নি:সন্দেহে। তো আজ আর কথা নয় শ্রোতাবন্ধুরা! যারা দীর্ঘক্ষণ ধরে আমাদের সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/৩১

ট্যাগ

২০১৮-০১-৩১ ১৮:৩২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য