• মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৫৪

ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং বিকাশে এলমে হাদিসের ভূমিকা অপরিসীম। এক্ষেত্রে যাঁরা অবদান রেখেছেন তাঁদের ক'জনের সাথে বিশেষ করে শিয়া মুসলমানদের হাদিসগ্রন্থ এবং তাঁদের মুহাদ্দিসগণের সাথে আমরা পরিচিত হবার চেষ্টা করবো।

রাসূলে আকরাম (সা.) এর সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের কয়েকজন হাদিস লেখার কাজে একনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁরা নবীজীর কাছে শুনে সেগুলোকে কাজে লাগাতেন। শিয়াদের হাদিস সেই শুরু থেকেই লেখা হয়ে এসেছে। নবী কারিম (সা.) এর কাছে উপস্থিত লোকজন এবং নবীজীর পরবর্তীকালে পবিত্র ইমামগণের সময়ে তাঁরা ঘরে ফিরেই দ্রুত হাদিসগুলো লিখে ফেলতেন এবং অনেক সময় লেখার পর সেগুলোকে ইমামদের কাছে পেশ করতেন যাতে সেগুলো সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। ঐতিহাসিকভাবে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, হিজরি প্রথম শতকে সাহাবি, শিয়া এবং আহলে বাইত (আ) এর অনুসারীদের একটি দল নবীজী এবং তাঁর পবিত্র খান্দানের বক্তব্যগুলো লিখে রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

শিয়াদের সর্বপ্রথম হাদিস গ্রন্থ হিসেবে রাসূলে খোদার জামাতা এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত ইমাম আলী (আ) এর গ্রন্থের কথাটি উঠে আসবে। এই গ্রন্থটি 'জামেয়া' এবং সহিফায়ে আলী' নামেও বিখ্যাত। অনেক সাহাবি এবং শিয়াদের ইমামগণ সহিফায়ে আলি (আ) কে দেখেছেন। আবুল আব্বাস নাজ্জাশির বর্ণনা করেছেন যে, হাকাম বিন উতাইবাসহ ইমাম বাকের (আ) এর কাছে ছিলাম। হাকাম ইমামকে অনেক প্রশ্ন করে, এক পর্যায়ে একটা বিষয়ে বেশ মতানৈক্যও দেখা দেয়। ইমাম তাঁর সন্তানকে বললেন ওঠো, আলী (আ) এর কিতাবটি নিয়ে এসো। কাগজে লেখা বিশাল একটি কিতাব নিয়ে এলেন তিনি। ইমাম ঐ কিতাব খুলে সমস্যাটির সমাধান খুজেঁ পেলেন। এরপর তিনি বললেন এটা হলো আলী (আ) এর হাতের লেখা। রাসূলে খোদা (সা.) বলেছেন আর তিনি লিখেছেন। নবীজীর সময়ে এবং তাঁর পরবর্তীকালেও শিয়াদের অনেকেই হাদিস লেখার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন।

রাসূলে খোদা (সা.) এর মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম "আবু রাফে" তাঁদেরই একজন। তিনি অবশ্য হযরত আলী (আ) এর সঙ্গী হিসেবেই পরিচিত। এখানে উল্লেখ্য যে আবু রাফের কিতাবটিই সুন্নাত, হুকুম আহকাম এবং আইন ও বিচার সংক্রান্ত সর্বপ্রথম হাদিসগ্রন্থ। তাঁর লেখা "সালিম" নামক অপর গ্রন্থটি শিয়াদের অনুসৃত গ্রন্থ হিসেবে গৃহীত ছিল।

নাজ্জাশির মতো শিয়া আলেম আবু রাফে'র "দারুল ফেহরাস্ত" এবং "মাসহাফ"কে হযরত আলী (আ) এর কিতাবের পর সর্বপ্রথম রচনা বলে মনে করেন। হাদিস লেখার কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন রাসূল (সা.) এর এরকম অপর সাহাবি এবং মুহাদ্দিস হলেন সালমান ফারসি। সালমান ফারসি রাসূলের একজন বিখ্যাত সাহাবি এবং ইসলামের মহান মনীষী হিসেবে পরিগণিত। নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এসেছে নবীজী (সা.) সালমানকে নিজের বংশের বলে গণ্য করে বলেছেন "সালমান আমাদের আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত"।

সালমানের জ্ঞানের গভীরতা ও বিস্তৃতি এতো বেশি ছিল যে ইমাম সাদেক (আ) বলেছেনঃ "রাসূলে খোদা (সা.) এবং আলী (আ) যেসব গোপন রহস্য অন্যদের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব ছিল না সেসব সালমানকে বলতেন এবং তাকেঁ গোপন ও রহস্যময় জ্ঞান ধারণ করার যোগ্য বলে মনে করতেন।" এ কারণেই সালমানের একটি উপাধি হলো 'মুহাদ্দিস'। সালমান ফারসির লেখা গ্রন্থের একটি হলো 'কেতাবে জাসেলিক'। অবশেষে হিজরি পঁয়ত্রিশ মতান্তরে ছত্রিশ সালে বাগদাদের পার্শ্ববর্তী মাদায়েনে তিনি ওফাত বরণ করেন।

