ইরানের ইসলামী বিপ্লব জাতিগুলোর প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাসে রচনা করছে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।

এ বিপ্লব কেবল ইরানেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে  তাগুতি ও সাম্রাজ্যবাদের শীর্ষস্থানীয় এক অনুচর রাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করেনি। এ বিপ্লব প্রাচ্যও নয়, পাশ্চাত্যও নয়-বরং ইসলামই শ্রেষ্ঠ-এই নীতির আলোকে আধিপত্যকামী শক্তিগুলোসহ বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও এক বলিষ্ঠ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তাই এ বিপ্লবের আবেদন কোনো বিশেষ অঞ্চলে সীমিত থাকেনি। 

ফিলিস্তিন, বসনিয়া ও কাশ্মিরের মজলুম জনগণসহ মুক্তিকামী জাতিগুলোর কাছে ইরানের ইসলামী বিপ্লব হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস। এইসব কারণেই গত চার দশক ধরে এ বিপ্লব  নব্য-উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর জন্য প্রধান আতঙ্ক হয়ে বিরাজ করছে। খাঁটি মুহাম্মাদি ইসলামের পতাকাবাহী এ বিপ্লব ইসলামী আইন, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কখনও বিন্দুমাত্র আপোষ করেনি। জালিমের বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামী সরকারের কঠোর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ  এবং  মজলুমের পক্ষে সর্বাত্মক সাহায্য ও সমর্থনই এই বাস্তবতার বড় প্রমাণ।

ফিলিস্তিনি জাতিসহ বঞ্চিত, দুর্বল, মজলুম ও নির্যাতিত জাতিগুলোর প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ও সহায়তা প্রদান ইসলামী ইরানের সংবিধানের অন্যতম প্রধান নীতি। স্বাধীন ও ন্যায়বিচারকামী রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামী ইরান এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে।

মুসলমানদের প্রথম কিবলার শহর বায়তুল মুকাদ্দাসকে ইহুদিবাদী দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রা)  রমজানের শেষ শুক্রবারকে বিশ্ব-কুদস দিবস বলে ঘোষণা করেন। আর মুসলিম মাজহাবগুলোর মধ্যে নৈকট্য গড়ে তোলার জন্য ১২ রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ রবিউল আউয়ালকে ঘোষণা করা হয় ঐক্য সপ্তাহ। ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী রাষ্ট্রের এ দুটি প্রভাবশালী পদক্ষেপ অমর হয়ে থাকবে। 

বিশ্বকুদস দিবস পালন বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনি জাতির প্রতি সমর্থন ও সহায়তা এবং ইসরাইলি দখলদারিত্ব বিরোধী প্রতিরোধ জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

ইসলামী ইরান ইসলাম ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সম্মান  এবং স্বার্থ রক্ষার জন্য সব সময়ই অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে বলে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও রাষ্ট্রের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী ঘোষণা করেছিলেন। ইহুদিবাদী ইসরাইলসহ মুসলিম রাষ্ট্র ও ভূমি দখলকারী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ইসলামী ইরান তার সব বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক শক্তি প্রয়োগ করবে বলেও তিনি ঘোষণা করেছিলেন।

ইমাম খোমেনী (র.)'র প্রখ্যাত ছাত্র ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এবং লেখক শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্‌হারি ফিলিস্তিনের মজলুম জাতির প্রতি মুসলিম জাতিগুলোর দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলেছিলেন,  'শক্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা যদি মজলুম বা আগ্রাসনের শিকার জাতিকে রক্ষার জন্য এগিয়ে না আসি তাহলে আমাদেরকেও জালিমের সহযোগী বলেই ধরা হবে।... ফিলিস্তিনে রয়েছে মুসলমানদের প্রথম কিবলা যা ইসরাইল অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। কিন্তু ইসলামের মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত এ বিষয়টি ছাড়াও ফিলিস্তিন সংকটের মানবিক দিকও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে গোটা একটি জাতিকে তাদের মাতৃভূমি থেকে জোর করে তাড়িয়ে দিয়ে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

অধ্যাপক মুতাহ্‌হারি আরও বলেছেন: ইহুদিবাদীরা দাবি করছে যে ফিলিস্তিন তাদের দেশ। কিন্তু ইহুদিবাদীদের লক্ষ্য কেবল ফিলিস্তিনই নয়। তারা মদিনার খাইবারকেও তাদের ভূমি বলে দাবি করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পবিত্র মদিনার খাইবার শহরটিকে ইহুদিদের কাছে বিক্রি করতে তৎকালীন সৌদি শাসকের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন! ইহুদিবাদীরা ইরাকসহ মুসলমানদের পবিত্র অনেক স্থানকেও তাদের বলে দাবি করছে!'

