বিশ্বজগতের নানা বাস্তবতার সঙ্গে মানুষের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। খোদা-প্রেমের আধ্যাত্মিক রহস্য ও এ সম্পর্কিত অতি-সূক্ষ্ম বা গভীর তত্ত্বও এর ব্যতিক্রম নয়। আর এসব বিষয়ই এরফানের আলোচ্য-বিষয়।

এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের বলা হয় আরেফ। আবু সাইয়িদ আবুল খাইর ছিলেন এমনই একজন আরেফ বা সুফি।

এরফান হচ্ছে খোদা-প্রেমসহ নানা বাস্তবতাকে প্রেমময় একাত্মতার মাধ্যমে উপলব্ধির মাধ্যম যা কেবলই জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে বা বুদ্ধি খাটিয়ে অনেক সময় বোঝা সহজ হয় না।  এরফান সংক্রান্ত বাস্তবতাগুলোকে বোঝার জন্য জ্ঞান, বুদ্ধি ও যুক্তি ছাড়াও বিশেষ কিছু প্রেমময় অনুশীলনেরও দরকার হয়। এক্ষেত্রে প্রেমময় অনুশীলনই মুখ্য। এ জাতীয় অনুশীলনের নানা স্তর বা পর্যায় অতিক্রমের পরই কোনও ব্যক্তি আরেফে পরিণত হন।  অবশ্য এরফানের ব্যবহারিক দিক ছাড়াও রয়েছে তাত্ত্বিক দিক। ব্যবহারিক এরফানে খুব যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হয় নির্দিষ্ট ও শ্রমসাধ্য কিছু কর্মসূচি এবং অতিক্রম করতে হয় একত্ববাদ ও এরফানি বাস্তবতা উপলব্ধির নানা পর্যায়। যেমন, আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য অর্জনের জন্য নিজের আমিত্বকে বিলুপ্ত করা।

আর তাত্ত্বিক এরফান হল আরেফবৃন্দ আত্মিক প্রত্যক্ষীকরণ বা শুহুদের মাধ্যমে মানুষ ও বিশ্ব জগতের নানা বাস্তবতা সম্পর্কে যেসব রহস্য বা জ্ঞান উপলব্ধি করেছেন সেসব বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা বা মতামত।

মহান আল্লাহর পথের পথিক বা একজন আরেফ আল্লাহর দাসত্ব করাকে স্বাধীনতা বলে মনে করেন। প্রকৃত আরেফ তার অন্তরকে দুই জাহানের সব আকর্ষণ থেকে মুক্ত করে কেবলই খোদার প্রেমে মশগুল থাকে। আবু সাইয়িদ আবুল খাইরকে প্রশ্ন করা হয়: শেইখ! বন্দেগি কী? তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ তোমাকে স্বাধীনতা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন তাই স্বাধীন থাকো। যতক্ষণ না দুই জাহান থেকে মুক্তি অর্জন না করছ ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দাস হতে পারবে না।’

আবু সাইয়িদ এরপর বললেন:  

 

آزادی و عشق چون همی نامد راست
زین پس چونان که داردم دوست رواست
بنده شدم و نهادم از یک سو خواست
گفتار و خصومت از میانه برخاست

 

 

আবু সায়িদের এই কবিতার ভাবার্থ হল:

স্বাধীনতা ও প্রেম একই বীণার তার

চালাবো তবে জীবনটাকে প্রিয়-পথে আল্লাহর

হলাম যবে খোদা-মুখি বান্দা হয়ে তাঁর

বিবাদ ও সংঘাত রইলনাকো আর!

 

অধ্যাপক জাররিনকুবের মতে মুসলমানদের কাছে এরফান সুফিবাদ নামে পরিচিত। আর অন্যান্য ধর্মে নানা যুগে নানা পর্যায়ের এরফান-ধাঁচের বিষয়কে নানা নামে অভিহিত করা হয়েছে। আধুনিক যুগে এ বিষয়কে মিস্টিসিজম বা রহস্যবাদীদের জ্ঞানও বলা হয়।

বায়েজিদ বোস্তামি ও মনসুর হাল্লাজের মত আবু সায়িদও খোদা-প্রেমের এরফানি নেশায় বিভোর ছিলেন। আবু সাইয়িদ কাব্য-সাহিত্যের মাধ্যমে অতীতের সুফিদের ইরফানি চিন্তাধারাকে পরবর্তী প্রজন্মের সুফি ধারার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ফলে এ প্রক্রিয়ায় আবির্ভূত হয়েছেন আইনুল কাজাত,গাজ্জালি এবং মাওলানা রুমির মতো ইরানি আরেফ।

