রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, বর্তমান পৃথিবীর সাড়ে সাতশ কোটি মানুষ কোনো না কোনো পরিবারে বাস করে। এসব পরিবারে সকল সদস্যই অন্যদের কমবেশী ভালোবাসে। তবে সব পরিবারই যে আদর্শ পরিবার এ কথা বলা না গেলেও বিশ্বের সকল মুসলমান ও আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও আদর্শ পরিবার হচ্ছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবার।

ওই পরিবারের প্রতিটি সদস্য ছিলেন মানুষের আদর্শ। মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য যে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিজেদের সম্পদ, সময়, মেধা ও যোগ্যতাকে ব্যয় করে গেছেন।

রাসূলেখোদা তাঁর পরিবারের যেসব সদস্যকে আমাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ এবং যাদের নেতৃত্ব মেনে চলতে বলেছেন তাদেরকে আহলে বাইত বলা হয়। আহলে বাইতে প্রথম ইমাম ছিলেন আমীরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) এবং শেষ ইমাম হচ্ছেন ইমাম মাহদী (আ.)।

আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মহানবী বলেছেন, আমার আহলে বাইতের উদাহরণ হযরত নুহ (সা.)-এর নৌকার মত। যারা নৌকায় আরোহন করল, তারাই রক্ষা পেল। আর যারা তা থেকে বিরত থাকল তারাই ডুবে মরল।  রাসূলেখোদা আরও বলেন, আমি তোমাদের মাঝে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রেখে যাচ্ছি। তা হচ্ছে, মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও আমার পবিত্র আহলে বাইত। এ দু’টো জিনিস হাউজে কাওসারে অর্থাৎ কেয়ামতের দিন আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।

এ হাদিসে যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা হলো, পবিত্র কুরআন যেভাবে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত মানব জাতির মাঝে টিকে থাকবে, মহানবীর পবিত্র আহলে বাইতও তেমনি মানব জাতির মাঝে কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে। এ হাদিসে আরও একটি বিষয় বলা হয়েছে, আর তাহলো-মানুষ যদি আহলে বাইতের আনুগত্য করে এবং তাদের কথা মেনে চলে,তাহলে কখনোই তারা পথভ্রষ্ট হবে না। কেননা তারা সর্বদাই সত্যের সাথে অবস্থান করছেন।

পাক পাঞ্জতন

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, আমি মহানবীকে একবার  জিজ্ঞেস করলাম, আপনার যেসব আত্মীয়কে ভালোবাসা আমাদের জন্য ওয়াজিব, তারা কারা? জবাবে নবীজী বললেন- আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন। এভাবে নবীজী তার আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন।  

বন্ধুরা, আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা জানলে। এবার আমরা মানুষের জীবনে তার বংশের প্রভাব সম্পর্কে একটি গল্প শোনাব। গল্পের পর থাকবে একটি গান। আর সব শেষে থাকবে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার।

রুটিওয়ালার ছেলে বাদশাহ

অনেক দিন আগে তৎকালীন পারস্যে তথা ইরানে এক বাদশাহ বাস করতেন। তার হাতিসালে হাতি, ঘোড়াসালে ঘোড়া, অসংখ্য লোক-লস্কর, বিশাল সেনাবাহিনী কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। রাজভাণ্ডারে অজস্র ধনরত্ন। মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরাও প্রত্যেকেই যথেষ্ট জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত ব্যক্তি। রাজ্যের প্রজারা বাদশাহর প্রতি নরম কৃতিজ্ঞ। এভাবে সবাইকে নিয়ে বাদশাহ'র দিন ভালোই যাচ্ছিল।

একদিন সে রাজ্যে এক মহাজ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তির আগমন ঘটল। তিনি ধন বা নাম নয়; গুণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে মানুষকে বিচার করেন। পণ্ডিত ব্যক্তিটি বেশিদিন এক স্থানে থাকেন না। তিনি পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ান এবং নানারকম বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে মানুষকে সহযোগিতা করেন। এতে জনগণ খুশি হয়ে এই পণ্ডিতকে যা কিছু উপহার দেয় তাই দিয়ে তার জীবিকা নির্বাহ হয়ে যায়।

