ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও ইরানি জাতির সঙ্গে মার্কিন সরকারের শত্রুতা অব্যাহত রয়েছে।

ছয় বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর আশা করা হচ্ছিল যে ইসলামী এই দেশটির সরকার ও জনগণের সঙ্গে মার্কিন সরকারের শত্রুতা কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আসলে বিগত চার দশক ধরেই মার্কিন সরকার নানা ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও সামরিক আগ্রাসন, কখনও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কখনওবা প্রচার-যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে শত্রুতা অব্যাহত রেখেছে মার্কিন সরকার।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের আগেও দেশটির রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসক শাহ ও তার পিতার সরকারকে প্রবল গণ-বিক্ষোভের মুখেও সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছিল মার্কিন সরকার। ইরানে শোষণ ও লুণ্ঠন অব্যাহত রাখার জন্য শাহ সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার এবং ইসলামী বিপ্লবী সরকারকেও উৎখাত করার ষড়যন্ত্র করছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা।

কিন্তু এসব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে দিয়ে ইরানের ওপর ৮ বছরের যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় মার্কিন সরকার। আর এ যুদ্ধেও সুবিধা করতে না পেরে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সামরিক ও ভয়ানক কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরে মার্কিন সরকার তেহরানের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।  

পরমাণু সমঝোতার পরও ইরানের ওপর অনেক নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছে মার্কিন সরকার এমনকি ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিসহ নানা বিষয়ে অবাস্তব তথ্য প্রচার করে নতুন নতুন বহু নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা স্বাক্ষরের কয়েক মাস আগে মার্কিন সরকার দেশটির ব্যাংকগুলোতে ইরানের ২০০ কোটি ডলার আটক করে। 

 ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছে যে ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সমঝোতা। পরমাণু সমঝোতায় কথা ছিল যে জাতিসংঘের ইরান-বিরোধী সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে এবং মার্কিন সরকারের ইরান-বিরোধী একতরফা ও বহুজাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলোও বাতিল করা হবে।  ইরান-বিরোধী ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞাগুলোও তুলে নেয়া হবে বলে এই সমঝোতায় উল্লেখ করা হয়  মার্কিন সরকার ইরান-বিরোধী নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বলেও এই সমঝোতায় বলা হয়েছে।

কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন সরকার পরমাণু সমঝোতার কোনো খুঁত বের করতে না পেরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে পরমাণু সমঝোতার লঙ্ঘন বলে অজুহাত দেখিয়ে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিল পাস করেছে। আর এই বিল পাশের কিছু পরই আমেরিকার ইহুদিবাদী লবি আইপাক ও দখলদার ইসরাইল তাদের সন্তুষ্টির কথা যৌথভাবে ঘোষণা করে জানায় যে, মার্কিন কংগ্রেসের ওই বিলটি তাদের নির্দেশেই তৈরি করা হয়েছে এবং তাদের চাপেই তা পাস করানো হয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট ডক্টর হাসান রুহানি মার্কিন কংগ্রেসের ইরান-বিরোধী নতুন বিল পাস করার ঘটনাকে পরমাণু সমঝোতার লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন এবং এর কঠোর জবাব দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী মার্কিন সরকারকে বড় শয়তান বলে উল্লেখ করতেন। ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতাও মার্কিন সরকারকে একই দৃষ্টিতে দেখেন এবং তার মতে মার্কিন সরকার নোংরা আন্তর্জাতিক ইহুদিবাদী চক্রের হাতের পুতুল আর এই চক্রকে স্বাধীন জাতিগুলোর শত্রু ও বিশ্বের বেশিরভাগ যুদ্ধের হোতা বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ির  মতে মার্কিন মদদপুষ্ট আন্তর্জাতিক ইহুদিবাদী চক্র জাতিগুলোর সব ধরনের সম্পদ শোষণ করছে।  

তিনি বলেছেন, একটি অনগ্রসর ও পর-নির্ভর দেশ ইরান স্বাধীন নীতি এবং ইসলামী বিপ্লবের সুবাদে রাজনৈতিক, সামরিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে দিনকে দিন প্রভাবশালী ও অসাধারণ শক্তিশালী দেশে পরিণত হচ্ছে দেখেই মার্কিন সরকার ক্রুদ্ধ ও আতঙ্কিত।

