রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো যে, আমাদের সমাজে ধনী ও দরিদ্র এই দুই শ্রেণীর মানুষ বাস করে। ধনীরা তাদের অবস্থানকে মজবুত করার জন্য যেমন বেশী বেশী ধন-সম্পদ লাভের চেষ্টা করে; তেমনি দরিদ্ররা তাদের দুঃখ-কষ্ট দুর করার জন্য ধন-সম্পদের প্রতি আগ্রহী হয়।

কিন্তু এটা সত্য যে, বেশী ধনসম্পদ থাকলেই মানুষ সুখী হতে পারে না। কারণ অতিরিক্ত ধন-সম্পদ মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। অপরদিকে অতিরিক্ত দারিদ্র্যও মানুষের ঈমানকে নষ্ট করে দিতে পারে। তাই ইসলাম সবসময় মানুষের দারিদ্র্য দূর করার চেষ্টা করে।

অভাব মোকাবেলার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, দরিদ্রতার জন্য চেয়ে মৃত্যু ভালো। তিনি তার পুত্র হানাফিয়াকে বলেন, হে আমার পুত্র! আমি তোমার দরিদ্রতার কারণে ভয় পাই। কারণ দরিদ্রতা মানুষের ধর্মকে অপূর্ণ করে এবং মন মানসিকতাকে বিচলিত করে দেয়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসূল (সা.) নিজেও সাহাবীদের দুঃখ-কষ্ট দুর করার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন। তবে ধনসম্পদ যাতে মানুষের ঈমান ধ্বংসের কারণ হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে রাসূলে খোদা খুবই খেয়াল রাখতেন। তিনি বলতেন, “কারো ধন-সম্পদ যদি কম কিংবা প্রয়োজন মত থাকে তবে তা সেই ব্যক্তির অঢেল সম্পদের চেয়ে ভালো- যা তার মন মানসিকতাকে ব্যস্ত করে রাখে এবং তাকে গাফেল করে দেয়।”

বন্ধুরা, অতিরিক্ত ধন-সম্পদ কিভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করে সে সম্পর্কে রংধনুর আজকের আসরে আমরা দু’টি ঐতিহাসিক ঘটনা প্রচার করেব। আর অনুষ্ঠানের শেষে থাকবে ভারতের এক ছোট্টবন্ধুর সাক্ষাৎকার। অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। প্রথমেই ঘটনা দু’টি শোনা যাক-

নামাযে গাফিলতি

রাসূল (সা.) মদীনায় হিজরতের পর সা'দ নামে আহলে সুফফার একজন সদস্য ছিল। বন্ধুরা, তোমরা হয়তো জানতে চাচ্ছো, আহলে সুফফা আবার কারা? তোমাদের জানার জন্য বলছি, যেসব সাহাবীর জীবন ধারণের জন্য কোনো অর্থ সম্পদ ছিল না এবং যারা সাধারণত মসজিদেই দিনযাপন করতো তাদেরকে ‘আহলে সুফফা’ বলা হতো।

যাই হোক, আহলে সুফফার সদস্যদের মধ্যে সা'দ খুব গরিব ছিল বলে অত্যন্ত কষ্ট করে জীবন যাপন করতে হতো। রাসূল (সা.) তাঁর দুঃখ-কষ্ট দেখে নিজেও কষ্ট পেতেন। একদিন তিনি সা'দকে বললেন, যদি হাতে কিছু আসে তাহলে অবশ্যই তোমার অভাব দূর করার চেষ্টা করব।

কিন্তু অনেক দিন অতিবাহিত হলেও রাসূলের কাছে তেমন কিছু না আসায় তিনি দুঃখ পেলেন। এ অবস্থায় একদিন আল্লাহর হুকুমে হযরত জিবরাইল (আ.) দু’টি দিরহাম নিয়ে রাসূলের কাছে এলেন।

জিবরাইল (আ.) রাসূলে খোদাকে বললেন, সা’দের কারণে আপনি যে কষ্ট পাচ্ছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তা লক্ষ্য করেছেন। আপনি এই দিরহামগুলো সা'দকে দিয়ে বলুন, সে যেন ব্যবসা করে।

রাসূল (সা.) দিরহাম দু’টি নিয়ে নামাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের গেলেন। বের হয়েই দেখতে পেলেন সা’দ রাসূলের জন্য অপেক্ষা করছে। সা’দকে দেখে রাসূলে-খোদা বললেন, তুমি কি ব্যবসা করতে পারবে? সা’দ বলল, খোদার কসম! আমার কাছে এমন কোন সম্পদ নেই যা দিয়ে ব্যবসা করব। রাসূল (সা.) তাকে দিরহাম দু’টি দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে আল্লাহ পথে থেকে ব্যবসা করো।

সা'দ হাসিমুখে দিরহাম দু’টি নিল। তারপর রাসূলের সঙ্গে মসজিদে গেল। নামাজ পড়ার পর নবীজি সাদকে বললেন, ওঠো! এবার রিজিকের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ো।"

রাসূলের নির্দেশে সা'দ মসজিদ থেকে বের হয়ে পড়ল। এরপর সে ব্যবসা শুরু করল। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সে যে ব্যবসাতেই হাত দিতো তাতেই অনেক লাভ হতো। অল্প দিনের মধ্যেই সে অনেক ধনসম্পদের অধিকারী হলো। ব্যবসার জন্য মসজিদের পাশেই একটি জায়গা বেছে নিল এবং বেচাকেনায় মশগুল হয়ে গেল।

একদিন রাসূল (সা.) দেখতে পেলেন যে, মসজিদে আযান হবার পরও সা'দ ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত আছে। নামাজের জন্য তৈরি হবার কোনো লক্ষণই তার মধ্যে দেখা গেল না! রাসূল (সা.) এ দৃশ্য দেখে খুব কষ্ট পেলেন। তিনি সা'দকে বললেন, সা'দ! দুনিয়ার প্রতি মোহ তোমাকে নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিল!

