• মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি-৫৫ : 'নাহজুল বালাগা'

শিয়াদের আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ-হাদিস হিসেবেও যার ব্যাপক মূল্য রয়েছে-তা হলো ঐতিহাসিক গ্রন্থ 'নাহজুল বালাগা'। নাহজুল বালাগা হলো রাসুলে খোদা (সা.) এর স্থলাভিষিক্ত ও জামাতা ইমাম আলী (আ) এর প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য, তাঁর চিঠিপত্র, ভাষণ ইত্যাদির নির্বাচিত সংকলন।

শরিফ রাযি (মৃত্যুঃ ৪০৬ হিজরি) ৪০০ হিজরিতে নাহজুল বালাগা সংকলনের কাজটি করেন। অবশ্য পবিত্র এই গ্রন্থে আলী (আ) এর মহামূল্যবান বক্তব্যের যেটুকু সংকলন করা হয়েছে তা তাঁর মূল্যবান ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্যের খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশমাত্র। হাদিসের অন্যান্য গ্রন্থেও তাঁর সেসব বক্তব্য এসেছে। নাহজুল বালাগা তিনটি ভাগে বিভক্ত। একটি হলো খোৎবা বা ভাষণ। এ অংশে তাঁর ২৪১টি ভাষণ স্থান পেয়েছে। বন্ধু-বান্ধব, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সামরিক নেতৃবৃন্দ, শত্রুসহ অন্যান্যদের লেখা চিঠিপত্র রয়েছে পত্র বিভাগে। এই বিভাগে ৭৯টি পত্র স্থান পেয়েছে। আরেকটি বিভাগে স্থান পেয়েছে অর্থঘন অথচ সংক্ষিপ্ত বহু স্মরণীয় বাণী। এ বিভাগে ৪৮০টি বাণী সংকলিত হয়েছে।

 

নাহজুল বালাগার মূলপাঠকে সবচেয়ে অলঙ্কারপূর্ণ ও প্রাঞ্জল বক্তব্য বলে গণ্য করা হয়। নাহজুল বালাগা প্রকাশের পর এক হাজার বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের জ্ঞানী-গুণীজনদের কাছে এ বইটি পৌছে গেছে। বইটির ওপর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণধর্মী আরো অসংখ্য বইও লেখা হয়েছে। মিশরের স্বনামখ্যাত মুফতি শেখ মুহাম্মাদ আবদুহ ঘটনাক্রমে নাহজুল বালাগার সাথে পরিচিত হন। তিনি বইটির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মিশরের যুবকদের মাঝে এর ব্যাখ্যামূলক পরিচিতি বিস্তারের চেষ্টা চালান। তিনি তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যার ভূমিকায় লিখেছেনঃ "আরবি ভাষাভাষী মানুষেরা বিশ্বাস করেন যে আল্লাহর কালাম আলকোরআন এবং রাসূলে খোদার বক্তব্যের পর সবচেয়ে প্রাঞ্জল, অলঙ্কারবহুল, অর্থপূর্ণ এবং সামগ্রিক বক্তব্য হলো আলী (আ) এর বক্তব্য।" এই গ্রন্থটি পৃথিবীর প্রচলিত বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

শিয়াদের অপরাপর হাদিস গ্রন্থগুলোর মাঝে "সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া''র নাম উল্লেখযোগ্য। নাম থেকেই বোঝা যায় বইটি আহলে বাইতের ইমাম হযরত সাজ্জাদ (আ) এর নিজস্ব দোয়া, মুনাজাত এবং বক্তব্যের সংকলন। এতে চুয়ান্নটি দোয়া স্থান পেয়েছে। দোয়ার সংকলন হলেও সহিফায়ে সাজ্জাদিয়াতে ইসলামী জ্ঞান বিজ্ঞান এবং আধ্যাত্মিকতার বর্ণনাসহ নীতি-নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ, সামাজিক, রাজনৈতিক বহু সংবেদনশীল বিষয় আশয় এমনকি শরিয়তের বহু বিধি-বিধান নিয়েও বক্তব্য রয়েছে। দোয়ার আঙ্গিকেই এইসব বিষয়বস্তু উঠে এসেছে। সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া এখনো সহজলভ্য।

শিয়ারা সম্প্রতি তাদের হাদিস সংকলনগুলো সংগ্রহ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বড়ো বড়ো এই মুহাদ্দিসদের মধ্য থেকে 'মোহাম্মাদ বাকের মাজলেসি'র কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

