বন্ধুরা, আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমাদের সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান- ধরণীর বেহেশত মসজিদে। আজকের আসরে আমরা সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় মসজিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি ইরানের গওহরশাদ মসজিদের আরো কিছু দিকের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব। আশা করছি শেষ পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গ পাবো।

গত আসরে আমরা নামাজসহ মসজিদের অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় ইমাম সাহেবের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছি। মসজিদে ইমাম সাহেবই সব কাজে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। তার পরিচালনায় মসজিদের প্রতিটি কাজ সুনির্দিষ্ট সময়ে সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। কাতারবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাড়ানো হচ্ছে জামায়াতে নামাজ আদায়ের প্রধান শর্ত। জামায়াতে নামাজ আদায়ের জন্য আজান হওয়ার পর সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মসজিদে উপস্থিত হতে হয়। ফলে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে আদায়কারী একজন মুসল্লি সময়ানুবর্তী হন এবং তার জীবনের অন্য সব কাজও সুশৃঙ্খল হয়। জামায়াতের নামাজ হচ্ছে একদল মানুষের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের অপূর্ব নিদর্শন। মুমিন মুসলমানরা নামাজের জন্য কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালে আল্লাহ তায়ালার সামনে তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি ইসলামের শত্রুদের সামনে তাদের ঐক্য ও সংহতির বিষয়টি প্রকাশ পায়।

ইমাম জাফর সাদেক (আ.) মহানবী (সা.)’র উদ্ধৃতি দিয়ে এক হাদিসে বলেন, “হে মুমিনগণ!তোমরা সারিবদ্ধভাবে নামাজে দাঁড়াবে এবং পরস্পরের কাঁধের সঙ্গে কাঁধ এমনভাবে মেলাবে যাতে দু’জনের মধ্যে কোনো ফাঁকা স্থান না থাকে।  যদি তোমরা বিশৃঙ্খলভাবে নামাজে দাঁড়াও তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অন্তরগুলোকে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবেন।” রাসূলুল্লাহ (সা.)’র এই হাদিস থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে, মানুষের অন্তরে পরস্পরের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসার বিষয়টি তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় থাকার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। 

 

সমাজে বিশৃঙ্খলা থাকলে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পায় এবং পরস্পরের মধ্যে কোনো মিল-মহব্বত থাকে না। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ মানুষের উপকারের জন্যই ফরজ ও নফল নির্বিশেষে শরিয়তের বিধানগুলো দিয়েছেন যা মেনে চললে সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। কাজেই শুধু জামায়াতের নামাজের সময় নয় সেইসঙ্গে মসজিদের অন্য প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।  কারণ, মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর এবং নামাজ মুমিন ব্যক্তিকে সময়জ্ঞান ও শৃঙ্খলাবোধ শিক্ষা দেয়। মানবজীবনে শৃঙ্খলার গুরুত্ব অপরিসীম; সেইসঙ্গে সময় হচ্ছে মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এই সময়কে সঠিকতম উপায়ে ব্যবহার করতে শেখায় শৃঙ্খলাবোধ।

ইমাম আলী (আ.) শাসনকাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে নানামুখী বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগের সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং এর ফলে মুসলিম উম্মাহর যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। তিনি শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করার আগ মুহূর্তে নিজ সন্তানদের উদ্দেশে দেয়া উপদেশবাণীতে মুসলমানদেরকে তাকওয়া অর্জন এবং সব কাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। ইমাম আলী (আ.) তাঁর নসিহত লিখে রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “আমরা পরিবারের সকল সদস্য এবং যাদের কাছে আমার এই লেখা পৌঁছাবে তাদের সবাইকে তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন এবং প্রতিটি কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করার আহ্বান জানাচ্ছি।”

নামাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজের অন্যান্য কাজও সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠিত হয়। মুসল্লিরা যেহেতু মুসলিম সমাজেরই অংশ তাই তারা মসজিদের শৃঙ্খলাকে মসজিদের বাইরেও নিয়ে যান এবং এর ফলে সমাজের বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ কমে যায়। যে সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত থাকে সেই সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে ধাবিত হতে পারে। আর এই মহান লক্ষ্যটি অর্জিত হয় মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে।

আবু সাঈদ আবুল খাইর নামক একজন বিখ্যাত আরেফের কাছে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেন: মসজিদে উপস্থিত হয়ে সবার একত্রিতভাবে নামাজ আদায় করার কি দরকার? আল্লাহ তায়ালা তো প্রতিটি মানুষের শাহরগের চেয়েও কাছে রয়েছেন কাজেই ঘরে বসে নামাজ আদায় করলেই তো তিনি দেখতে পান! এ প্রশ্নের উত্তরে আবু সাঈদ একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন: অন্ধকার রাত্রে যদি একটি স্থানে কয়েকটি বাতি একত্রে জ্বালানো হয় এবং এ অবস্থায় সেখান থেকে একটি বাতি নিভে যায় তাহলেও স্থানটি অন্য বাতিগুলোর আলোয় আলোকিত থাকবে।  কিন্তু এই বাতিগুলো যদি আলাদা আলাদা ঘরে জ্বালানো থাকে এবং সেগুলো একটি একটি করে নিভে যায় তাহলে সবগুলো ঘর অন্ধকারে ঢেকে যাবে।” এ কারণে আল্লাহ তায়ালা জামায়াতে নামাজ আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে মুসলমানরা পরস্পরের সহযোগিতায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

