আমরা গত আসরে আমাদের জীবনের বেদনা বিষাদ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম,কোনো মনোবিজ্ঞানীই মানুষের বিষাদ,বেদনা, দু:খ ইত্যাদিকে অপ্রয়োজনীয় কিংবা ক্ষতিকর বলে মনে করেন না।

তবে অনেক সময় বিরক্তিকর বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও এই বিরক্তিকর উপসর্গ বা মানসিক প্রবণতা ব্যক্তিকে অনেক ক্ষেত্রে উদ্দীপনা দেয়। যেই উদ্দীপনা উত্তেজনাপূর্ণ বিরূপ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে যথোপযুক্ত আচরণ করতে প্রেরণা জোগায়।

সুতরাং একথা বলা যায় যে,দু:খ বিষাদের নিজস্ব কোনো মূল্য নেই। এই দু:খ বিষাদ যদি হিংসার কারণে হয়ে থাকে তাহলে তা অনুকূল নয়। আর যদি তা আখেরাত কিংবা ঈমানি ভবিষ্যত চিন্তা থেকে উঠে এসে থাকে তাহলে তা ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। মুমিনদেরকে এই অনুকূল চিন্তার দিকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কেননা এই ইতিবাচকতা মুমিনদের অন্তরে ক্রমাগত আনন্দ উদ্দীপনা জাগায়। এ প্রসঙ্গে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে সূচনা করবো আজকের আসর।

 

কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখে অর্থাৎ মুমিন, তার উচিত মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে আনন্দ উদ্দীপনার সাথে তাকানো। পবিত্র কুরআন মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানায় তারা যেন ভয়-ভীতি, বেদনা-বিষাদকে যেন নিজেদের মনে স্থান না দেয় বরং তারা যেন সবসময় আনন্দ উদ্দীপনা, হাসি খুশিকেই নিজেদের ভেতর বেশি বেশি লালন করে। কেননা একটি সমাজে বিরাজমান আচরণ ওই সমাজের সংস্কৃতিকে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় দিকেই পরিবর্তিত করে দিতে পারে। যার পরিণতিতে একটি সমাজ হয় আশা ও উদ্দীপনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে নতুবা হতাশা কিংবা বিষাদময় হয়ে উঠবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে সমাজে যদি আশা ও উদ্দীপনা বিরাজ করে তাহলে ওই সমাজ বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে। সেইসাথে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে উঠবে।

পক্ষান্তরে হতাশাগ্রস্ত সমাজে ঠিক তার বিপরীত অবস্থা বিরাজ করবে।সেই সমাজে বস্তুগত এবং আধ্যাত্মিক অধপতন ও অবক্ষয় দেখা দেবে। সে কারণেই বিষাদময়তাকে শয়তান, মুনাফেকিন, কাফের এবং মুশরিকদের নিদর্শন বলে মনে করা হয়। কুরআনে কারিম তাই মানুষের মাঝে আশা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে পার্থিব এই পৃথিবীকে পরকালীন অনন্ত জীবনের তুলনায় ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বলে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এর কারণ হলো মুমিনরা যেন দু:খ বিষাদ কমিয়ে হাসি খুশি আনন্দকে বাড়িয়ে তোলে। সূরায়ে নামলের সত্তর নম্বর আয়াতে রাসূলে খোদা (সা) কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে: "হে নবী! তাদের অবস্থার জন্য-অর্থাৎ অমান্য করা বা অস্বীকার করার জন্য-দুঃখ করো না এবং তাদের চক্রান্তের জন্য মনঃক্ষুন্ন হয়োনা"!

অন্তরে দু:খ বেদনাকে বেশি বেশি স্থান দেয়া কিংবা জীবনে বিরক্তি বা মনঃক্ষুন্ন হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সূরায়ে হিজরের ৮৮ নম্বর আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে: "আমি তাদের মানে কাফেরদের মধ্য থেকে বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের দুনিয়ার যে সম্পদ দিয়েছি সেদিকে তুমি চোখ উঠিয়ে দেখো না এবং তাদের অবস্থা দেখে মনঃক্ষুন্নও হয়ো না"!