বাকের মাজলেসি এতোই প্রতিভাবান ছিলেন যে, সেই শৈশবে অর্থাৎ মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই তাঁর ওস্তাদ মোল্লা সাদরার কাছ থেকে তিনি হাদিস রেওয়ায়েত করার অনুমতি নিয়েছিলেন। মুসলিম বিশ্বের এই প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব এতোই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে হাত দিয়েছিলেন যে সে সময় খুব কম লোকের পক্ষেই এরকম একটি কাজে হাত দেওয়ার মতো সাহসই ছিলো না। কাজটি হলো তিনি মাসুমিনদের অর্থাৎ শিয়া ইমামগণের বর্ণনাগুলোকে সংগ্রহ করে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেছেন যা প্রকৃতিগত দিক থেকে অনন্য। তিনি এই সংকলনটির নাম দিয়েছেন "বিহারুল আনোয়ার"। নিঃসন্দেহে এটি শিয়াদের সবচেয়ে বড়ো হাদিসগ্রন্থ। এজন্যে বিহারুল আনোয়ারকে 'শিয়া হাদিসের বিশ্বকোষ' বলে অভিহিত করা হয়।

বিহারুল আনোয়ার নিয়ে কথা বলছিলাম। ১০৭০ হিজরিতে এটি রচনার কাজ শুরু হয় এবং ১১০৬ হিজরিতে শেষ হয়। সর্বমোট ১১০ টি খণ্ডে সমাপ্ত হয় বিহারুল আনোয়ার। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাদিসগুলোকে তিনি এক জায়গায় সন্নিবিষ্ট করেছেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল হাদিসের কিতাবগুলোকে হারিয়ে যাবার হাত থেকে রক্ষা করা। মাজলেসি এই সংকলনের ক্ষেত্রে বহু আলেমের সহযোগিতা নিয়েছেন। বহু বলতে হাজারের কাছাকাছি হবে বলে কোনো কোনো সূত্রে এসেছে। বিভিন্ন বর্ণনা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং মতপার্থক্যগুলোর একটা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রন্থের শুরুতে মাজলেসি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যেসব সূত্র ব্যবহার করেছেন সেগুলোর উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ৩৮৭টি সূত্র শিয়াদের আর ৮৫টি সূত্র সুন্নিদের।

শিয়াদের অপর একটি হাদিস গ্রন্থ হলো "ভাসায়েলুশ শিয়া"। এটির রচয়িতা হলেন শায়খ মুহাম্মাদ বিন হাসান হুর আমেলি (১০৩৩-১১০৪ হিঃ)।এই গ্রন্থটি ফিকাহর খুটিনাটি বিষয়ের বর্ণনা সমৃদ্ধ। শায়খ হুর আমেলি "ভাসায়েলুশ শিয়া" বইটিতে হাদিগুলোকে টুকুরো টুকরো করে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে যথাস্থানে সংযোজন করেছেন। আটষট্টি হাজার আট শ' পঁয়ত্রিশটি রেওয়ায়েত এই গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে। ১১০৪ হিজরিতে তিনি নশ্বর এই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন। তাঁর মাযারটি পবিত্র মাশহাদ শহরে ইমাম রেযা (আ) এর হারামের পাশে রয়েছে।

শিয়ারা সাম্প্রতিক কালেও হাদিস বিষয়ক সংকলনে হাত দিয়েছেন। "শিয়া হাদিস সমগ্র" নামক সংকলনটির কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ 'হোসাইন বুরুজের্দি'র সম্পাদনায় বৃহৎ এই সংকলনটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। একত্রিশটি খণ্ডে এই সংকলনটি সম্পাদিত হয়েছে। আহলে বাইতের মহান ইমামদের মূল্যবান হাদিসগুলোই এতে স্থান পেয়েছে। ফিকাহ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেসব হাদিস রয়েছে সেগুলোর ওপরই সংকলক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

ফকিহদের কাছে যদিও অন্যান্য হাদিস সংকলন ছিল তারপরও এই কিতাব শরিফের বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল এমন এই হাদিসগুলো বেশিরভাগ আলেমই অনুমোদন করেছেন এবং গ্রন্থটির ব্যাপক প্রশংসা করেছেন। এই গ্রন্থের প্রত্যেক অধ্যায়ের শুরুতেই শরিয়তের হুকুম আহকাম, ফরয, মুস্তাহাব সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আয়াতগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে। একইভাবে মতপার্থক্য নিরসনের চেষ্টার পাশাপাশি জটিল শব্দ ও পরিভাষাগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আর হাদিসগুলোকে কোনোরকম পরিবর্তন পরিমার্জন ছাড়াই হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। আরো একটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রত্যেক অধ্যায়েই যেসব বর্ণনা অন্য কোনো অধ্যায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সেগুলোর তথ্যসূত্র সুস্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে যাতে গবেষকদের কাজে সুবিধা হয়। হাদিস সংকলনটি যিনি পড়বেন তাঁর কাছে এই গ্রন্থটির আরো অনেক বৈশিষ্ট্য সহজেই ধরা পড়বে।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ/ ৮

২০১৮-০৩-০৮ ১৯:১০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য