এবিইউ বা এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ের কার্যক্রম প্রৃকত লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও মেধাবীদের সৃষ্টিকর্ম যাতে পাইরেটেড না হয় সে ব্যাপারে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। এবিইউয়ের কার্যক্রমের ফলে বর্তমান ডিজিটাল যুগে যারা পাইরেটেড করছে তারা সমস্যায় পড়বে।

রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বললেন বাংলাদেশ বেতারের সংগীত ও ট্রাফিক সমন্বয় বিভাগের পরিচালক আনোয়ার হোসেন মৃধা। তিনি বললেন, লেখক, কবি,সাহিত্যিক, ব্রডকাস্টার, গবেষকসহ সৃষ্টিশীলদের রয়ালিটি সংরক্ষণে এবিইউয়ের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরফলে সৃজনশীল কাজে মানুষ অনেক বেশি উৎসাহী হবে এবং প্রতিটি কাজে তাঁরা যথাযোগ্য সম্মান এবং সম্মানী পাবে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। এটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব আনোয়ার হোসেন মৃধা, ইরানে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়নের দ্বিতীয় সভায় বাংলাদেশের পক্ষে আপনি যোগ দিলেন। আমাদের শ্রোতাদেরকে এই সম্মেলনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে যদি একটু বিস্তারিত জানাতেন।

তেহরানে অনুষ্ঠিত এবিইউয়ের দ্বিতীয় সভা

আনোয়ার হোসেন মৃধা: দেখুন, 'এবিইউ বা এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ের  ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যান্ড  লিগ্যাল কমিটির এটি ছিল দ্বিতীয় সভা। বিষয়টিকে আমি এভাবে বলতে চাই- এবিইউয়ে'র কার্যক্রম শুরু হয়েছে ১৯৮৮ সাল থেকে। আর গতবছর থেকে 'এবিইউ বা এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ের  ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যান্ড  লিগ্যাল কমিটির নামে প্রথম সভা শুরু হয়, এবার তেহরানে অনুষ্ঠিত হলো এর দ্বিতীয় সভা। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা বা আইআরআইবি'র আয়োজনে দ্বিতীয় সভাটি হয়েছে।

এই সভার লক্ষ্য উদ্দেশ্যের বিষয়টি এরকম যে, ধরুন একজন কবি, সাহিত্যিক, লেখক তাঁর মেধা দিয়ে একটি কবিতার বই, গল্প বা উপন্যাস লিখলেন। অনেক পরিশ্রম দিয়ে তিনি তাঁর এ কাজটি করেছেন এবং এ কাজের জন্য তাঁর একটি মেধাস্বত্ব  এবং স্বীকৃতি থাকা উচিত। এরফলে যিনি কষ্ট করে কোনো কিছু সৃষ্টি করবেন তাঁর সেই সৃষ্টিকর্ম যাতে কেউ পাইরেটেড করতে না পারে। আর এবিইউয়ের একাধিক আর্টিকেলে এ বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বেতার বা রেডিও এবং টেলিভিশন এখন আর শুধু রেডিও ও টেলিভিশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখন এসব মাল্টিমিডিয়া হয়ে গেছে। আর এই মাল্টিমিডিয়ার সাথে  সোশ্যাল মিডিয়া এক হয়ে এখন শ্রোতা এবং দর্শকদের কাছে উপস্থাপিত হচ্ছে। একজন লেখকের একটি বই লেখার জন্য তার একটি মেধাস্বত্ব বা রয়ালিটি ছিল সেটি এখনও আছে তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে এসে নানারকম পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। আর সেকারণেই রয়ালিটি সংরক্ষণেরও নতুন প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আমাদের এ সভায় সেসব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। 

রেডিও তেহরান: আচ্ছা তেহরানে 'এবিইউ'র দ্বিতীয় সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো এশিয়ার গণমাধ্যমের ওপর কী ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করছেন?