শিয়াদের মাঝে হাদিস বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা পরিমাপের কিছু নীতি ও মানদণ্ড রয়েছে। এই মানদণ্ডগুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ যেসব গ্রন্থে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেগুলো 'উসূলে আরবাআ রেজালি' নামে বিখ্যাত। এগুলোর একটি হলো মুহাম্মাদ বিন ওমর কাশশি'র 'মারেফাতুর রেজাল' বা 'রেজালে কাশশি'। যে-কোনো মাযহাবের যে-কেউই শিয়াদের বর্ণনাগুলোর উদ্ধৃতি দিয়েছে তাদের নাম এই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। সেইসাথে প্রত্যেকের ব্যাপারে দেওয়া ইমামদের বক্তব্যগুলোও এই গ্রন্থে এনেছেন।

এ সম্পর্কে শিয়াদের দ্বিতীয় গ্রন্থটি হলো আবুল আব্বাস আহমাদ বিন আলি নাজ্জাশির লেখা 'রেজালে নাজ্জাশি'। শিয়া লেখকদের একটি তালিকাও বলা চলে এই বইটিকে। সকল শিয়া মুহাদ্দিসই নাজ্জাশিকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন এবং তাঁর সতর্কতার প্রশংসা করেছেন সবাই। তাঁর সাক্ষ্যের প্রতি সবারই আস্থা ছিল। শিয়ারা তাদের ইমামদের কথাবার্তাকে সুন্নাতের অংশ বলে মনে করে। সেজন্যে ইমামদের যুগে বিশেষ করে ইমাম বাকের (আ) এবং ইমাম সাদেক (আ) এর সময় তাঁদের বর্ণনাগুলো সংগ্রহের কাজ চলে এবং সেগুলোকে বিষয়বস্তু ভিত্তিক সংকলন করা হয়। এই সংকলনগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে 'আস্‌ল'। আস্‌লে কেবল ইমামদের বক্তব্যই স্থান পেয়েছে,অন্য কারো বক্তব্য বা দৃষ্টিভঙ্গি এতে স্থান পায় নি। গবেষকদের মতে ইমাম হাসান আসকারী (আ) এর সময় পর্যন্ত অন্তত চার শ' আস্‌ল সংকলিত হয়েছে। এগুলোর বহুলাংশ জুড়ে রয়েছে কেবল ইমাম সাদেক (আ) এর বর্ণনা। এই আস্‌লগুলোই শিয়াদের হাদিসের সর্বপ্রথম সংকলন।

অবশ্য ইমামদের যুগে আরো কিছু হাদিস সংগৃহীত হয়েছিল। ২৬০ হিজরিতে ইমাম মাহদি (আ) এর গেইবাতে সোগরা অর্থাৎ স্বল্পকালীন অদৃশ্যায়ন শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে শিয়া আলেমগণ এইসব আস্‌ল সংগ্রহ ও সম্পাদনার কাজ করেন। যার ফলে "কুতুবে আরবাআয়ে শিয়া" নামে চারটি কিতাব সংকলিত হয়ে যায়। শিয়াদের কাছে এই চারটি হাদিস সংকলন মৌলিক এবং নির্ভরযোগ্য বলে গৃহীত। ঐ চারটির মধ্যে একটি গ্রন্থ হলো "কাফি"। এটি মুহাম্মাদ বিন ইয়াকুব কোলেইনি'র সংকলন। কোলেইনি ছিলেন ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় রেই শহরের বাসিন্দা এবং শিয়া মুহাদ্দিস পরিবারের সদস্য। শিশুকাল থেকেই তিনি হাদিস শেখেন। গ্রন্থটি লেখার পর তিনি বাগদাদে যান এবং বিচার কাজসহ আলেমদের ব্যবহারের জন্যে বইটি দেন। তার কিছুদিন পর সেখানেই তিনি মারা যান। চারটি বইয়ের মাঝে এ বইটির বিশেষত্ব হলো এতে ফিকা সংক্রান্ত বিষয়বস্তু ছাড়াও নীতি-নৈতিকতা এবং আকিদা-বিশ্বাস নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কাফি'তে ১৫ হাজার তিনশ' ৩৯টি রেওয়ায়েত রয়েছে। শিয়াদের কাছে এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ। কোলেইনি ৩২৯ হিজরিতে মারা যান।

শিয়াদের আরেকজন বিখ্যাত মুহাদ্দিস হলেন 'মুহাম্মাদ বিন আলি বিন মূসা বিন বাবুইয়ে কোমী'। শেখ সাদুক নামেই তিনি বেশিরভাগ পরিচিত। তাঁর সংকলিত বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ হলো' মাল্ লা ইয়াজুরুহুল ফাকিহ'। ৫ হাজার ৯ শ ২০টি হাদিস রয়েছে এতে। সংকলক হাদিসগুলোকে সহীহ বলে দাবি করেন। শেখ সাদুক ৩৮১ হিজরিতে মারা যান।

শিয়াদের অপর একজন নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস হলেন মুহাম্মাদ বিন হাসান তূসী। শেখ তূসি নামেই তিনি পরিচিত। তাঁর সংকলিত হাদিস গ্রন্থের নাম হলো 'তাহযিবুল আহকাম'। এতে ১৩ হাজার ৫শ' ৯০টি হাদিস রয়েছে। 'আল-এস্তেবসার' তাঁর আরেকটি হাদিস গ্রন্থ। শিয়াদের কাছে এটি খুবই নির্ভরযোগ্য। ৫৫১১টি হাদিস রয়েছে এতে। শেখ তূসি শেষ পর্যন্ত ৪৬০ হিজরিতে মারা যান।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ/ ৫

২০১৮-০৩-০৫ ২০:০৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য