হাজার বছরের বিস্ময় ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিগত প্রায় ৪০ বছরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিকসহ নানা ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তারের ধারা অব্যাহত রেখেছে। এ বিষয়টি একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ইরানকে দিয়েছে কার্যকর রাষ্ট্র-ব্যবস্থা হওয়ার আন্তর্জাতিক সুনাম।

এর আগে বিগত দুই তিনশ বছর ধরে এ ধারণাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে ধর্ম কেবলই অতীতের বিষয় এবং রাজনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের ক্ষমতা নেই ধর্মের। কিন্তু মরহুম ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে সংঘটিত ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও রাষ্ট্র গত তিনশ বছরের ওই ধারণাকে অসার বলে প্রমাণ করেছে।

বিশিষ্ট লেখক রবার্ট বের লিখেছেন: 'ইরান পরমাণু অস্ত্রের মুখাপেক্ষী নয়, বরং সাংস্কৃতিক শক্তি দিয়ে বিশ্বকে জয় করছে এবং এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে ইসলামী এই দেশটি। আর এমনই এক অবস্থায় যখন মার্কিন সরকার ও গোটা পাশ্চাত্য সিরিয়ার বাশার আসাদ সরকারকে উৎখাতের জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে তখন ইসলামী প্রজাতন্ত্র নামের এই দেশটি বলছে যে না, তা হতে দেয়া হবে না এবং তেহরানের এই মতই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। আর এ থেকেই বোঝা যায় বিশ্ব-রাজনীতির সমীকরণে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে।'

ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ডক্টর মানুচেহের মোহাম্মাদি এ বিপ্লবের সাফল্য ও প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন: 'ইরানের ইসলামী বিপ্লব যখন বিজয় অর্জন করে তখন বিশ্ব ছিল দুই মেরু-কেন্দ্রীক। তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দুই প্রধান পরাশক্তির প্রভাব-বলয়ের মধ্যে বিভক্ত ছিল বিশ্ব। আন্তর্জাতিক ও বড় ধরনের সব ঘটনার উৎস ছিল এ দুই মেরু। কিন্তু ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী বিপ্লব বিশ্ব-রাজনীতির এই ধারাকে লণ্ডভন্ড করে দেয়। তিনি সেই ১৯৬২-৬৩ সনেই বলেছিলেন, 'মার্কিন সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে নিকৃষ্ট, সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটেনের চেয়েও মন্দ, আর ব্রিটেন এ দুইয়ের চেয়েও বেশি খারাপ এবং এরা সবাই একে অপরের চেয়ে বেশি নোংরা।'  

ইরানের ইসলামী বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিশ্ব-ব্যবস্থায় এনেছে পরিবর্তন। ইরানকে একটি বড় শক্তি হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছে সবাই। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বইয়ে ইরানের সাংস্কৃতিক শক্তির স্বীকৃতি দেখা গেছে। লেখক বইটির নাম দিয়েছেন 'ইরান: বিশ্বের সাংস্কৃতিক পরাশক্তি'।  এ বইয়ে বলা হয়েছে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব কেবল জাতীয় পর্যায়ে নয় আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক পর্যায়েও গভীর প্রভাব রেখেছে। বইটিতে লেখা হয়েছে:

'ইরানের ইসলামী বিপ্লব মুসলিম বিশ্বকে আবারও আলোচনার শীর্ষে টেনে এনেছে। পশ্চিমের সুদূর মৌরিতানিয়া থেকে প্রাচ্যে সুদূর মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে মুসলিম বিশ্ব। এই বিশ্বের জনসংখ্য দেড়শ কোটি। আর এই ইসলামী জাহানের ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইসলামী ইরান। ইসলামী বিপ্লবের সুবাদে বিশ্বব্যাপী মহানবী (সা)'র আহলে-বাইতের নেতৃত্ব-কেন্দ্রীক মাজহাব তথা শিয়া বিশ্বও আলোচনায় উঠে এসেছে। '

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বাণী আজ বৈশ্বিক বাণীতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ২০১৫ সালে পশ্চিমা যুব সমাজের কাছে দু'টি খোলা চিঠি দিয়েছিলেন। ওইসব চিঠিতে তিনি  ইসলামকে সরাসরি মুসলমানদের সূত্র থেকে জানার পরামর্শ দিয়েছেন।  পশ্চিমা যুব সমাজকে প্রশ্ন করে তিনি লিখেছেন: 'তোমরা কি এ পর্যন্ত সরাসরি মুসলমানদের কুরআন পড়েছ? .... তোমরা কি এ পর্যন্ত  ইসলামের বাণীকে গণমাধ্যম ছাড়া অন্য কোনো সূত্র থেকে সংগ্রহ করেছ?'-এইসব বাণী ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শক্তিমত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাশ্চাত্যে ইসলাম সম্পর্কে যারা কুৎসিত ধারণা প্রচার করছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এসব চিঠি তার বিপরীতে ইসলামের সত্যিকারের চেহারা তুলে ধরার সুযোগ এনে দিয়েছে।  