বন্ধুরা, শুরুতে যেমনটি বলেছিলাম, আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরানের গওহরশাদ মসজিদের আরো কিছু দিক তুলে ধরব। গত আসরে আমরা বলেছিলাম, ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মাশহাদ শহরে ইমাম আলী ইবনে মুসা রেজা (আ.)’র মাজার ঘেঁষে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছে। এই মসজিদের অনন্য নির্মাণশৈলি এটিকে ইরানের অন্যতম ঐতিহাসিক মসজিদে পরিণত করেছে। পঞ্চদশ শতাব্দির মহিয়সী নারী গওহরশাদ বেগমের উদ্যোগে মসজিদটি নির্মিত হয়।

তৈমুরিয়ানদের শাসনামলে নির্মিত গওহরশাদ মসজিদের স্থাপত্যশৈলিতে রং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।  মসজিদের গম্বুজ তৈরি হয়েছে ফিরোজা রঙের টাইলস দিয়ে যার উপরে চমৎকার ক্যালিগ্রাফিতে লেখা রয়েছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’  ফিরোজা রঙের গম্বুজটি যেন আকাশের রঙের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এই গম্বুজের নীচে দাঁড়িয়ে মুসল্লি যখন নামাজ আদায় করেন তখন তার সঙ্গে যেন আকাশের কোনো দূরত্ব থাকে না। আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয় মসজিদ জুড়ে।

হলুদ হচ্ছে সবচেয়ে উজ্জ্বল রং এবং নুর বা আলো বোঝাতে এই রং ব্যবহৃত হয়। শিক্ষা বা জ্ঞানের আলো ফুটিয়ে তুলতেও হলুদ রং ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।  গওহরশাদ মসজিদের দেয়ালে স্থাপিত টাইলসের নানা কারুকাজে এই হলুদ রং ব্যবহৃত হয়েছে। মুসল্লিদের অন্তরে দ্বীনি নুরের আলো উজ্জীবিত করাই যেন এই কারুকাজের মূল উদ্দেশ্য।

এই মসজিদের নকশায় সবুজ রংও ব্যবহৃত হয়েছে যে রংটি আবার হলুদ ও নীল রঙের মিশ্রণে তৈরি। সবুজ রং মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত ও আশাবাদী করে তোলে। মসজিদের ছাদ ও দেয়ালের নানা কারুকাজে এই রংটিও সুনিপুণ হাতে ব্যবহার করা হয়েছে। সেইসঙ্গে মসজিদের বিভিন্ন স্থানে কুরআন ও হাদিসের বাণী লিপিবদ্ধ করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কালো রং।  এই রং ব্যবহার করার ফলে অন্য রংগুলির ঔজ্জ্বলতা বেড়ে গেছে অনেকগুণ।

গওহরশাদ মসজিদে চারটি আঙিনা, একটি গম্বুজ, দু’টি মিনার এবং সাতটি ছাদযুক্ত বারান্দা রয়েছে। এটির প্রতিটি মিনারের উপরে চমৎকার ক্যালিগ্রাফিতে আসমাউল হুসনা বা আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামগুলো লিপিবদ্ধ রয়েছে। মিনারের নীচের অংশের এক স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র একটি হাদিস লেখা রয়েছে যেখানে তিনি বলেছেন: নামাজ হচ্ছে মুমিনের মি’রাজ। আরেক স্থানে কালেমায়ে তাইয়্যেবা অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা’হ লিপিবদ্ধ রয়েছে। 

গওহরশাদ মসজিদের ভেতর দিয়ে ইমাম রেজা (আ.)’র মাজারে প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে। ইমামের মাজার জিয়ারতকারী ভক্তরা মাজারের পাশাপাশি এই মসজিদের আধ্যাত্মিক পরিবেশে নামাজ আদায় করে নিজেদের ধন্য করেন।

তো বন্ধুরা, সময় শেষ হয়ে আসায় আজকের আসরেও গওহরশাদ মসজিদ নিয়ে আলোচনা শেষ করা সম্ভব হলো না। তাই আগামী আসরে এই মসজিদের আরো কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করব। সেইসঙ্গে থাকবে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার খোদায়ী বিধান পালনে মসজিদের ভূমিকা নিয়ে কিছু কথা। সে আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাওয়ার আশা রইল।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/৬

২০১৮-০৩-০৬ ১৭:৫৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য