"ভার্চুয়াল জগত: সম্ভাবনা ও শঙ্কা" শীর্ষক ধারাবাহিক অনুষ্ঠানের এ পর্বে 'পরিবারের ওপর ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব' নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেছনে মানুষ এখন অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে। আমরা বলছি না, এসবের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এর ব্যবহার হচ্ছে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। পরিবারের সদস্যরা ইন্টারনেটের পেছনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। দূরত্ব বাড়ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও। তরুণদের মাঝেই ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ঝোঁক-প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এ কারণে তরুণ সমাজের মধ্যে একধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি আসক্ত তরুণরা এখন আর আগের মতো একজায়গায় বসে গল্প-গুজব করতে খুব একটা আগ্রহী নয়। এর ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও মনের টান কমে যাচ্ছে।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মনের দূরত্ব বাড়লে পরিবারের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে তালাকের মতো ঘটনা বেড়ে যায় এবং পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের সদস্যদের মধ্যে অমিল ও মতবিরোধ আর সহনীয় পর্যায়ে থাকে না। পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও পারিবারিক সহিংসতা কমছে না। এর কারণ হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও আলোচনার অভাব। এর ফলে তাদের মধ্যে প্রত্যাশিত সহমর্মিতা দেখা যায় না এবং ছোটখাটো বিষয়েও ঝগড়া লেগে যায়। বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ আলোচনা ও গল্প-গুজবের স্থান দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগত। এ অবস্থায় পারিবারিক কাঠামোকে দৃঢ় ও শক্তিশালী রাখতে ভার্চুয়াল জগতের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি হয়ে পড়েছে।

দূরত্ব বাড়ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে

যেমনটি এর আগেও আমরা আলোচনা করেছি বর্তমানে পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভার্চুয়াল জগত। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বড়দের অভিজ্ঞতা ও নির্দেশনা অনেকের কাছেই আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। আবেগের বশবর্তী হয়ে সঙ্গী নির্বাচনের প্রবনতাও দিনদিন বেড়ে চলেছে। বিশেষকরে স্বামী বা স্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক দিকগুলো বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। অনভিজ্ঞ তরুণ-তরুণীরা জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তালাক বা বিচ্ছেদের মতো ঘটনা অনেক বেড়েছে। ইন্টারনেটভিত্তিক কথোপকথন কখনোই পারিবারিক বৈঠকগুলোর বিকল্প হতে পারে না। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা ও আকর্ষণ হচ্ছে পবিত্র। এই ভালোবাসা ও আকর্ষণের ভিত্তিতেই পারিবারিক সুখ নিশ্চিত হতে পারে।

আমরা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতি আকর্ষণ ও অতি নির্ভরতার কারণে নানা সমস্যা সৃষ্টি হওয়া নিয়ে কথা বলছি। তবে একইসঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ভার্চুয়াল জগতের প্রতি নির্ভরতা সৃষ্টির পেছনে যেসব বিষয় কাজ করে সেগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। একটি পরিবারের অভিভাবকরা অর্থাৎ বাবা-মা উভয়ই যখন চাকরিজীবী হন তখন তারা সন্তানদেরকে বেশি সময় দেন না বা চাইলেও দিতে পারেন না। এ অবস্থায় সন্তানেরা একাকিত্বে ভুগে। তারা সময় কাটাতে ভার্চুয়াল জগতের আশ্রয় নেয়। ইন্টারনেটে ঢুকে নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাঙ্খিত বন্ধু-বান্ধবীর খোঁজ করতে থাকে। বড়দের পরামর্শ ছাড়াই এ ধরনের জগতে প্রবেশ করার কারণে কখনো কখনো বড় ধরনের ধোঁকা খায় তারা।  

ক্লাসে মন নেই শিক্ষার্থীদের

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া এখন এতোটাই সহজ যে, সব বয়সের মানুষই সেখানে তৎপরতা চালাতে পারে। এ অবস্থায় পরিবারের অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি। বাবা-মা'র উচিত সন্তানদের জন্য কিছু সময় ব্যয় করা যাতে তারা একাকিত্ব অনুভব না করে। বর্তমান যুগের ব্যস্ত জীবন পদ্ধতিতে বাবা-মায়েরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে ভুলটি করেন তাহলো, তারা সন্তানকে সব কিছুই দেন শুধু সময় ছাড়া। বাবা-মা সন্তানের জন্য বাড়ি-গাড়ি কেনেন, ভালো স্কুলে ভর্তি করেন, ভালো খাবার ও পোশাক দেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে যে সময় কাটানো দরকার, তাদেরকে যে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেয়া দরকার সে কথা ভুলে যান। সন্তানেরা স্কুল-কলেজে গিয়ে কী করছে, তার বন্ধু কে অথবা ইন্টারনেটে সে কাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে সেসব তথ্য বাবা-মায়েরা অনেক সময়ই জানেন না। এর ফলে বাবা-মায়ের অজান্তেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এ ধরনের প্রবণতা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মানুষের মতো ইরানিদের মধ্যেও দেখা যায়। এ কারণে এ নিয়ে এ দেশে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইরানের তেহরান, মাশহাদ, ইস্ফাহান, শিরাজ ও গিলান প্রদেশে বিয়ের প্রথম তিন বছরের মধ্যে যেসব তালাকের ঘটনা ঘটে এর ১৭ শতাংশই ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাস্তবতার চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণেই পরবর্তীতে বিচ্ছেদের ঘটনা বেশি ঘটে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। অনেকেই আবার জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি জানে না বা জানলেও তা প্রয়োগ করে না। এ কারণেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাকের ঘটনা ঘটে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, বিয়ের পর স্বামী বা স্ত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি ঝোঁকে পড়ে। সাংসারিক সমস্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিম সুখের সন্ধান করেন অনেক মানুষ।

এ অবস্থায় কেউ কেউ সুস্থ্য বিনোদনের সন্ধান করতে গিয়ে বিপথে চলে যান। স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানো বেশি আকর্ষনীয় মনে হয়। এরপর তা এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়। ফলে সাংসারিক যে ঝামেলা সহজেই মিটে যেতে পারতা তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল হয়ে পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের জন্য নানা সুযোগ এবং সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। আমরা কীভাবে, কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করছি তার ওপর নির্ভর করে আমরা এই জগত থেকে উপকৃত হবো নাকি বিপদগ্রস্ত হবো। বাস্তবতা হলো, ভার্চুয়াল জগতকে এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজেই এ জগতকে মেনে নিয়ে সচেতনভাবে তা ব্যবহার করতে হবে।#

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/আশরাফুর রহমান/২৪  

  

ট্যাগ

২০১৮-০২-২৪ ১৮:১২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য