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এই পরামর্শে প্রকৃত ইসলামকে অনির্ভরযোগ্য সূত্রের পরিবর্তে সরাসরি ইসলামী টেক্সট বা ইসলামের মূল বইগুলোর পাঠ থেকে জানার যে আহ্বান জানানো হয়েছে তাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন ব্রিটেনের সংসদ হাউজ অব কমন্স-এর সদস্য ডিউয়ি হোভার্ড।  ইরান সম্পর্কে পাশ্চাত্যের জনগণের কাছে অনেক তথ্য থাকলেও সঠিক ও পরিপূর্ণ উপলব্ধি নেই বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। 

এটা স্পষ্ট ইরানের ইসলামী বিপ্লব এমন এক যুগ উপহার দিয়েছে যেখানে ইসলাম ও কুরআনের জন্য এক গৌরবময় উন্নত অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই বিপ্লবের অব্যাহত সাফল্যগুলো এর সজীবতা ও শক্তিমত্তাই তুলে ধরছে।  ইসলামী বিপ্লবের গতিশীলতা ও প্রভাব অব্যাহত থাকার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক এ-কে-এম আনোয়ারুল কবির বলেছেন:

'ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রতি গণ-সমর্থন ছিল বলে তা ৩৯ বছর পরও টিকে আছে। গত প্রায় ৪০ বছরে ইরানে ৩৬টিরও বেশি নির্বাচন হয়েছে। ভোটারদের উপস্থিতি সব সময়ই ছিল ৬০ শতাংশের ওপরে এবং কখনও কখনও ৭০ (ও ৮০) শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে। এসব নির্বাচনে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকেই বোঝা যায় জনগণ এ বিপ্লবকে কত বেশি ভালবাসে। প্রতি বছরই ইসলামী বিপ্লবের বিজয়-বার্ষিকীতে ইরানের কোটি কোটি জনগণ (তথা জনগণের বেশির ভাগই) শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে এ বিপ্লবের প্রতি তাদের অব্যাহত সমর্থনের বিষয়টি তুলে ধরে। বিশ্বের অন্য কোনো দেশেই এমনটি দেখা যায় না যে জনগণ সরকার-ব্যবস্থা বা বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রতি বছরই এভাবে মাঠে নেমে আসে এবং সরকার বিরোধী ও দেশের বিরোধীদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়। অন্য দেশগুলোতে যা হয় তা হলো সামরিক কুচকাওয়াজ হয়। বিদেশী দূতাবাসগুলোর প্রধান তথা রাষ্ট্রদূত বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বিদেশী কর্মকর্তাদের সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আসেন। কুচকাওয়াজ বা সামরিক মহড়ার মধ্য দিয়েই শেষ হয় বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান। কিন্তু ইসলামী ইরানে দেখা যাচ্ছে গত ৩৮-৩৯ বছর ধরে প্রতি বছরই ১১ ফেব্রুয়ারি তথা  ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের দিবসে জনগণ আগের চেয়ে বেশি ও নতুন উদ্দীপনা নিয়ে মাঠে নেমে এসে সরকারের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে ঠিক যেভাবে নির্বাচনের সময়ও এই দেশের সরকারগুলোর প্রতি তারা সমর্থন জানিয়ে আসছে। এই দিনে তারা রাস্তায় নেমে মিছিল করে সরকার ও সরকারি কর্মসূচীগুলোর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে এবং একাত্মতা ঘোষণা করছে। রমজানের শেষ শুক্রবারে বিশ্ব-কুদস দিবসেও তারা এভাবে লক্ষ-কোটি সংখ্যায় রাস্তায় নেমে সরকারের নীতিমালার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায় ইসলামী বিপ্লবের প্রতি গণ-সমর্থন অব্যাহত রয়েছে এবং এ বিপ্লব কেবল অবিচলই নয়, আগের চেয়েও গতিশীল ও শক্তিশালীও হয়েছে। আমরা নিশ্চিত যে এ বিপ্লব এখন সারা বিশ্বের মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী অবস্থানে চলে এসেছে।' #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো:আবুসাঈদ/৭

ট্যাগ

২০১৮-০২-০৭ ১৬:৫২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য