গত আসরে আমরা বলেছি ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর প্রতি আসক্তির কারণে অনেকেই পরিবারে সময় দেওয়ার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে সময় কাটানোকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করে।

এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। এমনকি সাংসারিক যে ঝামেলা সহজেই মিটে যেতে পারতো, ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তির কারণে তা আরও জটিল হয়ে পড়ে। আজও আমরা পরিবারের ওপর ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব। আশাকরি শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই আছেন।                                               

সাধারণত প্রতিটি জিনিসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক থাকে। শুরুতে ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্যও খারাপ ছিল না। কিন্তু এখন অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সেটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আগের অনুষ্ঠানগুলোতেও বলেছি  আমরা কখনই ইন্টারনেট ব্যবহারের বিপক্ষে নই। তবে ব্যবহারের একটা সীমা-পরিসীমা থাকতে হবে। সেটা মেনে চলতে হবে। সঠিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় থাকবে, যাতে পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সময়ে ইন্টারনেট ভাগ বসাতে না পারে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে পরিবার হচ্ছে একটি সমাজের মূল ভিত্তি। প্রতিটি পরিবারের ভূমিকা ও তৎপরতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গোটা সমাজকেই প্রভাবিত করে। ফলে সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে পারিবারিক কাঠামো  টিকিয়ে রাখতে হবে। সুস্থ সমাজ গড়তে হলে সুস্থ পরিবার গঠন করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানীরা ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতকে সুস্থ পরিবার গঠনের পথে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে মনে করছেন।

 

তারা বলছেন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া একটি পরিবারের সদস্যদের নিজেদের মধ্যে এবং বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। পরিবার ও সমাজে বিদ্যমান সম্পর্কের ধরণকেই পুরোপুরি পাল্টে দিচ্ছে ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগত। সমাজবিজ্ঞানীরা বারবারই বলছেন, সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজে বিদ্যমান সুস্থ সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে এবং এ বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। কারণ ইন্টারনেটের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার পরিণামে পরিবার ও সমাজে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকের মধ্যে ইসলামি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ধারণ করার মন-মানসিকতা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারণ হলো, ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে সহজেই বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অল্প বয়সীরা। কারণ পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার আগেই তারা ইন্টারনেটের কারণে এমন এক নিয়ন্ত্রণহীন জগতে প্রবেশ করছে যেখানে ভালো-মন্দের মধ্যে কোনো ধরণের সীমারেখা টানা হয় নি। ভার্চুয়াল জগত বা ইন্টারনেটে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব বেশি থাকায় তা মুসলিম সংস্কৃতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় শিশুরা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনেক সময় শিশুরা মোবাইলের বাটন চাপতে চাপতে নিজের অজান্তেই ইন্টারনেটে সংযুক্ত হয়ে পড়ছে এবং শিশুদের জন্য অনুপযোগী ছবি তথা দৃশ্য সামনে ভেসে উঠছে। তারা এমন সব অশালীন দৃশ্য দেখছে যা ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার আগে তাদের কল্পনাতেও আসত না। এ ক্ষেত্রে পরিবারে বড়দের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। শিশু-কিশোররা ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও তাতে বড়দের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। প্রয়োজনে ফিল্টারিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে শিশু-কিশোরদের অনুপযোগী কোনো ছবি, দৃশ্য ও লেখা তাদের সামনে প্রদর্শিত না হয়। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের শিশুদেরকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদেরকে সহিংসতার দিকে টানা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে চলাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। জীবন ও সমাজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের আগেই বিপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।  

 

ইন্টারনেট বা ভার্চুয়াল জগতে সব সময় সক্রিয় থাকায় অনেকেই রাত জেগে এর পেছনে সময় ব্যয় করছে। এর ফলে বিশ্রাম ও ঘুমের জন্য নির্ধারিত সময় অপচয় হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শরীর-মন ও পরিবারের ওপর। শুধু তাই নয়, স্থান ও কালের সীমাবদ্ধতা না থাকায় অনেকে বাসায় বসে অফিসের কাজ করছে, ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছে। অনেকে অফিসের পাশাপাশি বাসাতে গিয়েই অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। এর অনেক ভালো দিক থাকলেও চূড়ান্তভাবে পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময় কমে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা এভাবেই নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় ও কথোপকথনের সুযোগ হাতছাড়া করছে। পরিবারের অভিভাবক যখন পরিবারকে যথেষ্ট সময় না দিয়ে অন্যভাবে সময় কাটান, তখন পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য তা অত্যন্ত কষ্টকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে।

অনেক ক্ষেত্রেই হতাশা থেকে ক্ষোভ জন্ম নেয় এবং পরিবারের অভিভাবকের প্রতি আকর্ষণ ও আনুগত্য কমে যায়। আর এ ধরনের প্রবণতা একবার শুরু হলে তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং কখনো কখনো পরিবার ভেঙেও যায়। পরিবার হলো মানসিক প্রশান্তি অর্জনের সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ঝঞ্জাট ক্ষেত্র। মানসিক প্রশান্তির এ ক্ষেত্রটিকে কোনোভাবেই নষ্ট করা ঠিক নয়। এ কারণে আমাদের সবাইকে পরিবার রক্ষায় সোচ্চার হতে হবে। পরিবারকে সময় দিতে হবে। একসঙ্গে বসে কথা বলতে হবে,সুখ-শান্তি ও দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করে নিতে হবে। অকারণে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে ব্যস্ত না থেকে পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর ও সুখময় হবে। #

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/৮

ট্যাগ

২০১৮-০৩-০৮ ১৮:৫৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য