একদিন প্রধানমন্ত্রী বাদশাহকে বললেন, বাদশাহ নামদার! আমাদের রাজ্যে এক মহাজ্ঞানী ব্যক্তির আগমন ঘটেছে এবং তিনি আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছেন। তখন বাদশাহ বললেন, এ তো খুব খুশির কথা। মন্ত্রী মহোদয় আপনি কাল সকালেই জ্ঞানী ব্যক্তিটিকে আমার রাজসভায় নিয়ে আসেন।

যেই কথা সেই কাজ। পরদিন সকালেই জ্ঞানী ব্যক্তিটি বাদশাহর দরবারে হাজির হয়ে বাদশাহকে সালাম জানালেন। বাদশাহ জ্ঞানী ব্যক্তিটির সঙ্গে কথা বলে খুব খুশি হলেন এবং রাজপ্রাসাদের অতিথি মহলে তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

একদিন সকালে বাদশাহ প্রাতঃভ্রমণ শেষে প্রাসাদে ফেরার পথে একটি সাদা পাথর সঙ্গে নিয়ে এলেন এবং পাথরটি রাজ সিংহাসনের এক পাশে রেখে দিলেন। তারপর রাজসভায় সবার সামনে জ্ঞানী ব্যক্তিটিকে ডেকে বললেন, আচ্ছা পণ্ডিত মহাশয়, বলুনতো! এই সাদা পাথরটির মাঝখানে একটি চিকন সবুজ দাগ কেন? তখন পণ্ডিত ব্যক্তিটি বললেন, মহারাজ ভয়ে বলব না নির্ভয়ে বলব?

বাদশাহ বললেন, আপনি নির্ভয়ে বলেন। তবে পাথরটি ভাঙার পর যদি আপনার কথা সে ঠিক না হয় তাহলে আমি কিন্তু আপনার গর্দান নেব- আপনি এ প্রস্তাবে রাজি আছেন তো? জ্ঞানী ব্যক্তিটি বললেন, জী, আমি রাজি।

এবার জ্ঞানী ব্যক্তিটি বললেন পাথরের ভেতর একটি সবুজ রঙের পোকা আছে। এ কথা শুনে কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। সঙ্গে সঙ্গে সেই সাদা সুন্দর পাথরটিকে ভেঙে দুই ভাগ করা হলো। আর সত্যি সত্যি পাথরটির ভেতর থেকে একটি সবুজ রঙের পোকা বেরিয়ে এলো। তখন বাদশাহ জ্ঞানী ব্যক্তিটির পাণ্ডিত্য দেখে অবাক হয়ে গেলেন এবং তিনি এর পুরস্কার হিসেবে পণ্ডিত ব্যক্তিটির খাবার তালিকায় ছয়টি রুটি বাড়িয়ে দিলেন।

রাজদরবারের প্রত্যেকেই এতে খুশি হলেন এবং বাহবা দিলেন। এভাবে দিনে দিনে পণ্ডিত লোকটি বাদশাহর অনেক আশ্চর্যজনক প্রশ্নের জবাব দিয়ে বাদশাহকে অবাক করে দিলেন। একদিন পণ্ডিত ব্যক্তিটি বললেন- জাঁহাপনা, বহুদিন তো আপনার মেহমানখানায় ছিলাম, বেশ খাওয়া-দাওয়াও করেছি, এবার আমি অন্য দেশে যাব, কারণ দেশভ্রমণ আমার নেশা। এতে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে এবং বিচিত্র মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়।

বাদশাহ বললেন ঠিক আছে, তবে যাওয়ার আগে আমার শেষ প্রশ্নের উত্তরটা আপনাকে দিয়ে যেতে হবে। জ্ঞানী ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গেই বাদশাহর কাছে শেষ প্রশ্নটি জানতে চাইলেন। তখন বাদশাহ বললেন, বলুনতো! আমি কার ছেলে? এবার জ্ঞানী লোকটি বললেন, হুজুর এ অনেক কঠিন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর শুনলে আপনি আমার গর্দান কেটে নেবেন। তখন বাদশাহ অভয় দিয়ে বললেন, কখনোই না। আপনি নির্ভয়ে বলুন। লোকটি বললেন, জাহাপনা, আপনি একজন রুটিওয়ালার ছেলে। এ কথা শুনে রাজার দরবারের লোকজন ভয়ে কেঁপে উঠল।

