আমরা গত আসরে বলেছিলাম অপরের সঙ্গে সম্পর্ক করা ব্যক্তির নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে। তবে এই সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন শিষ্টাচার রক্ষা করে চলা অর্থাৎ অপরকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া।

এ সম্পর্কে আমরা কুরআনের সূরা হুজরাতের ১১ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, যেখানে বলা হয়েছে: "হে ঈমানদারগণ!এক কওম যেন অন্য কওমকে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে বিদ্রূপ করো না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না"। যাই হোক,আজকের আসরে আমরা মানবীয় একটি অসৎ গুণ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। সেটা হলো অহমিকা। আপনারা আমাদের সঙ্গেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।

 

'অহমিকা'আত্মপূজা থেকে উঠে আসা একটি মানসিক প্রবণতা। মানুষ যখনই নিজেকে সামর্থ্য বা যোগ্যতার চেয়ে বেশি মূল্যায়ন করে তখনই তার ভেতর এই অহমিকা নামের অসৎ গুণটি তৈরি হয়।অহম মানে হলো নিজেকে বড় ভাবা। যারাই নিজেকে বড় ভাবে তাদেরকে অহংকারী বলা হয়। সমাজে আমরা এমন বহু রকমের পেশা ও কাজের লোকজনের সঙ্গে এবং বিচিত্র নৈতিক গুণের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করি যাদের পারস্পরিক উপলব্ধিও বিভিন্ন রকমের। সেজন্য তাদের সম্পর্কে মূল্যায়ন করাটা খুব একটা সহজ নয়। ধৈর্য এবং মনোবল ছাড়া এই ধরনের মানুষের মাঝে বসবাস করাটা কঠিন। আমরা দেখেছি সমাজে অহংকারী লোকেরা কীভাবে অন্যদের ওপর নিজেদের অহমিকা প্রকাশ করে। অথচ অহংকারী লোকদের কেউই পছন্দ করে না। সবাই চায় তাদের আশেপাশের লোকজন মাটির মতো প্রশান্ত মানুষ হোক, মিথ্যা অহংকারমুক্ত ভালোবাসার মানুষ হোক।

স্বার্থপর মানুষ নিজেকে নিয়েই মগ্ন থাকতে বেশি ভালোবাসে। এই ভালোবাসা নিজের ভুল-ত্রুটিসহ সকল মন্দ দিককে ঢেকে রাখে, সে কিছুই দেখতে পায় না। কখনো কখনো তার মন্দ দিকগুলোও নিজের কাছে ভালো বলেই মনে হয়। আর ভালো বলতে যা তার মধ্যে রয়েছে সেগুলো তার দৃষ্টিতে ফুলে ফেঁপে এমনভাবে ফুটে ওঠে যে অন্যদেরকে তার কাছে খুবই ছোট মনে হয়। কিছু কিছু অহংকারের শেকড় আত্মবিশ্বাস এবং অমুখাপেক্ষিতা প্রদর্শনের মূলে প্রোথিত। তার মানে ব্যক্তি নিজের প্রতি সীমাহীন বিশ্বাস রাখে এবং কারো হেল্প ছাড়াই সে সব কিছু করতে সক্ষম-এরকম একটা ধারণা পেয়ে বসে তাকে। এই ভাবটা তার অন্তরাত্মায় এবং বাহ্যিক সত্ত্বায় প্রভাব ফেলে। এভাবেই মানুষ অহংকারী হয়ে ওঠে।

ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ডাক্তার রুবাবা তাব্রিজি অহংকারী হয়ে ওঠার আরও একটি কারণ উল্লেখ করেছেন। সেটা হলো  তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হওয়া এবং নিজেকে নগণ্য বলে নিগৃহীত হওয়া। যেসব মানুষ ছোটবেলায় নিকটজনদের কাছ থেকে যেমন বাবা, মা, শিক্ষকসহ উন্নত পরিবারের অন্যান্য সদস্যের কাছ থেকে সবসময় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে এসেছে এবং নিজেকে অন্যদের তুলনায় দেখেছে নিচু পর্যায়ের, এরা বড় হলে দুই রকমের ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। হয় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য হওয়াকেই মেনে নেয় অথবা যারা তাকে ছোট বলে চাপিয়ে রেখেছে তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে নিজেকে সবার চেয়ে বড় বলে প্রকাশ করতে থাকে। এই শ্রেণীর ব্যক্তিত্বের লোকজন মূলত ছোটবেলায় তার মানসিকভাবে কোণঠাসা অবস্থাকে ভুলে থেকে অহংকার প্রদর্শন করে শৈশবের সেই যাতনা ঢেকে ফেলার চেষ্টা করে।

উভয় ক্ষেত্রেই অহংকার মানুষকে তার উন্নত লক্ষ্যে পৌঁছার পথে বাধার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মানুষ যখন নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় করে দেখে তৃপ্তি বোধ করে, প্রশান্তি অনুভব করে,তখন। অহংকার এমন এক জিনিস যে অন্যদের সঙ্গে পরামর্শ করা কিংবা অন্যের সাহায্য চাওয়ার মানসিকতা পর্যন্ত নষ্ট করে দেয়।এ ছাড়াও অহংকারী স্বার্থপর লোকের আচার আচরণ, কর্মকাণ্ড ইত্যাদি ভয়, ত্রাস সৃষ্টি করে। যার ফলে অন্যদের অধিকার পদদলিত হয়। মঙ্গল ও কল্যাণ অনুভবের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এমনকি নিজের যোগ্যতা, সামর্থ্য ইত্যাদিও বাধাগ্রস্ত হয়। মেধার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়।নীৎসের ভাষায়:"মেধা ও প্রতিভা ধ্বংসের সহজতম উপায় হলো অহমিকা"।

 

এতক্ষণ তো অহমিকার নেতিবাচক দিক নিয়েই কথা বললাম আমরা। এর একটা ইতিবাচক দিকও কিন্তু রয়েছে। যেমন কেউ যদি নিজের মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ গড়ে তোলে এবং সেই সম্পদ গড়ে তোলার জন্য নিজের পরিশ্রমের কথা বলে, সেই অহংকার নেতিবাচক নয়। কেননা এই অহংকার অন্যকেও মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে পরিশ্রম করে অগ্রগতি লাভে অনুপ্রাণিত করবে। সমাজ এবং জীবনে তার এই অভিজ্ঞতার একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। এই ইতিবাচক অহংকারে কেউ নিজের প্রকৃত অবস্থাকে লুকায় না। এমনকি অপরের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। বরং এই গর্ব ব্যক্তির সামাজিক ও মানসিক বিকাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

পবিত্র কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী সৃষ্টি জগতে অহংকারের প্রকৃত উদাহরণ হলো 'ইবলিস' মানে শয়তান। ইবলিস ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত এবং ছয় হাজার বছর পর্যন্ত সে আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল ছিল। ফেরেশতাদের কাতারেও তার একটা বিশেষ পদমর্যাদা ছিল। কিন্তু যখনই এই ইবলিস আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে অহংকার দেখালো তখনই সে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেল। একেবারে চিরদিনের জন্য বিতাড়িত, পথভ্রষ্ট হয়ে গেল সে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/৭

২০১৮-০২-০৭ ১৬:৪০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য