আনোয়ার হোসেন মৃধা: হ্যাঁ 'এবিইউ'এর সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো গণমাধ্যমের ওপর ভূমিকা রাখবে।

ধরুন বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটা সংবাদ, রেডিও বা টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান অথবা একটি ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে একজন প্রযোজক বা লেখকের কী ধরনের স্বত্ব থাকতে পারে? এ বিষয়টি আসলে বোঝানো খুব মুশকিল। বিষয়টি যদি আবার আপনি এভাবে দেখেন যে রেডিও তেহরান বা বাংলাদেশ বেতারের একটি অনুষ্ঠান শ্রোতারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে শুনতে পাচ্ছে। এমনকি রেডিও এবং টেলিভিশনের অনলাইনও আছে আবার স্যাটেলাইট ভার্সনও আছে। এখন আপনার একটি অনুষ্ঠানের বর্ণনা, চরিত্র বা বৈশিষ্ট্য দিয়ে প্রমাণ করা যাবে যে আপনি ওই অনুষ্ঠানটির প্রযোজক। যে কেউ আপনার অনুষ্ঠানটি পাইরেটেড করতে পারে। একজন ব্যক্তি তার অনেক মেধা খাটিয়ে অর্থ ব্যয় করে একটি অনুষ্ঠান তৈরি করলেন অথচ সেই অনুষ্ঠানটি একজন ব্যক্তি না শুনে না বুঝে রেকর্ড করে অন এয়ারে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিতে পারেন বর্তমান ডিজিটাল যুগে। সেক্ষেত্রে যে ব্যক্তিটি অনুষ্ঠানটি করলেন তিনি কিন্তু বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তার অধিকার কী হবে? তাঁর যে স্বত্ব সেটাও বা কিভাবে নির্ধারণ করা হবে? এমন একটি প্রশ্ন বর্তমানে হরাহামেশাই উঠছে। অথচ কোন্ বৈশিষ্টের মাধ্যমে ধরা যাবে যে এ অনুষ্ঠানটি অমুকের বা এক্স ওয়াই জেডের।

এবিইউ বা এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন

একটা কবিতার বই হলে বা একটি উপন্যাস হলে আমরা সহজে ধরতে পারি যে এটি ওমুক কবি বা উপন্যাসিকের লেখা। কিন্তু ডিজিটাল ভার্সন এমন একটি জিনিষ সেখানে আপনি কিছুই দেখতে পারছেন না। ডিজিটাল জগৎ বিশাল একটি জগৎ। সেখানে কোথায় কে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। ধরুন বাংলা ভাষায় কেউ একটা বই লিখলে সেটা বাংলা ভাষা অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। সেখানে কপিরাইট চেক করা সম্ভব হতো কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল যুগে বাংলায় লেখা একটা বই মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের সবখানে চলে যাচ্ছে। বইটির মূল যে লেখক; তাঁর মেধা-মনন, শ্রম, আগ্রহ, চেষ্টা  সবকিছু ব্যয় করে একটি বই লিখলেন অথচ মুহূর্তের মধ্যে অপব্যবহারের মাধ্যমে বইটি বিশ্বজুড়ে পাইরেটেড হয়ে গেল। এ বিষয়টি আইনগতভাবে কিভারে রোধ করা যায়। তা নিয়ে এই 'এবিইউ' কাজ করছে। এ বিষয়গুলো বর্তমানে বিশ্বের সবখানে আছে। এ বিষয়ের ওপরই সংস্থাটি কাজ করছে এবং সিদ্ধান্তগুলো ভূমিকা রাখবে বলে আশাকরি।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এবিইউয়ের সিদ্ধান্তগুলো কী কোনো ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করছেন?

আনোয়ার হোসেন মৃধা: বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও এবিইউয়ের সিদ্ধান্তগুলো ভূমিকা রাখবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে পাইরেটেডের বিষয়গুলো বাংলাদেশেও আছে। বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনও এজাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।

ধরুন বাংলাদেশের কোনো একটি আদালতে কোনো একটি বই, গান, ডকুমেন্টারি বা এধরনের কোনো  কিছু নিয়ে যদি  রয়ালিটি সম্পর্কিত একটি মামলা হয় তাহলে সেক্ষেত্রে যথেস্ট বিধিবিধান এবং আইন-কানুন আছে। শুধু বাংলাদেশ নয় উন্নতদেশগুলোসহ  বিশ্বের প্রায় সবখানেই এ ধরনের আইন-কানুন আছে। কিন্তু উন্নত বিশ্বেও যদি একজন ব্রডকাস্টার আদালতের কাছে কোনো মামলা নিয়ে গিয়ে বলে যে আমার একটা উপস্থাপনা একজন পাইরেটেড করে নিয়ে গেছে। সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়া একজন বিচারকের জন্য খুব কষ্টসাধ্য বিষয়। কারণ এটি প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট বৈশিষ্ট থাকতে হবে।