ইরানের সর্বোচ্চ একই প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, 'ইসলামী বিপ্লবের প্রথম থেকেই এর সঙ্গে শত্রুতা করেছে মার্কিন সরকার। সে সময় ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু কিংবা আঞ্চলিক প্রভাব বলতে কিছুই ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও মার্কিন সরকার ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক শত্রুতা করছিল এর কারণ তারা বুঝতে পারছিল যে ইসলামী বিপ্লবের ফলে ইরানের মত একটি বৃহৎ অথচ অনুগত ও অত্যন্ত লাভজনক দেশকে তারা হাতছাড়া করেছে।'

ইসলামী ইরানের সঙ্গে মার্কিন সরকারের অব্যাহত শত্রুতার কারণ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও গবেষক একেএম আনোয়ারুল কবির বলেছেন:

"মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন সারা বিশ্বের ওপর মার্কিন আধিপত্যকে তিনটি দেশ মেনে নিতে পারছে না। এ তিনটি দেশ হল: রাশিয়া, চীন ও ইরান। আমেরিকা চায় সারা বিশ্বে তার আধিপত্য বিস্তার করতে। সেই আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে-ই দাঁড়াবে আমেরিকা তাকে তার শত্রু মনে করবে। ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরান ও ইসরাইল ছিল আমেরিকার সবচেয়ে বড় বন্ধু। তারা ইরানের তেল অনেক কম দামে নিয়ে যেত এবং ইরানে তাদের তিন হাজার সামরিক ও বেসামরিক উপদেষ্টা ছিল। ইরানের নানা প্রদেশে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানা ধরনের ৫০ হাজার মার্কিন কর্মকর্তা ছড়িয়ে পড়েছিল। ইরানে এত বেশি ছিল তাদের প্রভাব। এর আগে ব্রিটিশরা কর্তৃত্ব করছিল ইরানে। সে সময় ব্রিটিশরাই ক্ষমতায় এনেছিল মোহাম্মাদ রেজা শাহকে তার পিতা রেজা শাহকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে।  ইরানে শুধু এক পুতুল সরকার ছিল। ব্রিটিশরা যেভাবে চাইত সেভাবেই তারা চালাত ইরানের শাহ-সরকারকে। ৭০ বছর আগে ব্রিটিশদের সরিয়ে দিয়ে ইরানের কর্তৃত্ব গ্রহণ করে আমেরিকা। তখন তারা ইরানের শীর্ষ-শাসক থেকে শুরু করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের কব্জায় নিয়ে নিয়েছিল। মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশেরও একই অবস্থা। অনেক অমুসলিম দেশেও আমেরিকা সরকার পরিবর্তন থেকে শুরু করে যা চায় তা-ই করতে পারে। ইসলামী ইরানে তারা এমনটি করতে পারছে না বলেই এর সঙ্গে শত্রুতা করছে। 

 ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে কার্টার ও রিগ্যানসহ যত মার্কিন প্রেসিডেন্টই ক্ষমতায় এসেছেন তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বা যুদ্ধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু যখন দেখেছেন তা করা সম্ভব নয় তখন তারা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এর কারণ তাদের ভাষায় ইরান একটা বেয়াড়া ছেলে যে তাদের কথা শোনে না। তাদের আধিপত্যকে মেনে নেয় না। যেসব সুযোগ-সুবিধা তারা বিশ্বের নানা দেশ থেকে চায় ও বিশ্বের নানা দেশে তারা যেসব শোষণ ও নির্যাতন চালাতে চায় ইরান তা মেনে নেয় না। গত ৪০ বছরে এ জন্যই ইরানের সাথে তাদের এত শত্রুতা। তারা কখনও ইরানে সরকার পরিবর্তনের কথা বলে। কখনও বলে ইরানে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নেই। কিন্তু এসব অপবাদের পক্ষে তারা কোনো প্রমাণ বা বিশ্বাসযোগ্য দলিল বিশ্ব-জনমতের কাছে তুলে ধরতে পারেনি। এ থেকে বোঝা যায় জনগণ যদি সমর্থন দিয়েও কোনো ইসলামী সরকারকে টিকিয়ে রাখে মার্কিন সরকার তা মেনে নিতে পারে না। "    

এটা স্পষ্ট ইরানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে লেবানন, ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক মার্কিন ষড়যন্ত্রগুলো ব্যর্থ হওয়ায় পেন্টাগন তেহরানের ওপর মহা-ক্ষুব্ধ ফলে হোয়াইট হাউজের ইরান-বিদ্বেষও ক্রমেই জোরদার হচ্ছেকিন্তু  ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী বলদর্পি মার্কিন সরকারগুলোর মত বর্তমান মার্কিন সরকারও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হবে বলে বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।#

পার্সটুডে/এমএএইচ/১০

 

 

ট্যাগ

২০১৮-০২-১২ ০১:৩৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য