আমরা গত আসরে গর্ব ও অহংকারের মন্দ দিক নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছি। গর্ব বা অহমিকা বলতে কী বোঝায় সেটাও বলার চেষ্টা করেছি। তবে গর্বের একটা ভালো দিকও যে রয়েছে সে ব্যাপারেও ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করেছি। যেমন কেউ যদি নিজের মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে সম্পদ গড়ে তোলে এবং সেই সম্পদ গড়ে তোলার জন্য নিজের পরিশ্রমের কথা বলে, সেই অহংকার নেতিবাচক নয়।

কেননা এই অহংকার অন্যকেও মেধা ও প্রতিভা কাজে লাগিয়ে পরিশ্রম করে অগ্রগতি লাভে অনুপ্রাণিত করবে। সমাজ এবং জীবনে তার এই অভিজ্ঞতার একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। এই গর্ব ব্যক্তির সামাজিক ও মানসিক বিকাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সবশেষে আমরা কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে অহংকারের পরিণতির দিকটি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।পবিত্র কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী সৃষ্টি জগতে অহংকারের প্রকৃত উদাহরণ হলো 'ইবলিস' মানে শয়তান। ইবলিস ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত এবং ছয় হাজার বছর পর্যন্ত সে আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল ছিল। ফেরেশতাদের কাতারেও তার একটা বিশেষ পদমর্যাদা ছিল। কিন্তু যখনই এই ইবলিস আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে অহংকার দেখালো তখনই সে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেল। একেবারে চিরদিনের জন্য বিতাড়িত, পথভ্রষ্ট হয়ে গেল সে। এ নিয়ে আমরা আজকের আসরেও কথা বলার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ। আপনারা আমাদের সঙ্গেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।    

শয়তান যে অহংকার করেছে সেটা ছিল বর্ণগত। সে বর্ণগত দিক থেকে নিজেকে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করেছে।এটাই আত্মম্ভরিতা। কুরআন এই আত্ম-অহমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে ইবলিস যেহেতু বর্ণগত দিক থেকে নিজেকে বড় বলে মনে করেছে সে কারণেই তার ভেতরে অহমিকাবোধ কাজ করেছে। সূরায়ে সোয়াদের ৭৪ থেকে ৭৬ নম্বর আয়াতে এসেছে: কিন্তু ইবলিস নিজে শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার করলো এবং সে কাফেরদের অন্তরভুক্ত হয়ে গেলো।

রব বললেন,“হে ইবলিস! আমি আমার দু’হাত দিয়ে যাকে তৈরি করেছি তাকে সিজদা করতে তোমাকে কিসে বাধা দিয়েছে? তুমি কি বড়াই করছো, না তুমি কিছু উচ্চ মর্যাদার অধিকারী?” 

সে জবাব দিল,“আমি তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ,তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো আগুন থেকে এবং তাকে মাটি থেকে।”

এ কারণে যারা এই বিশ্বাস পোষণ করে এবং যে সমাজ তাদেরকে এ কাজে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, তারা অহংকারী মানসিকতাকেই মেনে নিয়েছে এবং জুলুম করেছে, এমনকি তারা আইন অমান্য করেছে এবং বিদ্রোহ করেছে। কুরআনের দৃষ্টিতে অহংকার হলো আত্ম এবং খোদা থেকে দূরত্ব সৃষ্টির প্রধান উৎস, বিবেক ও বিচারে ভুলের কারণ, সত্য পথ হারানোর কারণ, শয়তানের খাতায় নাম লেখানোর মাধ্যম এবং বিচিত্র অন্যায় কাজে নিজেকে জড়িয়ে দুষিত হয়ে ওঠার কারণ। এ বিষয়টিকেই পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ...'আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোনো অহংকারীকেই পছন্দ করেন না'।

'আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোনো অহংকারীকেই পছন্দ করেন না-তাহলে এই অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায় কীভাবে? কী করলে আমাদের ভেতরে, অন্তরাত্মায় গর্ব অহংকার বাসা বাঁধতে পারবে না? অহংকারী হয়ে ওঠার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উপায়টা কী? সূরা বনি ইসরাইলের ৩৭ নম্বর আয়াতে আমরা এই প্রশ্নগুলোর সুন্দর জবাব পেয়ে যাবো। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই আয়াতে মুমিনদেরকে অহংকার করার ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। বলা হয়েছে: 'যমীনে দম্ভভরে চলো না। তুমি দাম্ভিকতা দেখিয়ে না জমিনকে চিরে ফেলতে পারবে,না তোমার উচ্চতা কখনও পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারবে'।

 

কুরআন এভাবে অহংকার করতে নিষেধ করার পাশাপাশি মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন নিজেদের ভালোবাসে এবং এ ক্ষেত্রে অন্যেদেরকেও সদয় সহযোগিতা করে। পবিত্র কুরআনের সুরায়ে হিজরের ৮৮ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: 'আপন দয়া, অনুগ্রহ, স্নেহ-ভালোবাসার পাখা মুমিনের জন্য বিছিয়ে দাও'।

কোনো মানুষ যখন নিজেকে ভালোবাসে সে জানে যে সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশ তার জন্য উপযোগী। সুতরাং সে তার আশেপাশের সকল মানুষকেই ভালোবাসে। সেই লোক নিজেকে কখনোই অন্যদের তুলনায় বড় কিংবা শ্রেষ্ঠ বলে ভাবতে পারে না। নিজেকে আশপাশের লোকজন থেকে পৃথক করেও ভাবতে পারে না। যার ফলে সবাই তাকে সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে।

এই যে শ্রদ্ধা ও সম্মানের কথা বলা হলো, মানুষকে এ পর্যায়ে পৌঁছতে পবিত্র কুরআনে বিনয়ী ও শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কুরআনের দৃষ্টিতে অহংকারের ঘাড় ভেঙে দেয়ার একটা উপায় হলো মানুষ যার কাছেই যাবে, তাকেই সালাম করবে। সালাম ও শিষ্টাচার মানুষের ভেতর থেকে অহংকারের জীবানুগুলোকে ধীরে ধীরে দূর করে দিতে সাহায্য করে। কেননা পবিত্র কুরআনের সূরায়ে ফোরকানের ৬৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন: "রহমানের (আসল) বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীর বুকে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং মূর্খরা তাদের সাথে কথা বলতে থাকলে বলে দেয়: তোমাদের সালাম"।

রাসুলে খোদা (সা) কখনো অশ্বারোহী অবস্থায় কাউকে তাঁর পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দিতেন না। তিনি বরং বলতেন 'তুমি অমুক বাড়িতে যাও! আমি আসছি, ওখানে আমরা একসঙ্গে মিলিত হবো'। এর কারণ হলো অশ্বারোহীর পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে অশ্বারোহীর মনে অহংকার বাসা বাঁধতে পারে পক্ষান্তরে পথচারীর মনে হীনমন্যতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এইসব থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সেই শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে কাজে লাগিয়ে আমরা যেন আদর্শ জীবন যাপন করতে পারি সেই প্রত্যাশায় গুটিয়ে নিচ্ছি আজকের আসর।

  • যারা সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/৬

২০১৮-০৩-০৬ ১৭:২৩ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য