পশ্চিম এশিয়া বিশ্ব-রাজনীতির অন্যতম প্রধান মঞ্চ। এ অঞ্চলের কৌশলগত ভৌগলিক ও রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থান এবং জ্বালানী সম্পদের প্রাচুর্য এ অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্বের কিছু প্রধান কারণ।

এইসব কারণে ইসলামী বিপ্লবত্তোর ইরান এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামী ইরানকে ঘিরে পাশ্চাত্য এবং বেশিরভাগ আরব সরকারগুলোর নানা ষড়যন্ত্রের কারণে এ অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা বার বার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং অগণতান্ত্রিক আরব সরকারগুলোকে পরাশক্তিগুলোর দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা উস্কে দেয়ার নীতি নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে করেছে সংকটাপন্ন। কিন্তু ইসলামী ইরান সব সময়ই শান্তি ও স্থিতিশীলতার সহায়ক পদক্ষেপ নিয়ে এসেছে। ইরানি নেতৃবৃন্দ এটা বলে আসছেন যে পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশের নিরাপত্তা এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোর নিরাপত্তা সংকট তথা ইসরাইল ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সৃষ্ট সংকটেও এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে বার বার।

এরই আলোকে আলকায়দার নতুন সংস্করণ আইএসআইএল বা তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ ও জেবহাতুন নুসরার মত পশ্চিমা মদদপুষ্ট এবং পশ্চিমাদের অনুগত স্থানীয় সরকারগুলোর সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংগ্রামে শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছে ইসলামী ইরান ও তার মিত্র শক্তিগুলো।

বিশেষ করে সিরিয়া ও ইরাকের ওপর চাপিয়ে দেয়া সন্ত্রাস মোকাবেলা করে এ অঞ্চলে আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে ইরানের ইসলামী সরকার। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নীতিমালায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রনীতিও বিন্যস্ত করা হয়েছে এরই ভিত্তিতে।সম্প্রতি রাশিয়ার সোচি শহরে তুরস্ক, ইরান ও রাশিয়ার শীর্ষ বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর হাসান রুহানি বলেছেন, ইরানের আঞ্চলিক নীতি-কৌশলের ভিত্তি হল সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা নয়; দ্বন্দ্ব নয় বরং সমন্বয়, বিজাতীয় সরকারগুলোর অনুসরণ নয় বরং জাতিগুলোর ইচ্ছার সহযোগী হওয়া এবং যুদ্ধের আগুন জ্বালানো নয় বরং শান্তি প্রতিষ্ঠা।

ইসলামী ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও বলেছেন: ইসলামী ইরানই ছিল প্রথম সরকার যে সিরিয়ার জনগণ ও সরকারে ডাকে সাড়া দিয়ে সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াইয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে...আমরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছি। অনুরোধ করা হলে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর ডাকেও আমরা একই অবস্থান নেব।   

আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ইসলামী ইরানের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত কার্যকর ও সফল ভূমিকা রেখেছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট গবেষক ও চিন্তাবিদ জনাব এ কে এম আনোয়ারুল কবির বলেছেন:

'গত ৪০ বছরের ইতিহাসে দেখা যায় ইসলামী ইরান স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির আওতায় সব সময়ই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি বজায় রাখতে চেয়েছে। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসির একটি স্বাধীন সদস্য হিসেবে সব সময় ভূমিকা পালন করেছে ইরান। এমনকি যেসব সরকার এক সময় ইরানের বিরুদ্ধে প্রবল শত্রুতা করেছে ও ইরানকে একঘরে করতে সমবেত প্রচেষ্টা চালিয়েছে সেসব দেশের বিরুদ্ধে সুযোগ পেয়েও ইরান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সাদ্দাম যখন কুয়েত দখল করে তখন বহু আরব দেশ চেয়েছিল সাদ্দাম ও ইরাকের বিরুদ্ধে ইরানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে। কিন্তু ইরান তাতে সায় দেয়নি। যখনই কোনো মুসলিম দেশ সাম্রাজ্যবাদের হামলার শিকার হয়েছে তখনই ইসলামী ইরান তার প্রতিবাদ করেছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনী (র) কড়া প্রতিবাদ ছিল এর দৃষ্টান্ত। তৎকালীন সোভিয়েত সরকার এ প্রস্তাব দিয়েছিল যে ইসলামী ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী যদি আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের ব্যাপারে নীরব থাকেন তাহলে মস্কো ইরানের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু ইমাম কখনও তা করেননি বরং আফগানিস্তানের পক্ষ নিয়ে সৌভিয়েত হামলার নিন্দা করেছেন। ইসলামী ইরান সব সময়ই প্রতিবেশী ও মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ,হামলা বা যুদ্ধকে সমর্থন করেনি। বরং এসবের প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইরান নব্য-উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করতেই তা করে আসছে। ইরানের এ স্বভাব এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইসলামী ইরান কখনও কোথাও আগ্রাসন চালায়নি। বরং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ও প্রতিবাদ করেছে।  এসবই ইসলামী ইরানের শান্তিকামী চরিত্রের অন্যতম প্রমাণ। এটা ইসলামী ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।'    

ইরান আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলেই সন্ত্রাস-বিরোধী অভিযানে প্রতিবেশীদের সহায়তা দিচ্ছে। ইসলামী ইরানের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও জুলুম বিরোধী এবং সন্ত্রাস-বিরোধী ভূমিকার কারণেই মার্কিন সরকার ইসলামী বিপ্লবী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। কিন্তু তা করতে না পেরে মার্কিন সরকার বার বার ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছে। ইরানি জাতি ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে যেমন হস্তক্ষেপকামী মার্কিন সরকারের গালে চপেটাঘাত করেছে তেমনি তারা ভবিষ্যতে যে কোনো আগ্রাসনেরও সমুচিত জবাব দিতে সক্ষম। ইরানের ইসলামী বিপ্লব যখন ছোট্ট চারাগাছের মত নতুন ও কম বয়স্ক ছিল তখনও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তেহরানের ইসলামী সরকারের ক্ষতি করতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এখন ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ও সরকার এক সুবিশাল ও সুদৃঢ় বৃক্ষের মত মজবুত হওয়ায় সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তগুলো এর ক্ষতি করার ক্ষমতা ও সাহস রাখে না। 

কয়েক মাস আগে ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও  কৌশলগত পররাষ্ট্র-সম্পর্ক পরিষদের প্রধান ডক্টর কামাল খাররাজি ইসলামী ইরানের শান্তিকামী নীতি প্রসঙ্গে লন্ডন-ভিত্তিক চ্যাথাম হাউজ নামক সংস্থায় বলেছেন, কারা মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি জিইয়ে রাখতে চায় তা স্পষ্ট করা জরুরি। ... ইরান যদি সিরিয়া ও ইরাককে সহযোগিতা না করত তাহলে দায়েশের হাতে বাগদাদ ও দামেস্কের পতন ঘটত। দায়েশ বা আইএস-এর মতো লাগাম-ছাড়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে এ অঞ্চলের পতনের পরিণতি কি হত? বাগদাদ ও দামেস্কের পতন ঘটলে আপনারা কি আজ বেশি নিরাপদ ইউরোপের মুখ দেখতেন?

ইসলামী বিপ্লবী ইরান মনে করে সন্ত্রাসবাদকে তার শেকড়সহ উপড়ে ফেলতে হবে এবং সন্ত্রাসীদের আর্থিক সম্পদের উৎসগুলোও কেটে দিতে হবে। কারণ সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াই এখনও শেষ হয়নি এবং সন্ত্রাসীদের হুমকি এখনও অব্যাহত রয়েছে। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো:আবুসাঈদ/৬

২০১৮-০২-০৫ ১৫:১৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য