আজকের আসরে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার কাজে মসজিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি এই কাজের বিশ্বস্ত কেন্দ্র হিসেবে ইরানের গওহরশাদ মসজিদ কি ভূমিকা পালন করেছে তা নিয়ে আলোচনা করব।

মসজিদ হচ্ছে ছোট-বড় ও ধনী-গরীব নির্বিশেষে সমাজের সব মুসলমানের একত্রিত হওয়ার স্থান। মসজিদ সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ হলেও সেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ বজায় থাকার করার কারণে মানুষের ওপর এর প্রভাব অপরিসীম।

 

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে আমরু বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার। অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ প্রদান ও অসৎকাজে নিষেধ করা। এই বিধান পালনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার সবচেয়ে উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে মসজিদ। সমাজে বসবাসকারী একজন মুসলমান তার আশপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর ব্যাপারে উদাসীন থাকতে পারে না। সমাজের খারাপ উপকরণগুলো নির্মূল করে উন্নত গুণাবলীর বিকাশ ঘটানোর দায়িত্ব তার পক্ষে এড়ানো সম্ভব নয়।

আল্লাহ তায়ালা এই প্রয়োজনের গুরুত্বের কারণেই মুসলমানদের জন্য সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার এই বিধান ফরজ করে দিয়েছেন। নামাজ, রোজা ও যাকাতের মতোই এই বিধান ফরজ যা পালন করার সবার জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।  পবিত্র কুরআনের সূরা তওবা’র ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের উন্নত গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহযোগী। তারা (মানুষকে) সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ তাআলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল,প্রজ্ঞাময়।”

এই আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী মুমিন ব্যক্তিরা পরস্পরের ভালো-মন্দের খবর রাখেন। কারণ, তারা সবাই ইসলাম নামক পরিবারের সদস্য এবং এর কোনো সদস্য বিপথগামী হলে তার প্রভাব গোটা পরিবারের উপর পড়ে।  রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি সহজবোধ্য উদাহরণ তুলে ধরে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের বিধান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “একদল সৎ মানুষের মধ্যে একজন গোনাহগার মানুষের উপস্থিতিকে গভীর সমুদ্রে ছুটে চলা একটি জাহাজের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এই জাহাজের আরোহী কোনো ব্যক্তি যদি একটি কুঠার হাতে নিয়ে নিজের বসার স্থানে কোপাতে থাকে তাহলে সবাই তাকে বাধা দেবে। এ অবস্থায় সে যদি বলে, আমি তো তোমাদের কোনো ক্ষতি করছি না বরং আমি আমার নিজের জায়গায় একটি ছিদ্র করছি তাহলে তা হবে বোকামিপূর্ণ কথা। জাহাজের অন্য আরোহীরা তাকে এই জাহাজে কোনো ছিদ্র এজন্য করতে দেবে না যে, জাহাজের যেকোনো স্থানে ছিদ্র হলেই কিছুক্ষণের মধ্যে এটি পানিতে তলিয়ে যাবে।”

আমরা আগেই বলেছি, ইসলামের এই জরুরি বিধান বাস্তবায়নে মসজিদের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। আল্লাহর রাসূল যখন প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন তখনই তার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান বর্ণনা করা, শিক্ষা দেয়া এবং তা সমাজে বাস্তবায়ন করা। ইরানের মুসলিম জনগণ এই মসজিদকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার খোদায়ী বিধান বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশ থেকে অত্যাচারী শাহ সরকারকে উৎখাত এবং  ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবে মসজিদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য এবং অনেক চিন্তাবিদ ও গবেষক এই বিপ্লবকে ‘মসজিদের ফসল’ বলে উল্লেখ করেন।

ইরানে পাহলাভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রেজা খান ব্রিটিশদের সহযোগিতায় দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার বিধান নিষিদ্ধ করে ফরমান জারি করেছিলেন। ওই ফরমানে বলা হয়েছিল, একমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। অন্য কোনো মানুষ বিশেষ করে আলেম বা মাদ্রাসার ছাত্ররা ইসলামের এই ফরজ কাজটি করতে পারবে না। অথচ ইমাম আলী (আ.) আমরু বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকারের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “সব ধরনের নেক আমল এমনকি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও এই বিধানের তুলনায় সাগরের বিশাল জলরাশির সামনে এক ফোটা পানির সমান। এই বিধান পালনের উৎকৃষ্টতম উপায় হচ্ছে, একজন ঈমানদার মুসলমান অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে সাহসিকতার সঙ্গে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।”