উল্লেখ্য, ইহুদিবাদীরা বলে আসছে যে নীল থেকে ফোরাত পর্যন্ত তারা ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইলকে বিস্তৃত করতে চায়। কিন্তু ইসলামী ইরানের প্রতিরোধ নীতির কারণে এবং ইরানের মদদপুষ্ট লেবাননের হিজবুল্লাহ ও সংগ্রামী ফিলিস্তিনি দলগুলোর সংগ্রামের ফলে ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন ও ফিলিস্তিনের গাজা থেকে দখলদারিত্ব গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। ইসলামী ইরান মজলুম জাতিগুলোর প্রতি সহায়তা দেয়াকে ধর্মীয় ও ঈমানি দায়িত্ব বলে মনে করে। ইরানের সংবিধানের ১৫৪ নম্বর ধারায় এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। 

ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সন্ত্রাসের শিকার হাজার হাজার ইরানির আইনি অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে ও গোপনে সহায়তাদানকারী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে সম্প্রতি ইরানি বিচার বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সারা বিশ্বের মজলুম মুসলিম ব্যক্তিত্বদের আইনি অধিকার রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিতেও ইসলামী ইরানের বিচার বিভাগের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব যে ন্যায়বিচারকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে ও প্রতিষ্ঠা করতে চায় এসব পদক্ষেপই তার প্রমাণ। ইরানের ইসলামী বিপ্লব যে আজও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও মজলুমের প্রতি সর্বাত্মক সহায়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় তাও ফুটে উঠেছে এইসব আইনি পদক্ষেপ থেকে। আর এমন একটি ইসলামী বিপ্লবী রাষ্ট্রের প্রতি যে বিশ্ববাসীর সমর্থন আর ভালবাসা বাড়তেই থাকবে তা সাধারণ বিচার-বুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষও বুঝতে সক্ষম। অতীতের মত ইসলামী ইরান আজও মিয়ানমার, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, বাহরাইন ও সৌদি আরবসহ বিশ্বের সব অঞ্চলের মজলুম মানুষের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। ইসলামী ইরানের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ ও সাহসি ভূমিকার কারণে এই দেশটির ইসলামী বিপ্লব পরিণত হয়েছে দেশে দেশে গণ-জাগরণের আদর্শ মডেলে।

দেশে দেশে ইসলামী গণ-জাগরণে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব ও ভূমিকা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক জনাব এ কে এম আনোয়ারুল কবির বলেছেন: 

'ইরানের ইসলামী বিপ্লব ছিল একটি গণ-বিপ্লব। এতে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ধর্মীয় নেতার আহ্বানে ইসলামী চেতনা নিয়ে তারা নেমে এসেছিল মাঠে। তাদের গণ-আন্দোলন পরিণত হয়েছিল গণশক্তিতে।  এ গণশক্তি তাড়িয়ে দিতে (ক্ষমতাচ্যুত করতে) পেরেছিল প্রবল শক্তিশালী শাহ-সরকারকে যার পেছনে ছিল আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের সর্বাত্মক সরকারি সমর্থন। গণমুখী এ আন্দোলন চেয়েছিল জনগণের অধিকার ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। আর এতে সফল হয়েছিল ইরানি জনগণ। এর পেছনে ছিল অত্যন্ত বড় ধরনের বা মহান আদর্শ।  তাই বিশ্বের ইসলামী দল ও আন্দোলনগুলোর ওপর এর প্রভাব পড়েছে। ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবেই ফিলিস্তিনের গণ-আন্দোলন হয়ে পড়ে আপোষহীন ও তীব্র প্রতিরোধকামী। বিভিন্ন সময়ে তাদের ইন্তিফাদা আন্দোলনগুলো একের পর এক ইসরাইলকে কোণঠাসা করেছে।  ইসলামী বিপ্লবের সংগ্রামী চেতনায় গড়ে ওঠে ইসরাইল-বিরোধী জনপ্রিয় হিজবুল্লাহ আন্দোলন যা লেবাননের শিয়া-সুন্নিসহ সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন পেয়েছে। গত ১৬-১৭ বছরে লেবানন ও ফিলিস্তিনের সংগ্রামীদের কাছে ইসরাইল কয়েক বার পরাস্ত হয়েছে। অথচ এর আগে বেশ কয়েকটি আরব সরকার সম্মিলিতভাবে ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ করেও পরাজিত হয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি ও লেবাননি সংগ্রামীরা ইসরাইলকে পরাজিত করতে পেরেছে ঈমান ও আত্মবিশ্বাসের জোরে যার পেছনে ছিল ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের প্রেরণা।- আর এসবই হচ্ছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের একটা খণ্ডিত প্রভাব মাত্র।  আন্তর্জাতিক অন্য অনেক ক্ষেত্রেও এ বিপ্লবের প্রভাব রয়েছে। তবে লেবানন ও ফিলিস্তিনে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি মাত্রায় চোখে পড়ে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী যেমনটি বলেছিলেন আমরা ইসলামী বিপ্লবকে রফতানি করব। তার সেই অঙ্গীকার সত্য ও বাস্তব হয়েছে।'  #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো:আবুসাঈদ/৫

ট্যাগ

২০১৮-০২-০৪ ২১:২২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য