তবে কোন্ বৈশিষ্ট্য থাকলে প্রমাণ করা সম্ভব হবে যে কাজটি অভিযোগকারী ব্রডকাস্টারের- সে বিষটি নিয়েই 'এবিইউ বা এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ের  ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যান্ড  লিগ্যাল কমিটি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। তেহরানে দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হলো। তবে এই কমিটি সবসময় এ বিষয়ে কাজ করছে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের সম্প্রচার  ব্যবস্থার যে বহুমাত্রিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে 'এ বি ইউ বা এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ের  ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যান্ড  লিগ্যাল কমিটির আইন বা কনভেনশনগুলো কীভাবে কাজ করবে সে বিষয়টি নিয়ে নানা মাত্রায় তারা প্রতিনিয়ত কাজ করছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সম্প্রচারের বহুমাত্রিক ব্যবস্থায় একজন প্রযোজক, একজন ব্রডকাস্টার, একজন লেখক বা একজন পারফর্মারের স্বত্ব বা রাইটকে নিখুঁতভাবে করার জন্য এবিইউ কাজ করছে।

এর প্রভাব কোথায় কিভাবে পড়বে

এর প্রভাব কোথায় কিভাবে পড়বে- সে বিষয়টিকে আমি এভাবে বলতে চাই-ধরুন ১০ বছরের একটি শিশু একটি ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় বের হলো। বাচ্চাটি ছবি তুলে সাথে সাথে ফেসবুকে লাইভ দিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ওই বাচ্চাটি কী একজন ব্রডকাস্টার? সে যে ছবিটি দিয়েছে তার কী কোনো নিউজ ভ্যালু আছে? যদি থাকে তাহলে সেটি একটি বিষয় আর যদি না থাকে তাহলে সেটাকে ভিন্নভাবে দেখা হবে।

যদি নিউজ ভ্যালু থাকে তাহলে সে কী রাইট পাবে? এ বিষয়গুলো নিয়ে সারাবছর কাজ করছে 'এবিইউ'। এবিইউ'র একটি টার্গেট হচ্ছে ২০১৯ সালে জেনেভা কনভেনশনে রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের সভায় এসব বিষয়ে একটা আইন বা চুক্তি করা। এ ব্যাপারে তারা আশাবাদী। আর সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে তেহরানে 'এবিইউ বা এশিয়া প্যাসিফিক ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ের  ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যান্ড লিগ্যাল কমিটির দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরফলে প্রৃকত লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও মেধাবীদের কথাগুলো অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। অন্যদিকে বর্তমান ডিজিটাল যুগে ছত্রাকের মতো ছড়িয়ে পড়ছে অসৎ একটি গোষ্ঠী যারা পাইরেটেড করছে অন্যের সৃষ্টিকে নিয়ে তারা সমস্যায় পড়বে। এরফলে সৃজনশীল কাজে মানুষ অনেক বেশি উৎসাহী হবে এবং প্রতিটি কাজে তাঁরা যথাযোগ্য সম্মান এবং সম্মানী পাবে।

রেডিও তেহরান: ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ব্রডকাস্টিং বা আই আর আইবির এ আয়োজন কেমন ছিল?

আনোয়ার হোসেন মৃধা: আইআরআইবির আয়োজন ছিল অসাধারণ। সভার আপ্যায়ন থেকে শুরু করে সময়ানুবর্তিতা, খাবার-দাবার, ব্যবহার সবকিছুই ছিল আন্তর্জাতিক মানের। সাধারণত দেখা যায় কোনো ভিআইপি ব্যক্তি না আসলে অনুষ্ঠানে বিলম্ব হয়। এখানে দেখলাম ভিন্ন চিত্র। কারো জন্য এক মিনিটও অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরি হলো না। এই যে ইরানি জাতির সময়ানুবর্তিতা এটা অসাধারণ, আমাকে মুগ্ধ করেছে। এছাড়া সভায় দেখলাম- একাডেমিক গবেষণার একটি ক্ষেত্র ছিল একইসাথে পেশাদার অংশগ্রহণকারীদেরও একটি ক্ষেত্র ছিল। সুতরাং আইআরবির আয়োজনে 'এবিইউ'এর সভা ছিল অনন্য সাধারণ।#

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৪

 

২০১৮-০৩-০৪ ২১:৩০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য