বন্ধুরা, আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমাদের সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান- ধরণীর বেহেশত মসজিদে। আশা করছি সবাই ভালো আছেন। পবিত্র কুরআন মানুষকে কঠোরভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে এবং এই নির্দেশ পালনের সবচেয়ে ভালো ও পবিত্র স্থান হচ্ছে মসজিদ।

ঐক্য প্রতিষ্ঠার এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে যিনি মুসল্লিদেরকে সহযোগিতা করেন তিনি হচ্ছেন মসজিদের ইমাম।  কাজেই আজকের আসরে আমরা ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মসজিদের ইমামের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি ইরানের গওহরশাদ মসজিদের সঙ্গে পরিচিত হবো। আশা করছি শেষ পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গ পাবো।  

গত আসরে আমরা বলেছি, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হচ্ছে মসজিদ। পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, “তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” আল্লাহর এই নির্দেশ বাস্তবায়নের উৎকৃষ্টতম স্থান মসজিদ। এখানকার আধ্যাত্মিক পরিবেশে মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে নামাজ আদায়ের সময় তৈরি হয় চমৎকার এক ভাবগম্ভীর পরিবেশ। এ ছাড়া, নামাজের আগে ও পরে ইমাম সাহেব মুসল্লিদের তাকওয়া বৃদ্ধির জন্য কুরআন-হাদিসের আলোকে যে দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন তা মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও খুব একটা পাওয়া যায় না। নামাজ আদায়ের সময় মুসল্লিরা যেভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যান এবং ইমামের প্রতিটি তাকবিরকে যেভাবে বিনা বাক্যব্যয়ে অনুসরণ করেন তা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আদর্শ হতে পারে।

জামায়াতের নামাজে মুসল্লিদের কণ্ঠ কোনো অবস্থাতেই ইমাম সাহেবের চেয়ে উচ্চ হবে না, মুসল্লিদেরকে ইমাম সাহেবের চেয়ে পেছনে নামাজে দাঁড়াতে হবে এবং ইমামের চেয়ে আগে রুকু, সিজদা বা অন্য কোনো কাজ আঞ্জাম দেয়া যাবে না।  নামাজ আদায়ের মাধ্যমে এই যে প্রশিক্ষণটি মুসলমানরা পেয়ে যান এটি তাদের সামাজিক জীবনেও কাজে লাগে। নামাজে যেরকম ইমাম সাহেবের চেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলা যায় না, তার চেয়ে আগে বাড়া যায় না এবং তার প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়, তেমনি মুসলিম সমাজের নেতার আনুগত্যও একইভাবে করতে হবে। আর এটি করতে পারলেই একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে ইস্পাতকঠিন ঐক্য ও সংহতি তৈরি হবে।

অবশ্য ইমাম সাহেবকেও সেইরকম যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। যাকে তাকে এই গুরুদায়িত্ব দেয়া যাবে না। যিনি এই দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনিত হবেন তিনি সব ধরনের গুনাহ থেকে দূরে থাকবেন, নেক আমল বা ভালো কাজে সবার চেয়ে অগ্রগামী হবেন এবং সেইসঙ্গে নেতৃত্বের গুণাবলীও তার মধ্যে বিদ্যমান থাকতে হবে। ইমাম সাহেবের দুনিয়াপ্রীতি কম থাকতে  হবে, তাকে জৈবিক চাহিদার কাছে অন্যায়ভাবে আত্মসমর্পন করলে চলবে না এবং তিনি সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালাকে হাজির-নাজির জানবেন।

মুসল্লিদের ওপর ইমাম সাহেব কতখানি প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখেন তার উপরেও অনেকাংশে তাদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নির্ভর করে। তিনিই একজন সফল ইমাম যিনি তার মুসল্লিদের অন্তরের ওপর প্রভাব রাখেন। তার হাতের ইশারাকে যেন প্রতিটি মুসল্লি নিজের জন্য নির্দেশ হিসেবে মেনে নেন এতটুকু যোগ্যতা ইমাম সাহেবের থাকতে হবে। মুসল্লি যখন ইমাম সাহেবের মধ্যে কোনো ধরনের কলুষতা দেখতে পাবে না এবং তাকে আল্লাহর একজন খাঁটি বান্দা হিসেবে দেখবে তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই ইমামের প্রতি মুসল্লিদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আনুগত্য সৃষ্টি হবে। ইমাম সাহেবের বিনয়ী আচরণ এবং সেবামূলক মানসিকতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরানের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত মাশহাদ শহরের গওহরশাদ মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক এই মসজিদ ইমাম রেজা (আ.)’র মাজারের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। ইরানে তৈমুরিয়ানদের শাসনামলের প্রখ্যাত ন্যায়পরায়ণ শাসক আমির গিয়াসউদ্দিন তারখানের মেয়ে গওহারশাদ বেগম ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণ করেন।  সে সময়কার প্রতিবেশী একটি এলাকার শাসক আমির গোরকানির ছেলে শাহরুখ মির্জার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন গিয়াসউদ্দিন তারখান।  আমির গোরকানি রাষ্ট্র পরিচালনায় মহিয়সী নারী ও পুত্রবধু গওহরশাদ বেগমের পরামর্শ নিতেন।  গওহরশাদ মসজিদের অন্তত দুই স্থানে পাথরের ওপর খোদাই করে এই মহীয়সী নারীর নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে।