 

অধ্যাপক শাফিয়ি কুদাকানির মতে আবু সায়িদের চিন্তাধারার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আত্মিক-বন্ধনের যোগসূত্রধারী সুফি হলেন বায়েজিদ ও আবুল হাসান খারাকানি।  

আবু সায়িদ সব ধর্মকে সমান দৃষ্টিতে দেখতেন এবং সব ধর্মের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি রাখতেন। তিনি সব মানুষকে সাম্য,মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের দৃষ্টিতে দেখতেন।  

বিখ্যাত ইরানি সুফি-সাধক আবু সাইয়িদ আবুল খাইর

 

সুফিদের দৃষ্টিতে বিশ্বজগত মহান আল্লাহর সৃষ্টি বলে মহান আল্লাহর সব সৃষ্টির সঙ্গেই তারা শান্তিতে থাকতে চান ও সব ধর্মের বৈশিষ্ট্যই মূলত একই। আল্লাহর সৃষ্টির সব কিছুতেই তারা দেখতেন সৌন্দর্য। তাদের মতে সব ধর্ম ও মাজহাব স্রষ্টা তথা আল্লাহকেই ভালবাসতে চায়। তবে ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলাম হচ্ছে সবচেয়ে পরিপূর্ণ বা পূর্ণাঙ্গ। সুফিদের কাছে মহান আল্লাহই হলেন একমাত্র বাস্তবতা। তাই পথ ও মতের ভিন্নতার ভিড়ে কোনও একটি বিশেষ মত বা পথকে অন্য পথের ওপর গুরুত্ব দেয়ার কোনও দরকার নেই। কারণ,মহান আল্লাহর প্রেমই হওয়ার উচিত সুফির চূড়ান্ত ও একমাত্র লক্ষ্য।   

 

প্রাচীন খোরাসানের জন্য আবু সায়িদের যুগ তথা হিজরি পঞ্চম শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ষষ্ঠ হিজরির সময়টি ছিল সুফিবাদের অন্যতম সোনালী যুগ। এ যুগে মাজহাবি ও ধর্মীয় সংঘাত ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এ সময়েই ধর্মীয় গোঁড়ামি বাদ দিয়ে আবু সায়িদ প্রচার করেছেন সব মানুষের জন্য সাম্য,প্রেম ও ভালবাসার বাণী।  তার মতে সব ধর্মই খুঁজছে মহান আল্লাহকে ভিন্ন  ভাষায় ও ভিন্ন পথে। আবু সায়িদ সুন্দর আচরণ ও সৎকর্মের মাধ্যমে মানুষকে দেখিয়ে গেছেন সত্যের পথ। তার মানব-প্রেমই বহু মানুষকে দিয়েছে সঠিক পথের দিশা।

আবু সায়িদের সুফিবাদ মানুষকে বংশ,বর্ণ ও জাতীয়তার বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছে।

 

মুক্ত-চিন্তার অধিকারী আবু সায়িদ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। তিনি নিজেকে অন্য সুফি বা ধার্মিকদের চেয়ে বড় মনে করতেন না। আবার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়া বা অন্যদের অন্ধ অনুকরণও পছন্দ করতেন না এই মহান সুফি।  আবু সায়িদের কাছে সাদা ও কালো বর্ণের মানুষ কিংবা ধনী ও দরিদ্র মানুষের কোনও পার্থক্য ছিল না। যারা সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ও খোদা-ভীরু তারা দরিদ্র হলেও তাদেরকে অবশ্যই তিনি বেশি ভালবাসতেন। অন্যদিকে তিনি ভণ্ড সুফি ও অহংকারী আলেম ও দরবেশদের এড়িয়ে চলতেন।

 

আবু সায়িদের যুগে তার পরিচিত এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বলেছিলেন, ‘আবু সায়িদের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে বলতে হয় একটি পেয়ালার একটি শস্যদানা হলেন তিনি বাকি শস্য হলাম আমি।’ নিজের এক অনুরাগীর মাধ্যমে এ কথা আবু সায়িদের কানে গেলে তিনি বলেন যে, ‘উনাকে বলবেন যে ওই একটি শস্যদানাও হলেন তিনিই। আমরা কিছুই না।’ -এভাবেই আবু সায়িদ অহংকার থেকে মুক্ত থাকার ও স্বাধীনতার শিক্ষা দিতেন এবং অন্যের দোষ গোপন রাখতেন। #

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/৭

২০১৮-০৩-০৭ ১৬:৩৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য