বিশিষ্ট ফরাসি চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো ইরানের ইসলামী বিপ্লব নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের উত্তাল গণ-বিক্ষোভ তিনি তেহরানে থেকেই পর্যবেক্ষণ করেছেন।

। তিনি ইরানি জনগণ ও নেতৃবৃন্দের অভিন্ন লক্ষ্য বা চিন্তার ঐক্য প্রসঙ্গে বলেছেন, 'আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করতাম, জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা বা প্রত্যয় অনেকটা খোদা কিংবা আত্মার মতোই অদৃশ্য, চোখে দেখা যায় না...কিন্তু আমরা তেহরানে এবং সমগ্র ইরানে একটি জাতির সামষ্টিক ইচ্ছা লক্ষ্য করেছি। এটা খুবই প্রশংসনীয় এবং বিরল একটি ঘটনা।'

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের অব্যাহত সাফল্য ও অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান রহস্য হল ইরানি জাতি ও তার ইসলামী নেতৃবৃন্দের সুদৃঢ় ঐক্য। ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানি জনগণ ও নেতৃবৃন্দ সব সময়ই দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় ইস্পাত-কঠিন ঐক্য ও সংহতি বজায় রেখে শত্রুদের ষড়যন্ত্রগুলো একের পর এক বানচাল করেছে।

সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ইরানের প্রতি মার্কিন সরকারের শত্রুতার কারণ প্রসঙ্গে বলেছেন: মার্কিন সরকার অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে আছে। কার ওপর ক্রুদ্ধ তারা? তারা এই নগন্য ব্যক্তি তথা কেবল আমার ওপরই ক্ষুব্ধ নয়, তারা ইরানি জাতির প্রতিও ক্ষুব্ধ। মার্কিন সরকার ইরানের ইসলামী সরকার ও ইসলামী বিপ্লবের প্রতিও ক্ষুব্ধ। কিন্তু কেন? এর কারণ তারা এই বিশাল বিপ্লব ও আন্দোলনের কাছে হেরে গেছে। এটা স্পষ্ট মার্কিন সরকারসহ সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তিগুলোর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হল ইরানের ইসলামী রাষ্ট্রকে উৎখাত করা। ট্রাম্পের আগে যে সরকার আমেরিকায় ক্ষমতায় ছিল তারা প্রকাশ্যে এ লক্ষ্যের কথা বলতো না। তবে তাদেরও উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করা। কিন্তু এখনকার মার্কিন সরকার কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখেই এই উদ্দেশ্যের কথা জোরেশোরে ঘোষণা করছে। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা একই প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, অবশ্য ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস এটা তুলে ধরেছে যে এ বিপ্লব বিশ্ববাসীর কাছে আদর্শে পরিণত হয়েছে ঐক্যের আহ্বায়ক ও  খাঁটি ইসলামী নীতিগুলোর বাস্তবায়নকারী হওয়ার কারণেই। ইরানের ইসলামী বিপ্লব কেবল ইরানি জাতীয় ঐক্যেরই আদর্শ নয়, একইসঙ্গে এ বিপ্লব মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যও পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইসলামী ইরান প্রায়ই বিশ্ব-ইসলামী ঐক্য সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে। সম্প্রতি এমনই এক সম্মেলনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী আবারও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র রেখে-যাওয়া শিক্ষার অনুসরণ ও বাস্তবায়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে মহানবীর শিক্ষা ও আদর্শ অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে মুসলমানদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানসহ মানবজাতির সব ধরনের সংকটের সমাধান। তিনি আরও বলেছেন, মুসলিম বিশ্ব যদি সম্মান ও ক্ষমতার অধিকারী হতে চায় তাহলে ঐক্য ও প্রতিরোধের নীতিকে দিতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব।

ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডক্টর হাসান রুহানিও ইসলামী ঐক্য প্রসঙ্গে মুসলিম বিশ্বের আলেম ও চিন্তাবিদদের এক সম্মেলনে বলেছেন, 'অতীতের যখমগুলোর ওপর শান্তির প্রলেপ লাগিয়ে সেগুলো সারিয়ে তোলা আমাদের সবারই এক বড় দায়িত্ব। এ বিষয়ে আগের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। আমাদের মুসলমানদের মধ্যে ওই যখমগুলো তৈরি করেছিল ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো।'

ইসলামী বিপ্লব ইরানের জন্য বয়ে এনেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণায় অভাবনীয় অগ্রগতির পরিবেশ। পরমাণু জ্বালানী চক্রকে পুরোপুরি আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছেন ইসলামী ইরানের বিজ্ঞানীরা। পরমাণু প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরান এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি দেশের অন্যতম। পাশ্চাত্যের নানা নিষেধাজ্ঞা ও বাধার মধ্য দিয়েই ইসলামী ইরান এক্ষেত্রে অর্জন করেছে চোখ-ধাঁধানো সাফল্য। ফলে হিংসুক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলো ইরানের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির বিষয়েও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

ইসলামী বিপ্লবোত্তর ইরানের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিগুলো প্রসঙ্গে বর্তমান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন:

ইসলামী ইরান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সামাজিক ক্ষেত্রে এতসব সাফল্য অর্জন করেছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো বহাল থাকা সত্ত্বেও। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা সরকারগুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দরজাগুলো আমাদের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। তারা এক্ষেত্রে জরুরি অনেক সামগ্রী আমাদের কাছে বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা এক্ষেত্রে এতোসব সাফল্য অর্জন করেছি।

 ইসলামী ইরানের বৈজ্ঞানিক সাফল্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রুশ বিশেষজ্ঞ  আন্দ্রে ইয়াফ্স্ত্রাতুফ বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান বৈজ্ঞানিক সাফল্যগুলোর দিক থেকে মুসলিম বিশ্বে প্রথম স্থানে উঠে এসেছে। তিনি মহাকাশ গবেষণা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের উৎপাদন ও শিল্প-সামগ্রীকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছেন।  #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো:আবুসাঈদ/৪ 

২০১৮-০২-০৩ ২০:১৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য