ইসলামী বিপ্লবত্তোর ইরান অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও সামরিক দিকসহ নানা ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে এবং এ ধারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও অব্যাহত রয়েছে।

ইসলামী ইরানের সাফল্যের আরেকটি বড় দিক হল কূটনৈতিক সাফল্য। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ইসলামী ইরান তার পরমাণু তৎপরতার শান্তিপূর্ণ প্রকৃতির বিষয়ে বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোকে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু তৎপরতা মেনে নিতে বাধ্য করেছে। ছয় বৃহৎ শক্তি তথা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইরানের পরমাণু সমঝোতা জাতিসংঘের স্বীকৃত একটি আন্তর্জাতিক সমঝোতা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলন এবং  ইউরোপীয় জোটসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক জোট এই পরমাণু সমঝোতার প্রতি জোরালো সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। আর এই সাফল্যের রহস্য হল ইসলামী ইরানের সফল ও জোরালো কূটনীতি।

ইসলামী ইরান সব ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের নীতিকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে এখনও স্বনির্ভরতা অর্জন পুরোপুরি সম্ভব হয়নি সেসব ক্ষেত্রে দক্ষ কূটনীতিকেও ব্যবহার করাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে ইসলামী এই দেশটি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সব ক্ষেত্রে তার দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাগুলো ব্যবহারকে প্রাধান্য দেয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছেন যাতে প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী ইরান স্বনির্ভর হয় ও তা ধরে রাখে এবং নানা সংকট সমাধানের চাবিকাঠি দেশের ভেতর থেকেই অর্জন করা যায়। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে সর্বোচ্চ নেতা ইরানের বাইরে থাকা নানা সুযোগ-সুবিধা এবং শক্তিগুলোকে ব্যবহার করার বিরোধী। আধুনিক দক্ষ কূটনীতিতে বাইরের বিপুল সহায়তা ও সমর্থনগুলোর সময়োচিত ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ইসলামী ইরানও এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা দক্ষ কূটনীতি প্রসঙ্গে ইরানি কূটনীতিকদের উদ্দেশে বলেছেন: যারা ইসলামী ইরানের উন্নতি চায় না বা যারা এর শত্রু তাদের কাছ থেকে বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা আশা করা যায় না। কিন্তু আমি বলব না যে এদেরকে ব্যবহার করবেন না, আমি কেবল বলব যে এদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হবেন না ও এদের ওপর আস্থাশীল হবেন না বা ভরসা করবেন না, বরং আপনারা নিজস্ব তথা দেশীয় শক্তিমত্তাগুলোর ওপরই নির্ভর করবেন। অন্য কথায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিজস্ব ক্ষমতা ও সামর্থ্যের ওপর দৃঢ় আস্থাশীল এবং আত্মবিশ্বাসী হওয়াকে প্রাধান্য দিলেও জরুরি প্রয়োজনে বিরোধী শক্তিগুলোকেও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দিক-নির্দেশনার আলোকে ইসলামী ইরান জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ সবক্ষেত্রে শক্তিশালী হওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে যাতে শত্রুদেরকে সুযোগ-সুবিধা বা ছাড় দিতে না হয়। শত্রুদের আরোপ-করা নিষেধাজ্ঞার চাপ দুর্বল করার জন্য ইসলামী ইরানের জনগণ ও নেতৃবৃন্দ অর্থনৈতিক অবকাঠামোগুলোর জোরদারের চেষ্টা করছে এবং একই লক্ষ্যে জাতীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনে করেন মার্কিন সরকারের তুলনায় ইউরোপ ইসলামী ইরানের ব্যাপারে কথা-বার্তায় কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও বাস্তবে ইউরোপও বিশ্বাসযোগ্য নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন সরকারের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হওয়া সত্ত্বেও ৮ বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় বা তারও আগে কখনও ইসলামী ইরানের সঙ্গে শত্রুতা করার ক্ষেত্রে মার্কিন সরকারের চেয়ে কম ভূমিকা রাখেনি। তাই ইরানকে সবক্ষেত্রে স্বনির্ভর হতে হবে বলে আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী জোর দিয়ে আসছেন। এরই আলোকে ইরান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক ক্ষেত্রসহ শক্তিমত্তা অর্জনের জন্য জরুরি সব ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছে।

ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে ইরানের অভাবনীয় অগ্রগতি দেখে ব্যাপক হৈ-চৈ করছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তিগুলো। তারা এ ব্যাপারে ইরানকে আলোচনা ও কূটনীতির মারপ্যাচের মধ্যে আটকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরানের দূরদর্শী ও সতর্ক নেতৃবৃন্দ বিচক্ষণ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে শত্রুদের কূটনৈতিক ও প্রচারণাগত হামলাগুলোকে বানচাল করে দিচ্ছে। আর এটাও ইরানের ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার শক্তিমত্তারই প্রমাণ। ইসলামী এই রাষ্ট্র-ব্যবস্থার শক্তিমত্তার চালিকাশক্তি প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট গবেষক ও চিন্তাবিদ জনাব এ কে এম আনোয়ারুল কবির বলেছেন: 

'ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে এ প্রচারণা সব সময় চালানো হয় যে দেশটির সরকার অগণতান্ত্রিক। অথচ ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হওয়া এ সত্ত্বেও এ বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (র) ইরানকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র করা হবে কিনা সে প্রশ্নে গণভোট দিয়েছিলেন। আর তাতে ৯৮ শতাংশেরও বেশি ভোটার ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পক্ষে রায় দেন। বিশ্বের কোথাও এমনটি দেখা যায় না বা যাবে না যে একটি বিজয়ী শক্তি ক্ষমতায় এসে জনগণকে এ সুযোগ দেবে না যে তারা কোন্‌ ধরনের সরকার চায় তা নিজেরাই বেছে নিক্‌। আল্লাহ কোনো কিছু জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়ার অনুমতি আমাদেরকে দেননি-এই ছিল ইমাম খোমেনীর বক্তব্য। তিনি চেয়েছিলেন এটা প্রকাশ হোক যে জনগণ ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সমর্থক। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাও জনগণের নির্বাচিত। কারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা আলেমদের পরিষদই তাঁকে নির্বাচন করার ও তাঁর কাজের ওপর নজরদারি করার (ও প্রয়োজনে তাঁকে পদচ্যুত করার) দায়িত্বপ্রাপ্ত। ইরানের প্রেসিডেন্টও সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। ইরানের মজলিস বা সংসদের সদস্যরাও সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। তাই ইরানের শাসন-ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক বা জনগণের অংশগ্রহণ-ভিত্তিক। বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলের উগ্র কিছু ইসলামী দল বা আন্দোলন জনগণের ওপর তাদের মতামত জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় বা জোর করে ক্ষমতা দখল করতে চায়। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লবে তা কখনও দেখা যায়নি। তারা প্রথম থেকেই জনগণের সমর্থন নিয়েই জনগণের অধিকার রক্ষার কাজ করতে চেয়েছেন। এ কারণেই ইরানের জনগণ প্রতিবছর ইসলামী বিপ্লবের বিজয়-বার্ষিকীতে ইসলামী বিপ্লব ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থার প্রতি তাদের সমর্থনের কথা আবারও ঘোষণা করছেন।' #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো:আবুসাঈদ/৭

ট্যাগ

২০১৮-০২-০৭ ১৬:৫৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য