রাজসভায় গুঞ্জন শুনে বাদশাহ দাঁড়িয়ে বললেন, থামুন আপনারা, আমার পূর্ব পুরুষ যে বাদশাহ ছিলেন এ কথাতো আপনারা সবাই জানেন। তবে আমি জ্ঞানীর জ্ঞানকে শ্রদ্ধা করি, তাই আমি ভেবেচিন্তে আগামীকাল জানাব যে, জ্ঞানী ব্যক্তির গর্দান কাটা যাবে কি যাবে না।

এ কথা বলে বাদশাহ প্রাসাদের ভেতরে তার মায়ের ঘরের কাছে চলে গেলেন। অসময়ে নিজের ছেলের চিন্তাযুক্ত মুখচ্ছবি দেখে বাদশাহর মা চিন্তিত হলেন। বাদশাহ তার মায়ের পায়ের কাছে বসে বললেন, মা আমি আজ চরম পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছি। এই বলে বাদশাহ মায়ের কাছে জ্ঞানী লোকটির সব কথা খুলে বললেন।

তখন বাদশাহর মা নম্রভাবে বাদশাহকে বললেন, হ্যাঁ বাবা! তুমি একজন রুটিওয়ালার ছেলে। আমাদের বংশ রক্ষা করার মতো কেউ ছিল না। এ নিয়ে আমাদের মনে খুব দুঃখ ছিল। একদিন আমাদের রাজ্যের এক রুটির দোকানদারের খুব সুন্দর ফুটফুটে একটি ছেলে হলো। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই সেই রুটিওয়ালা এবং তার বউ বজ্রপাতে মারা গেল, আর অসহায় অবস্থায় সেই ছোট্ট শিশুটি বাড়ির এক কোণে পড়ে রইল। তুমিই সেই অসহায় শিশু। সেই রুটিওয়ালার কথা সবাই ভুলে গেল এবং তুমি আমাদের রাজ বংশের পুত্রসন্তান হিসেবে পরিচিতি পেয়ে বড় হয়ে উঠল।

পরদিন বাদশাহ খুশি মনে রাজসভায় গিয়ে বসলেন। জ্ঞানী ব্যক্তিটিও বাদশাহকে সালাম জানিয়ে নিজ আসন গ্রহণ করলেন। তখন ঘটল এক অবাক কাণ্ড!

বাদশাহ সিংহাসন ছেড়ে জ্ঞানী ব্যক্তিটির কাছে উঠে এলেন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আপনার জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি, কারণ সত্যিই আমি একজন রুটিওয়ালার ছেলে। কিন্তু আপনার কাছে এই মুহূর্তে আমার একটা প্রশ্ন, আপনি কিভাবে বুঝলেন আমি রুটিওয়ালার ছেলে?

তখন জ্ঞানী ব্যক্তিটি মৃদু হেসে নম্রভাবে বললেন, আপনার উপহার দেয়ার ধরন দেখে। কারণ যতবার আমি আপনার বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক জবাব দিয়েছি ততবার উপহার হিসেবে আপনি আমাকে রুটি দিয়েছেন। কিন্তু বাদশাহ হিসেবে আপনি আমাকে অন্য কোনো উপহার দেননি। আর এ থেকে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, আপনি একজন রুটিওয়ালার ছেলে।

তারপর বাদশাহ জ্ঞানী ব্যক্তিটির সঙ্গে একমত হলেন এবং খুশিমনে তাকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। যাওয়ার সময় জ্ঞানী ব্যক্তিটি সবার উদ্দেশ্যে বলে গেলেন- নামে নয়, গুণেই মানুষের আসল পরিচয়, কারণ নামে কখনো আভিজাত্য প্রকাশিত হয় না। মানুষের নিজের আচার-ব্যবহারের মাধ্যমেই তার বংশমর্যাদা ও আভিজাত্য ফুটে ওঠে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/৩

ট্যাগ

২০১৮-০৩-০৩ ১৮:১৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য