রাসূলের কথা শুনে সা'দ বলল, আমি কি করব? আমি আমার ধনসম্পদ নষ্ট করে ফেলব নাকি? একটু থেমে সে আবার বলল- যাদের কাছে আমি জিনিসপত্র বিক্রি করেছি তাদের টাকা বুঝে নিতে হবে। আর যাদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনেছি তাদের পাওনাও পরিশোধ করতে হবে। এসব করতে গেলে নামাজে অংশ নেব কিভাবে?

সা'দের এমন জবাব শুনে রাসূল (সা.) খুব কষ্ট পেলেন। এ সময় হযরত জিবরাইল (আ.) রাসূলের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, সা'দের ব্যবহারে আপনি যে কষ্ট পেয়েছেন, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন লক্ষ্য করেছেন। এবার আপনি বলুন, সাদের কোন অবস্থাকে আপনি পছন্দ করেন- তার আগের অবস্থা না বর্তমান অবস্থা? রাসূলে খোদা বললেন, আমি তার আগের অবস্থাকে পছন্দ করি। কারণ বর্তমান অবস্থার মধ্যে দুনিয়া আছে কিন্তু দ্বীন নেই।

এরপর জিবরাইল (আ.) বললেন, আপনি যদি তাই চান তাহলে সাদকে যে দুই দিরহাম আপনি দিয়েছিলেন, তা ফেরত নিন। তাহলে সে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। জিবরাইল চলে যাবার পর রাসূল (সা) সাদকে বললেন, তুমি আমার কাছ থেকে যে দু’টি দিরহাম নিয়েছিলে তা কি ফেরত দেবে না? সাদ বলল, দুই দিরহাম কেন, তার পরিবর্তে আমি দুইশ' দিরহাম দিতেও রাজি আছি।

রাসূলেখোদা বললেন, 'দুইশ দিরহামের দরকার নেই, তুমি আমার কাছ থেকে যে দিরহামগুলো নিয়েছিলে সেগুলোই ফেরত দাও।'

সাদ আর কোনো কথা না বলে, ওই দিরহাম দু’টিই রাসূলকে ফেরত দিল। রাসূল (সা) দিরহামগুলো নিয়ে যাবার সাথে সাথেই আল্লাহ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অল্প দিনের মধ্যেই তার ব্যবসায় ক্ষতি হতে লাগল এবং একসময় সে আগের মতোই দরিদ্র হয়ে গেল।

যাকাত দিতে অস্বীকার

বন্ধুরা, এবার আমরা অন্য এক সাহাবীর কথা বলব। তার নাম ছিল সা’লাবাহ। সেও এক সময় দারিদ্র্য ছিল এবং ব্যবসা করত। যখনই তার ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেল, তখন সে ব্যস্ততার মসজিদে নামাজ পড়তে আসত না। এমনকি যখন রাসূল (সা.) তার কাছ থেকে যাকাত আদায় করার জন্য লোক পাঠালেন, সে যাকাত দিতেও রাজি হলো না। বরং সে বলল, আমি কি ইহুদি নাকি নাসারা যে, আমার কাছ থেকে কর্‌ নিতে এসেছো?

বন্ধুরা, এই লোকটি কিন্তু একসময় ভালো মুসলমান ছিল। আল্লাহর দরবারে সে শপথ করে বলেছিল যে, যদি আল্লাহ আমাকে ধন-সম্পদ দান করেন, তবে আমি তা বঞ্চিত ও দরিদ্র ব্যক্তিদের সাহায্যে ব্যয় করব। কিন্তু যখনই আল্লাহ তাকে ধনসম্পদ দিলেন তখনই সে নিজের প্রতিশ্রুতি ভুলে গেল।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মহান আল্লাহ সূরা তাওবার ৭৫ ও ৭৬ নম্বর আয়াত নাজিল করেন। এতে বলা হয়েছে :

"তাদের মধ্যে এমনও কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছিল যেযদি তিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের ধন্য করেনতাহলে আমরা দান করব এবং সৎ হয়ে যাবে। কিন্তু যখন আল্লাহ তাদের বিত্তশালী করলেন তখন তারা কার্পণ্য করতে লাগল এবং নিজেদের অঙ্গীকার থেকে এমনভাবে পিছটান দিল যেতার কোনো পরোয়াই করল না।"

এ আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, ধনসম্পদ মানুষকে দ্বীন থেকে দুরে সরিয়ে রাখে। তবে এটাও সত্য যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে এমন অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন, এমনকি বর্তমানেও অনেক ধনী মানুষ আছেন যারা সৎপথে অর্থ উপার্জন করেছেন এবং তাদের ধন-সম্পদকে আল্লাহর পথেই ব্যয় করেছেন। তারা নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত হবেন। তবে রাসূল (সা) যেহেতু দারিদ্র্যকেই বেশী পছন্দ করতেন তাই আমরাও দরিদ্রদের ভালোবাসব, সবসময় চেষ্টা করব তাদের পাশে দাঁড়াতে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৭

 

২০১৮-০৩-১৭ ১৬:১৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য