দু:খ বিষাদ অনেক সময় ব্যক্তির নিজস্ব কৃতকর্মের কারণেও হতে পারে। এই বিষাদ ব্যক্তির মানসিক সমস্যার কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে। ব্যক্তিগত কর্ম থেকে উৎসারিত বেদনা বিষাদের কারণে সংস্লিষ্ট ব্যক্তি চেষ্টা করে গান-বাজনা, মিউজিক শুনে শুনে বেদনা ভুলে থাকতে কিংবা কখনো বিষাদমুক্তির উপায় হিসেবে মাদকে আসক্ত হয়ে ওঠারও আশংকা থেকে যায়।

 

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এই মনোবেদনা দূর করার জন্য বেদনানাশক ট্যাবলেট যাকে পেইন কিলার বলা হয় কিংবা ভিটামিন জাতীয় ওষুধ আবার কখনো রিলাক্সেশানের লক্ষ্যে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানোর চেষ্টা করে। ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানোর মাধ্যমে রোগীকে একটু আরাম ও প্রশান্তি দেওয়ার কৃত্রিম প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু এ ধরনের রোগের উপশমের জন্য পবিত্র কুরআন চমৎকার নির্দেশনা দিয়েছে। সেটা হলো আশার আলো। পবিত্র কুরআন পরকালীন জীবনের সুখ শান্তির সুসংবাদ দিয়ে রোগীর অন্তরে আশাবাদ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। পরকালীন শান্তির জন্য প্রয়োজন পার্থিব এ দুনিয়ায় সুন্দর ও সৎ জীবনযাপন করা। আরও প্রয়োজন আল্লাহকে স্মরণ করা, নেক আমল ও তওবা করা। আর এই কাজগুলোই একজন ব্যক্তিকে সার্বিক দ:খ,বেদনা, বিষাদ, হতাশা থেকে মুক্তি দেওয়ার সর্বোত্তম উপায় বলে মনে করা হয়।

তওবার প্রসঙ্গটি এসেছে আমাদের আলোচনায়। তওবা হলো আমুষের অন্তরকে রিফ্রেশ বা ঝেড়ে পুনর্গঠন করার উপায়। তওবার ফলে মানুষ অপরাধ ও পাপ, হতাশা, ব্যর্থতার গ্লানি ইত্যাদি হ্রাস করতে পারে। মানুষের সাহায্যকারী হলেন আল্লাহ। সুতরাং আল্লাহর সাহায্য পেলে কোনো মানুষ আর ব্যর্থতার জালে নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। আল্লাহর সাহায্যে মানুষ অবশ্যই আশার নবীন আলোয় তার অন্তরাত্মাকে গ্লানিমুক্ত করে জাগিয়ে তুলকে পারে। মানুষের মনে শক্তি ও প্রফুল্লতার আরেকটি উৎস হলো প্রার্থনা মানে নামাজ, দোয়া ইত্যাদি। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করে একজন মানুষ খুব সহজেই তার ভেতরটাকে প্রশান্তিতে ভরে তুলতে পারে।

দু:খ, বেদনা, বিষাদ থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে দোয়ার প্রভাব সম্পর্কে সূরায়ে আম্বিয়ার ৮৭ ও ৮৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: আর মাছওয়ালাকেও আমি অনুগ্রহ ভাজন করেছিলাম। স্মরণ করো যখন সে রাগান্বিত হয়ে চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তাকে পাকড়াও করবো না। শেষে সে অন্ধকারের মধ্য থেকে ডেকে উঠলো: “তুমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই,পবিত্র তোমার সত্তা,অবশ্যই আমি অপরাধ করেছি।”

তখন আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং দুঃখ থেকে তাকে মুক্তি দিয়েছিলাম,আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/২১

২০১৮-০৩-২১ ১৭:৪৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য