গত পর্বের আলোচনায় আমরা পরকালে মানুষের পুনরুজ্জীবন ও পুনরুত্থানের বিষয় সম্পর্কে সুরা কাফে উল্লেখিত আয়াতের যুক্তি তুলে ধরেছিলাম ব্যাখ্যাসহ।

বৃষ্টির ফলে মৃত ভূমি ও গাছগাছালির পুনর্জীবন আমরা প্রতি বছরই দেখছি। মৃত ভূমিতে সবুজের সমারোহই যে পুনরুত্থানের বড় প্রমাণ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মৃত মানুষকেও ঠিক এভাবেই জাগিয়ে তোলা মহান আল্লাহর জন্য মোটেই কোনো কঠিন কাজ নয়।

যাই হোক পরের কয়েকটি আয়াতে অর্থাৎ ১১ থেকে ১৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুলকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন,কাফেররা কেবল আপনাকে নয় আপনার আগে আসা নবী-রাসুলদেরকেও প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই তাদের ব্যাপারে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবেই এবং কাফের-মুশরিকরা কঠোর শাস্তি পাবে। সুরা ক্বাফের ১৯ নম্বর আয়াতে মৃত্যু সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলছেন:  

'মৃত্যুযন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। তাকে বলা হবে,এ হচ্ছে সে বিষয় যা থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।'

সাকরাতুল মউত হচ্ছে মৃত্যুর প্রাক্কালের এমন এক অবস্থা যখন মানুষ গভীর আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার কারণে এক ধরনের উদভ্রান্ততা বা অপ্রকৃতস্ততা অনুভব করে। মৃত্যু হচ্ছে এমন এক অন্তর্বর্তী স্থানান্তরের পর্যায় যখন মানুষ তার এতোকালের পরিচিত ও অভ্যস্ত পরিবেশ,অনুগত দেহ,প্রিয়জন ও জগতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হয়। মৃত্যুর ফলে মানুষ এমন এক জগতে যেতে বাধ্য হয় যা পুরোপুরি অপরিচিত ও নতুন এক বিশ্ব।

মানুষ মৃত্যুর সময় এক নতুন দৃষ্টি বা দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে। সে তখন ইহকালীন এই জগতের ক্ষণস্থায়ীত্ব উপলব্ধি করে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জগতের ঘটনাবলী কম-বেশি দেখতে থাকে। আর এ সময়ই তাকে আতঙ্ক ঘিরে ধরে ও এক ধরনের উন্মত্ততা দেখা যায় তার মধ্যে যদিও বাস্তবে সে মাতাল নয়।

পবিত্র কুরআন বলছে,সাকরাতুল মউত হচ্ছে সেই অবস্থা যা থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াতে। হ্যাঁ,মৃত্যু হচ্ছে এমন এক বাস্তবতা যা থেকে বেশিরভাগ মানুষই পালিয়ে বেড়ায় বা যাকে প্রায় সবাইই এড়িয়ে চলতে চায়। কারণ,বেশিরভাগ মানুষই মনে করে যে মৃত্যু হচ্ছে ধ্বংস বা জীবনের অবসান,নতুন জগতে যাবার সড়ক বা পথ নয়। দুনিয়ার যত নাজ-নেয়ামত কিংবা ধন-সম্পদ,পদ-মর্যাদা ইত্যাদির প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে কিংবা পাপের বোঝা খুব বেশি হওয়ার কারণেও মানুষ মৃত্যু থেকে দূরে থাকতে চায়। কিন্তু মানুষ যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন মৃত্যু সবার জীবনেই আসবে অনিবার্যভাবে।

মৃত্যু হচ্ছে মুমিনদের জন্য ক্ষুদ্র এক জগত থেকে এক অসীম ও অশেষ খোদায়ী নাজ-নেয়ামতে পরিপূর্ণ এক নতুন জগতের অধিবাসী হওয়া। তবে কোনো মানুষের জন্যই মৃত্যু সহজ কোনো ব্যাপার নয়। কারণ মানুষের আত্মা দীর্ঘকাল ধরে তার দেহে অভ্যস্ত হয়েছিল ও দেহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল।

ইমাম জাফর আস সাদিক (আ)’র কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে কেনো মানুষের আত্মা শরীর থেকে বের হওয়ার সময় মানুষ পীড়া বা যন্ত্রণা অনুভব করে?