প্রায় বর্গাকৃতির মসজিদটি নির্মিত হয়েছে দুই হাজার ৮৫০ বর্গমিটার জায়গার উপর। এটিতে চারটি আঙিনা এবং সাতটি ছাদযুক্ত বারান্দা রয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শনের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.)’র পবিত্র বংশধর ইমাম রেজা (আ.)’র মাজার সংলগ্ন স্থানে মসজিদটি নির্মিত হওয়ায় এর গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। গওহরশাদ জামে মসজিদের পুরো দেয়াল জুড়ে আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামগুলো ছাড়াও পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদিসের বাণী লিপিবদ্ধ রয়েছে।

ইরানের গওহরশাদ মসজিদ

 

এই মসজিদের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে এটির মেহরাব। মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায়ের সময় ইমাম সাহেব যে স্থানে দাঁড়ান সেটিকে মেহরাব বলা হয়। ইরান থেকে ক্বাবা শরীফ দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বলে দেশটির অন্য সব মসজিদের মতো গওহরশাদ মসজিদের মেহরাবও এটির দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত। এই মেহরাবের উপর স্থাপিত রয়েছে দু’টি শিলালিপি। এর একটিতে সূরা বনি-ইসরাইলের ৭৮ নম্বর আয়াত লেখা রয়েছে যেখানে নামাজ কায়েমের কথা বলা হয়েছে।  দ্বিতীয় শিলালিপিতে চমৎকার খোদাই করা হরফ দিয়ে আয়াতুল কুরসি লিপিবদ্ধ রয়েছে।

মেহরাবের ডান পার্শ্বে রয়েছে সাহেবুজ্জামান (আ.) মিম্বর। মিম্বর হচ্ছে মসজিদের সেই স্থান যেখানে দাঁড়িয়ে খতিব মুসল্লিদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। গওহরশাদ মসজিদে অতীতে দু’টি মিম্বর ছিল যার বড়টিতে ছিল আটটি ধাপ।  এই মিম্বরের নাম ছিল ‘সাহেব শাহ’ এবং দ্বিতীয় মিম্বরটির নাম ছিল ‘হাজি মির্জা আসকারি’ মিম্বর। মসজিদের প্রথম জুমার নামাজের ইমাম ছিলেন হাজি মির্জা আসকারি। কিন্তু এখন আর ওই দুই মিম্বরের একটিও অবশিষ্ট নেই। এগুলোর পরিবর্তে অনেক চওড়া এবং উঁচু একটি দর্শনীয় মিম্বর স্থাপন করা হয়েছে।  ১৪ ধাপবিশিষ্ট এই মিম্বর তৈরি হয়েছে আখরোট ও নাশপাতি কাঠ দিয়ে এবং এতে কোনো পেরেক ব্যবহার করা হয়নি।

গওহরশাদ মসজিদের আঙিনায় শুরুর দিকে ইট বিছানো ছিল। পরবর্তীতে ইটের পরিবর্তে পাথর বসানো হয়। এই আঙিনার ঠিক মাঝখানে ১৯৫৭ খিষ্টাব্দ পর্যন্ত ১২ মিটার লম্বা ও ১২ মিটার প্রস্থ একটি আলাদা কক্ষ ছিল যেটিকে ‘মাসজেদে পিরেযান’ বা ‘বৃদ্ধার মসজিদ’ বলে অভিহিত করা হতো। এই কক্ষটি শুরুর দিকে কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে আগুন লেগে কক্ষটি ভস্মিভূত হয়ে গেলে একজন সম্পদশালী নারী এটিকে পাথর দিয়ে নির্মাণ করে দেন। তখন থেকে এটিকে ‘বৃদ্ধার মসজিদ’ বলে অভিহিত করা হতো।  ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত এই কক্ষে নামাজ আদায় করা হলেও বর্তমানে এটিকে ওজুখানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

মাশহাদ শহরে ইমাম রেজা (আ.)’র মাজার লাগোয়া সবচেয়ে বড় ও পুরনো এই মসজিদে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। মাজার জিয়ারত করতে আসা হাজার হাজার মুসল্লির পদভারে মসজিদটি ২৪ ঘন্টাই মুখরিত থাকে। অথচ অন্যান্য মসজিদ সাধারণত নামাজের সময় খুলে দেয়া হয় এবং নামাজ শেষে মসজিদে কারো উপস্থিতি চোখে পড়ে না। গওহরশাদ মসজিদের এই বিশেষ গুণের কারণে এটিকে  মুসলিম বিশ্বের একটি বিরল মসজিদ হিসেবে অভিহিত করা যায়।

তো বন্ধুরা, আজকের আসরের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। তাই গওহরশাদ মসজিদের সবগুলো দিক তুলে ধরা সম্ভব হলো। এটির আরো কিছু দিক নিয়ে আগামী আসরেও কথা বলার আশা রইল। সে আসরেও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/৭

২০১৮-০২-০৭ ১৭:১০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য