এই বিধান পালন করতে গিয়ে ইরানের মুসলিম জনগণ পাহলাভি শাসকের অত্যাচার মেনে নেয়নি। তারা মসজিদকে কেন্দ্র করে রেজা খানের ফরমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। আলেম সমাজ বিশেষ করে মসজিদের ইমাম সাহেবদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠলে রেজা খান ওই ফরমান প্রত্যহার করে নিতে বাধ্য হন।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার ক্ষেত্রে ইরানের গওহরশাদ মসজিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব। গত দুই আসরে আমরা ইরানের মাশহাদ শহরে ইমাম রেজা (আ.)’র মাজার সংলগ্ন এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছি। আজ আমরা পাহলাভি রাজবংশের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে এই মসজিদের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করব। প্রথম পাহলাভি শাসক রেজা খান ইরানের জনগণের ইসলামি মূল্যবোধ ও রক্ষণশীল সংস্কৃতি নির্মূল করে দেশে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর উদ্যোগ নেন। তিনি রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ইরানি নারীদেরকে বলপূর্বক পর্দাপুষিদা ত্যাগ করে পশ্চিমা খোলামেলা পোশাক পরতে বাধ্য করেন। সেটি ছিল তুরস্কের পাশ্চাত্যপন্থি স্বৈরশাসক কামাল আতাতুর্কের শাসনের যুগ।

আতাতুর্কের ইসলাম বিরোধী তৎপরতা অনুসরণ করে রেজা খান ইরান থেকেও ইসলামি মূল্যবোধ তুলে দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন।  তিনি প্রথমে পুরুষদের ঢিলাঢালা ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিষিদ্ধ করে কোট-প্যান্ট পরিধান বাধ্যতামূলক করেন এবং কোনো পুরুষ কোট-প্যান্ট না পরে রাস্তায় বের হলে তার জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করেন। এই নির্দেশ দেখে ইরানের আলেম সমাজ উপলব্ধি করেন রেজা খান পুরুষদের পরে নারীদের পোশাকেও হাত দেবেন। আলেম সমাজের পরামর্শে মাশহাদের তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ কোমি বিষয়টি নিয়ে রেজা খানের সঙ্গে আলোচনা করতে তেহরানে আসেন। কিন্তু তিনি তেহরানে পৌঁছামাত্র তাকে গৃহবন্দি করা হয়। এ খবর মাশহাদে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং জনগণ গওহরশাদ মসজিদে সমবেত হয়ে রেজা খানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকে।

ইরানি জনগণের ওপর পশ্চিমা পোশাক চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয় এই মসজিদ। রেজা খানের পুলিশ বাহিনী আলেমদের গ্রেফতার করে পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। গওহরশাদ মসজিদে ওয়াজ মাহফিল নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এই নির্দেশ অমান্য করে আগের চেয়ে বেশি মানুষের উপস্থিতিতে ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হতে থাকে।  এ অবস্থায় ফার্সি ১৩১৪ সালের ২০ তির মোতাবেক ১৯৩৫ সালের ১০ জুলাই রেজা খানের পুলিশ বাহিনী গওহরশাদ মসজিদে গুলি চালায়। এতে বেশ কিছু মানুষ হতাহত হওয়া সত্ত্বেও জনগণ মসজিদ ত্যাগ না করে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। রেজা খান কঠোর হাতে সেখানকার প্রতিবাদ দমন করার নির্দেশ দিলে ওইদিন মধ্যরাতের পর গওহরশাদ মসজিদে গণহত্যা চালানো হয় যার নিদর্শন এখনো মসজিদটিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

অবশেষে তীব্র গণআন্দোলনের জের ধরে রেজা খান তার ফরমান প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন। ওই ঘটনার প্রায় পাঁচ দশক পর রেজা খানের ছেলে মোহাম্মাদ রেজা শাহের বিরুদ্ধে যে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয় তারও উৎপত্তিস্থল ছিল মসজিদ।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/১৬

২০১৮-০৩-১৬ ১৭:১১ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য