উত্তরে ইমাম বলেন,এর কারণ হল তার আত্মা নিজ দেহের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল ও দেহের গভীরে প্রবেশ করেছিল। ব্যাপারটা নষ্ট হয়ে যাওয়া দাঁতের মতো। ওই দাঁত তুলে ফেলা হলে মানুষ প্রশান্তি অনুভব করে। কিন্তু ওই দাঁত তোলার সময় ঠিকই যন্ত্রণা অনুভব করে।  

মোট কথা এই আয়াতে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে মৃত্যু অনিবার্য এক বাস্তবতা। মৃত্যুর স্বাদ একদিন সবাইকে অনুভব করতেই হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখানে মৃত্যুর বাস্তবতার প্রতি গুরুত্ব দেয়াটা হল এক ধরনের সতর্কবাণী। অন্য কথায় এ হুঁশিয়ারিতে বলা হচ্ছে যে খুব ভালো করে ভেবে দেখ যে সঠিক পথ বেছে নিয়েছ কিনা এবং চিরস্থায়ী জগতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছ কিনা!  

সুরা ক্বাফের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন, 'অতএব,তারা যা কিছু বলে,সেজন্যে (হে নবী) আপনি ধৈর্য ধরুন এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আগে আপনার পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করুন। রাত্রির কিছু অংশে এবং নামাযের সিজদার পরও তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন।'

-একমাত্র ধৈর্য-শক্তি ও দৃঢ়তার মাধ্যমেই মানুষ সংকট মোকাবেলা করতে এবং সংকটকে বিজয়ের সুযোগে পরিণত করতে পারে। তাই শত্রুর উপহাস ও নানা অপবাদ কখনও কখনও সহ্য করতে হয়। ধৈর্যের নির্দেশের পরপরই মহান আল্লাহ এখানে নামাজেরও দাওয়াত দিয়েছেন। কারণ নামাজ ধৈর্যের শক্তি যোগায়। নামাজ তথা আল্লাহর স্মরণ ও বিশ্ব-জগতের স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক।  

আল্লাহ তাঁর রাসুলকে নির্দেশ দিচ্ছেন তিনি যেন গভীর অনুরাগ ও একনিষ্ঠতা নিয়ে সূর্য-উদয় ও সূর্য-অস্ত যাওয়ার আগে মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসায় মশগুল হন এবং রাতের একটা অংশ ও সিজদাগুলোর পরও আল্লাহর প্রশংসা করেন। নামাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর অবিরাম প্রশংসা মানুষের হৃদয় ও মনে বৃষ্টির ফোটার মতই সজীবতা বয়ে আনে এবং তাতে মানুষের হৃদয় হয় প্রশান্ত ও প্রফুল্ল।  

সুরা ক্বাফের শেষ কয়েক আয়াতে মহান আল্লাহ আবারও কিয়ামত ও পুনরুত্থানের কথা বলেছেন। মহান আল্লাহ বলছেন:

'শুন,যেদিন এক আহ্বানকারী কাছাকাছি স্থান থেকে আহবান করবে।

যেদিন মানুষ নিশ্চিতভাবেই পুনরুত্থানের সেই ভয়াবহ আওয়াজ শুনতে পাবে, সেদিনই কবর থেকে বের হওয়ার দিন তথা পুনরুত্থান দিবস। আমিই জীবন দান করি,মৃত্যু ঘটাই এবং আমারই দিকে সবার প্রত্যাবর্তন। যেদিন ভূমণ্ডল বিদীর্ণ হয়ে তথা কবর ফুঁড়ে মানুষ ছুটাছুটি করে বের হয়ে আসবে। এটা এমন সমবেত করা,যা আমার জন্যে অতি সহজ। তারা যা বলে,তা আমি সম্যক অবগত আছি। আপনি তাদের উপর জোরজবরকারী নন। অতএব,যে আমার শাস্তিকে ভয় করে,তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন।'

-এখানে আহ্বানকারীর আহ্বান মানে শিঙ্গায় ইস্রাফিলের ফু দেয়াকে বোঝানো হয়েছে।  তিনি শিঙ্গায় যখন দ্বিতীয় বার ফু দেবেন তখনই ঘটবে কিয়ামত ও সবাই কবর থেকে জীবন্ত হয়ে বেরিয়ে এসে খুব দ্রুত সমবেত হবে হাশরের ময়দানে। সেদিনের সেই আদালতের বিচারক হবেন স্বয়ং মহান আল্লাহ। জীবন ও মৃত্যু তাঁরই হাতে ও তাঁর দিকেই সবার প্রত্যাবর্তন। আর এভাবে মানুষকে কবর থেকে বের করে জড়ো করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ কাজ।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/৭

ট্যাগ

২০১৮-০৩-০৭ ১৭:২৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য