কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা সিজদাহর ২০ থেকে ২৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২০ ও ২১ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

) وَأَمَّا الَّذِينَ فَسَقُوا فَمَأْوَاهُمُ النَّارُ كُلَّمَا أَرَادُوا أَنْ يَخْرُجُوا مِنْهَا أُعِيدُوا فِيهَا وَقِيلَ لَهُمْ ذُوقُوا عَذَابَ النَّارِ الَّذِي كُنْتُمْ بِهِ تُكَذِّبُونَ (20) وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (21) 

“পক্ষান্তরে যারা অবাধ্য হয়, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। যখনই তারা জাহান্নাম থেকে বের হতে চাইবে, তখনই তাদেরকে সেখানে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের যে আযাবকে অস্বীকার করতে এখন তার স্বাদ আস্বাদন কর।” (৩২:২০)

“গুরু শাস্তির (অর্থাৎ জাহান্নামের শাস্তির) পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি (অর্থাৎ দুনিয়ায় কিছু শাস্তি) আস্বাদন করাব, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।” (৩২:২১)      

গত আসরে আমরা বলেছি, মুমিন ও ফাসেক ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কাছে একই রকম নয়। মুমিনরা তাদের নেক আমলের কারণে জান্নাত পাওয়ার অধিকার লাভ করেন এবং সেখানে তাদেরকে উত্তম আবাসস্থল দেয়া হয়। এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: যারা মুখে ঈমানের দাবি করে কিন্তু আল্লাহর আদেশ মেনে চলে না এবং সারাক্ষণ নাফরমানিতে লিপ্ত থাকে তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। সেখান থেকে তাদের পালানোর কোনো উপায় থাকবে না।  অবশ্য সেই মহা শাস্তি দেয়ার আগে তাদেরকে দুনিয়াতেও কিছু ছোটখাট শাস্তি দেয়া হয় যাতে তারা গুনাহ’র পথ ত্যাগ করে সঠিক পথে ফিরে আসে। দুনিয়ার শাস্তি দেখে যারা তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসে তারা ভাগ্যবান। কিন্তু কিয়ামতের দিন মহাশাস্তি দেখার পর আর তওবা কবুল হবে না এবং সেখান থেকে আবার এই পৃথিবীতে ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

হাদিসে এসেছে, মানুষকে পৃথিবীতে কিছু বিপদ-আপদ, অসুখ-বিসুখ ও দুঃখ-কষ্ট দিয়ে মহান আল্লাহ তাদেরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। পাপকাজে মগ্ন মানুষের জন্য গুনাহ ত্যাগ করার এটি একটি বিরাট সুযোগ। এই সুযোগকে তারাই কাজে লাগায় যারা বুদ্ধিমান। কিন্তু নির্বোধেরা এরপরও পাপের কাজে অটল থাকে এবং কিয়ামতের দিন মহা দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মিথ্যা ও পাপ কখনো কখনো মানুষকে এতটা মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে যে, তার কাজকর্ম দেখলে মনে হয়, কিয়ামতে তার বিশ্বাস নেই।

২. আল্লাহ শুধু কেয়ামতেই মানুষকে শাস্তি দেবেন না। দুনিয়াতেও তিনি কিছু মানুষকে শাস্তি দেন। পাপী বান্দা যাতে তওবা করে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে সেজন্য এটি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নেয়ামত।

৩. মহান আল্লাহর ক্রোধও তাঁর দয়া থেকেই উৎসারিত। মানুষকে সঠিকপথে ফিরিয়ে আনার জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে।

এবারে সূরা সিজদাহ’র ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآَيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ (22)

“যে ব্যক্তিকে তার পালনকর্তার আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দান করা হয়, অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে যালেম আর কে (হতে পারে)? নিঃসন্দেহে আমি অপরাধীদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেব।” (৩২:২২)

এই আয়াতে বলা হচ্ছে, যারা সত্য উপলব্ধি করার পরও আল্লাহর আয়াত ও নির্দেশাবলী অস্বীকার করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয় তারা হচ্ছে এমন জালেম যাদেরকে মহা শাস্তি দেয়া হবে।  মুমিন ব্যক্তি কখনো অন্যের প্রতি জুলুম করে না। কিন্তু যারা বুঝেশুনে সত্য পরিত্যাগ করে কুফরের পথ অবলম্বন করে তাদের পক্ষে খুব সহজেই অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করা এবং অন্যের প্রতি জুলুম করা সম্ভব।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. গোঁড়া ও একগুঁয়েমি মনোভাব এতটাই ক্ষতিকর যে, এ ধরনের মানুষকে যখনই সত্য উপদেশ দেয়া হয় তখন তারা পাপকাজ পরিত্যাগ করার পরিবর্তে জিদবশত আগের চেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে পাপের কাজে লিপ্ত হয়।

২. অপরাধীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে সৎ উপদেশ ও সতর্ক করার পর কখনো কখনো শাস্তিও দেন আল্লাহ তায়ালা।

এই সূরার ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন:

وَلَقَدْ آَتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ فَلَا تَكُنْ فِي مِرْيَةٍ مِنْ لِقَائِهِ وَجَعَلْنَاهُ هُدًى لِبَنِي إِسْرَائِيلَ (23) وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآَيَاتِنَا يُوقِنُونَ (24) إِنَّ رَبَّكَ هُوَ يَفْصِلُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ (25)

“এবং আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি, অতএব আপনি কোরআন প্রাপ্তির বিষয়ে কোন সন্দেহ করবেন না। আমি একে বনী ইসরাইলের জন্যে পথ প্রদর্শক করেছিলাম।” (৩২:২৩)

“তারা সবর করত বিধায় আমি তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার আদেশে পথ প্রদর্শন করত। তারা আমার আয়াতসমূহে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল।” (৩২:২৪) 

“নিঃসন্দেহে তারা যে বিষয়ে মতবিরোধ করছে, আপনার পালনকর্তাই কেয়ামতের দিন সে বিষয়ে তাদের মধ্যে ফয়সালা দেবেন।” (৩২:২৫)     

এই তিন আয়াতের শুরুতে বিশ্বনবী (সা.)’র নবুওয়াতপ্রাপ্তি এবং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মহান আল্লাহর তরফ থেকে নবী-রাসূলদের ওপর ঐশী কিতাব নাজিল হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলছেন: এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বনি ইসরাইল জাতিকে সঠিক পথে হেদায়েত করা ও তাদেরকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে আমিই মূসাকে কিতাব দিয়েছিলাম।  ওই জাতির মধ্যেও একাংশ মূসার প্রতি ঈমান এনে তার সঙ্গী হয়েছিল। এসব মানুষ ফেরাউনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ধৈর্য ধারণ করেছিল। আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতি ও তাওরাতের প্রতি তাদের দৃঢ় ঈমান ছিল বলে তারা এক সময় ফেরাউনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল।  এ ধরনের মানুষ আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের নির্দেশের ভিত্তিতে সমাজ পরিচালনা করেন এবং নিজেদের জীবনের প্রতিটি পদে আল্লাহকে মেনে চলেন।

এই খাঁটি মুমিন ব্যক্তিরা তাদের ঈমান ও অদম্য মানসিক শক্তির পুরস্কার হিসেবে ক্ষমতায় পৌঁছার পর নিজেদের কামনা বাসনা কিংবা সম্পদের মোহে লিপ্ত হন না।  তারা বরং আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে আল্লাহর আইন সঠিকভাবে মেনে চলেন। আল্লাহর নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের প্রবৃত্তির ইচ্ছাকে তুচ্ছজ্ঞান করেন।

পরবর্তীতে অবশ্য বনি ইসরাইল জাতির মধ্যে ধর্মীয় বিষয়ে ব্যাপক মতভেদ ও পারস্পরিক শত্রুতা দেখা দেয়।  আল্লাহর নির্দেশের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীনতা এবং নিজেদের কামনা বাসনাকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে তাদের মধ্যে এই বিপর্যয় নেমে আসে। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ভর্ৎসনা করে বলেন: মানুষের ধর্মের ব্যাপারে যারা মতপার্থক্য সৃষ্টি করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের উপযুক্ত বিচার করবেন। সেদিন অবশ্য আল্লাহ তায়ালা ন্যায়বিচার করবেন এবং কারে সঙ্গে জুলুম করবেন না।  

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নবী-রাসূলদের নবুওয়াত প্রাপ্তি ছিল একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিক ঘটনা। আমাদের বিশ্বনবী (সা.)-এর আগেও নবুওয়াতের এই ধারা সৃষ্টির শুরু থেকেই চালু ছিল। আল্লাহর ওহীপ্রাপ্ত এসব পথ প্রদর্শকদের ব্যাপারে মনে বিন্দুমাত্র সংশয় স্থান দেয়া যাবে না।

২. একজন মানুষের ইসলামি সমাজের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ঈমান, নিশ্চিত বিশ্বাস এবং অদম্য মানসিক শক্তি প্রয়োজন। তাকে লক্ষ্যের ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস থাকতে হবে এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংকল্পে অটল থাকতে হবে। তাহলে তার পক্ষে সমাজের নেতৃত্ব অর্জন করা সম্ভব হবে।

৩. মানুষের কাছে হেদায়েতের বাণী পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতাদেরকে কখনোই নিরাশ হলে চলবে না। মনে রাখতে হবে ধর্মীয় ব্যাপারে মতপার্থক্য ও বিভেদ সব যুগেই ছিল এবং এটি দেখে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই।#

২০১৮-০২-০৭ ১৮:০৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য