যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের সুবাদে মানব সমাজ প্রবেশ করেছে নতুন এক জগতে। এর নাম ভার্চুয়াল জগত। বাস্তব জগতের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সংযোগের মধ্যদিয়ে এ জগত সমৃদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর ফলে আরও গতিময় হয়ে উঠছে মানব জীবন।

ইন্টারনেট কেন্দ্রিক এ জগতে সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই। রাত-দিনের বিভাজন নেই। সত্যিকার অর্থেই ভার্চুয়াল জগত স্থান ও সময়ের প্রচলিত ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে। এই জগতের কল্যাণে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে নিমিষেই। এক সময় যা ছিল অকল্পনীয়। এসব কারণে বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থাকে আর পুরনো মানদণ্ড ও কাঠামোর ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে ভার্চুয়াল জগত নানা সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন সংকটেরও জন্ম দিয়েছে। নানা বৈশিষ্ট্যের কারণে যোগাযোগের ধরন ও মডেলে পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো মানুষের বাস্তব জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরতার কারণে মানুষের আচার-আচরণেও পরিবর্তন আসছে। এ পরিবর্তন কখনো ইতিবাচক কখনো আবার নেতিবাচক। সাধারণ জ্ঞান অর্জন যেমন সহজ হয়েছে তেমনি সহজে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পথও খুলে গেছে। যোগাযোগ হয়ে পড়ছে যন্ত্রকেন্দ্রিক। বলা হয়ে থাকে, অনেকেই একসঙ্গে বসবাস করলেও তথ্য আদান-প্রদান করেন যন্ত্রের মাধ্যমে। এর ফলে মাধ্যমবিহীন যোগাযোগ ও সম্পর্ক ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে বাস্তবিক অর্থে কোনো বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা করতে হয় না। প্রয়োজনে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই সব কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার নির্দিষ্ট কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করলেও বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে তা এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় এ জগতে। তবে বাস্তবতা হলো, ভার্চুয়াল জগতে একজন ব্যবহারকারী যে স্বাধীনতা ভোগ করেন তা আসলে প্রকৃত কোনো স্বাধীনতা নয়। এর মধ্যদিয়ে একজন ইউজার কেবল মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে স্বস্তি লাভ করতে সক্ষম হন।  

ভার্চুয়াল জগত হচ্ছে এমন এক জগত যেখানে মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটে কম্পিউটার, মোবাইল তথা যন্ত্রের সহযোগিতায়। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড বা ভার্চুয়াল জগত পরিভাষাটি প্রথমবার ব্যবহার করেন উইলিয়াম গিবসন। তিনি হচ্ছেন সায়েন্স ফিকশনের বিখ্যাত লেখক। মানুষে-মানুষে যে যোগাযোগ ও লেনদেন তা বাস্তব জগতের বিপরীতে বিশ্বজনীন এবং এখানে একজন ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখতে পারে। এই জগতের নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তা সম্পর্কে একটু চিন্তা করলেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল ও চ্যাটরুমের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে তৎপরতা চালান।

ইন্টারঅ্যাকশন বা মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে ভার্চুয়ালজগতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেখানে একইসঙ্গে পরস্পরকে দেখা যায়, কথা বলা যায়, লিখে বা না লিখে ভাব প্রকাশ করা যায়। রেডিও, টিভি ও পত্রপত্রিকার মতো গণমাধ্যমে যা এত ব্যাপকভাবে সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে এই জগতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। তথ্য ও যোগাযোগ সংক্রান্ত প্রযুক্তির সহযোগিতায় এসব ঘটনা ঘটছে। ভার্চুয়াল জগত মানুষের সামনে এমন সব দিগন্ত খুলে দিয়েছে যা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো সম্ভব। ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও এর বিপদের মাত্রাও কম নয়। এই জগতে তৎপর সব শ্রেণির মানুষেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বাস্তব জগতের মতো ভার্চুয়াল জগতেও তৎপর রয়েছে নানা পর্যায়ের অপরাধী। যারা ভালো মানুষের ছদ্মবেশে প্রতিনিয়ত মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। কখনো হাতিয়ে নিচ্ছে মানুষের সর্বস্ব। অনেক দুষ্টু স্বভাবের পুরুষ নারীর নাম ব্যবহার করে সরল মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ধোকা দিচ্ছে। 

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন। অনুন্নত দেশগুলো অন্যের ওপর প্রভাব ফেলতে খুব একটা সক্ষম নয়। তবে এসব দেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উন্নত দেশগুলোর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে তাহলো ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা বিনষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাহলো তরুণ বয়সীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে মোবাইলের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে সময় ব্যয় করাকে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে পারিবারিক আড্ডায় বসার প্রবণতা কমে গেছে। শুধু তাই নয় ভার্চুয়াল জগত মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। ভারতের বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্স'র গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অত্যধিক পরিমাণে ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে নষ্ট হচ্ছে মানুষের ঘুমের সময়। আর সেই সময়টা আবার ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সোশ্যাল সাইটের নেশা প্রতিদিন গড়ে কেড়ে নিচ্ছে একেকজন ইউজারের ১০০ মিনিটের ঘুম। আর এই ঘটনা ঘটছে তাদের অজান্তেই।

ওই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ইন্টারনেটের নেশার কারণে ঘুম থেকে উঠতেও একেকজনের গড়ে দেরি হয় প্রায় ৯০ মিনিট। চিকিৎসকদের মতে, এভাবে দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে হৃদরোগ এবং অ্যাংজাইটির সমস্যা। এর আগে ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কম বয়সী রোগী হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের ৯০ শতাংশই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে পারেন না। এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, ভার্চুয়াল জগত আমাদের জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল জগত আমাদের জন্য যেমন নানা সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে ঠিক তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছে বিপদের আশঙ্কা। একটু অসতর্কতা ও অসচেতনতা বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।#

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/আশরাফুর রহমান/২১

২০১৮-০২-২১ ২০:৫৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য