পবিত্র কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী সৃষ্টি জগতে অহংকারের প্রকৃত উদাহরণ হলো 'ইবলিস' মানে শয়তান। ইবলিস ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত এবং ছয় হাজার বছর পর্যন্ত সে আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল ছিল। ফেরেশতাদের কাতারেও তার একটা বিশেষ পদমর্যাদা ছিল।

কিন্তু যখনই এই ইবলিস আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে অহংকার দেখালো তখনই সে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেল। একেবারে চিরদিনের জন্য বিতাড়িত, পথভ্রষ্ট হয়ে গেল সে। সুতরাং আমরা যেন ইবলিসের ফাঁদে পড়ে অহংকারের বশবর্তী হয়ে না পড়ি সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। যাই হোক মানুষ মাত্রই ভয় ভীতি, উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, বেদনা, মর্মপীড়া ইত্যাদি দোষ-গুণ সম্পন্ন। এগুলোর ভালো-মন্দ উভয় দিকই রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

মানুষের জীবনে বিচিত্র চড়াই উৎরাই রয়েছে। এগুলো অনেকটা পৃথিবীর বুকে সংঘটিত খরার মতো। কিংবা এই উত্থান পতন প্রকৃতিতে বিদ্যমান গভীর উপত্যকা অথবা উঁচু উঁচু পাহাড়ের মতো। মানুষের মনের ভেতর কখনো উচ্ছ্বসিত আনন্দ বয়ে যায়। কখনও আবার মানুষ আড়ষ্ট বা বিষন্ন হয়ে পড়ে। অবসাদগ্রস্ততা, অধৈর্য কিংবা অজানা কোনো দুশ্চিন্তায় মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এইসব নেতিবাচক মানসিক অবস্থা মানুষের ভেতরে বিচিত্র অস্বাভাবিকতার জন্ম দেয়, মানুষ বিরক্ত হয়ে পড়ে। মানব জীবনে এই উত্তেজনা জন্মের পর থেকে বাসা বাঁধে এবং জীবনে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আমাদের সামাজিক সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতাগুলো এইসব বিচিত্র অনুভূতি ও উত্তেজনাপূর্ণ মানসিক অবস্থা থেকেই উঠে আসে।

অনুভূতি যদি ইতিবাচক হয় তাহলে ব্যক্তির জীবন আনন্দ, প্রেম ইত্যাদিতে সমৃদ্ধি পায়। আর যদি অনুভূতি হয় নেতিবাচক তাহলে বিপরীতটা হয় মানে দুশ্চিন্তা, বিষন্নতা, ভয়-ভীতি ইত্যাদি এসে ভর করে মনের ভেতর। অনেকে মনে করেন দু:খ, বেদনা, বিষাদ-এগুলোর মূল উৎস হলো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব অর্থাৎ কাছের মানুষদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া। যখনই কাছের মানুষদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তখনই নি:সঙ্গতার আশ্রয় নিতে হয় অনেক সময় এবং কোনঠাসা ও একাকী জীবন যাপন করতে হয় মানুষকে। তবে এটাই একমাত্র কারণ এবং সঠিক কারণ মনে করার সুযোগ নেই। কেননা স্বজন পরিজন বেষ্টিত থাকার পরেও মানুষ একাকীত্ব বোধ করে এবং বিষাদগ্রস্ত হয়।

মানসিক বিষাদ ও নি:সঙ্গতার কারণ উদঘাটন সম্পর্কে কথা বলছিলাম আমরা। কিছু কিছু কারণ একেবারে প্রকাশ্য। যেমন আত্মীয়-স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধুর মৃত্যু মনকে বেদনাহত,বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। আবার কখনও কোনো কাজে সফলতা না পাওয়া কিংবা পড়ালেখায় ব্যর্থ হওয়া, পেশাগত সাফল্যহীনতা, পারিবারিক কোনো বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া ইত্যাদিও মানুষকে বিষন্ন করে তোলে। এসবের বাইরেও নেতিবাচক কোনো আচরণ যেমন কুদৃষ্টির মতো নেতিবাচক মানসিকতা, অহমিকাবোধ, বলদর্পিতা, কোনো ইচ্ছা পূরণ না হওয়া, আর্থিক সংকট ইত্যাদি সমস্যাও মানুষকে বিষন্ন, উত্তেজিত, বিরক্ত করে তোলার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

আবার এরকম অবস্থাও হয় যে কোনোরকমের উল্লেখযোগ্য কারণ ছাড়াই মনে বিষন্নতা, অবসাদগ্রস্ততা কাজ করে। আপনার জীবনে তেমন কোনো বিশেষ সমস্যঅ নেই। তবু আপনার কিছু ভালো লাগে না। আপনি বিষন্নতায় আক্রান্ত। আপনিও নিশ্চয়ই এ ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়ে থাকবেন যে অকারণেই আপনার মন খারাপ। অকারণেই অবসাদ এসে আপনার মনকে বিরক্ত করে তুলছে। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে মানুষের ভেতরকার সকল প্রকার উত্তেজনা বা শিহরণই জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়, মানসিক কোনো অবস্থাই অপ্রয়োজনীয় নয়। দুশ্চিন্তা, উত্তেজনা, ভয়-ভীতি, দু:খ-বেদনা, রাগ, ভালোবাসা, ঘৃণা এগুলো মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য জরুরি বলে মনে করা হয়। এগুলোকে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হলো এই স্বাভাবিক প্রবণতাই অনেক সময় অস্বাভাবিক উত্তেজনার দিকে ধাবিত হয়।                     

 

কোনো মনোবিজ্ঞানীই মানুষের এই বিষাদ, বেদনা, দু:খ ইত্যাদিকে অপ্রয়োজনীয় কিংবা ক্ষতিকর বলে মনে করেন না। তবে অনেক সময় বিরক্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও এই বিরক্তিকর উপসর্গ বা মানসিক প্রবণতা ব্যক্তিকে অনেক ক্ষেত্রে উদ্দীপনা দেয়। যেই উদ্দীপনা উত্তেজনাপূর্ণ বিরূপ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত আচরণ করতে প্রেরণা জোগায়। সুতরাং একথা বলা যায় যে, দু:খ বিষাদের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই। এই দু:খ বিষাদ যদি হিংসার কারণে হয়ে থাকে তাহলে তা অনুকূল নয়। আর যদি তা আখেরাত কিংবা ঈমানি ভবিষ্যত চিন্তা থেকে উঠে এসে থাকে তাহলে তা ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। মুমিনদেরকে এই অনুকূল চিন্তার দিকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কেননা এই ইতিবাচকতা মুমিনদের অন্তরে ক্রমাগত আনন্দ উদ্দীপনা জাগায়।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/১০

ট্যাগ

২০১৮-০৩-১০ ২১:০১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য