রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে যে, মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। আবার জ্ঞান বলতে যে কী বোঝায় তা বলাও সহজ কাজ নয়। তবে, সোজা কথায় বলতে গেলে, কোনো কিছু বোঝার, উপলব্ধি করার, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বোঝানোর এমনকি কোনো কাজের পরিণতি সম্পর্কে একটা ধারণা করার যোগ্যতার নামই হলো জ্ঞান।

এই জ্ঞান আবার অনেক প্রকারের। এমন অনেক জ্ঞান আছে যেই জ্ঞান একান্তই মনীষীবৃন্দ ছাড়া সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারেন না- যদি না সে সম্পর্কে তাঁকে ঐ জ্ঞানী কোনো ধারণা দেন। পৃথিবীর বুকে যতো রকম জ্ঞান আছে সবই সীমিত। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে যেই জ্ঞান নবী রাসূলদের দিয়ে থাকেন সেই জ্ঞানের কোনো সীমা নেই। তবে সীমিত জ্ঞানের অধিকারী মানুষের মধ্যেও যাঁরা অগ্রসর অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে বেশি জ্ঞান রাখেন তাঁদেরকে আমরা পণ্ডিত বা মনীষী কিংবা চিন্তাবিদ বলে থাকি।

 

প্রাচীনকালে এরকম একজন জ্ঞানী শাসক ছিলেন যিনি সাধারণ জ্ঞানের বাইরেও অনেক কিছু জানতেন। এই শাসকের মনের ভেতর অনেক রহস্যই জমা ছিল। রহস্য মানে হলো অজানা জ্ঞান। তবে এমন একটা বিশেষ রহস্য ছিল যে সম্পর্কে অন্য কেউ কিছুই জানত না। সে জন্যে শাসক চাইতেন ওই গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের কথা এমন কাউকে জানিয়ে দেবেন যিনি সেই রহস্যের বিষয়টি নিজের ভেতরে ধারণ করবেন এবং মনে মনে লালন করে যাবেন, জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন না।

আজকের আসরে আমরা ওই শাসকের গোপন রহস্য প্রকাশ সম্পর্কে একটি গল্প শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে ভারতের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

বন্ধুরা, আমরা আগেই বলেছি যে, ওই শাসক তার গোপন রহস্যটি প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু কাকে বলা যায়- তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি। শাসক চাচ্ছেন কাউকে না কাউকে বলে তাঁর দুশ্চিন্তা থেকে কিছুটা হালকা হতে। কেননা এই দুশ্চিন্তাটা তাঁর মাথার ভেতরে পাথরের মতো শক্ত, কঠিন এবং ভারী মনে হতো। কিন্তু যখনই তিনি বিশ্বস্ত লোক নিয়ে ভাবতেন, নিজের আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব বা নিকটজনদের কাউকে বলবেন বলে ভাবতেন, তখনই আবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যেতেন।

মনে মনে ভাবতেন কাউকে রহস্যের কথাটা বললে তো সে জেনে যাবে তাঁর ভেতরের রহস্য, আর জনগণ যদি তাঁর ভেতরের রহস্যের কথা একবার জেনে ফেলে তাহলে তো জনগণের কাছে তাঁর মান সম্মান মর্যাদা বলতে আর কিছুই থাকবে না, সবই ধূলায় লুটিয়ে পড়বে। এমনকি তাঁকে এতোদিন মানুষ যেই দৃষ্টিতে দেখত, তাঁকে যেভাবে জানত, সেভাবে আর তাঁকে কেউ দেখবেও না, জানবেও না। তাহলে তো জনগণের মাঝে তাঁর ব্যক্তিত্বের আয়নাটুকু ভেঙে কাঁচের মতো টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কিন্তু রহস্যের ব্যাপারটা নিজের ভেতরে আর ধরেও রাখা যাচ্ছে না।

কী করা যায় .. কী করা যায় ... এরকম ভাবতে ভাবতে একদিন শাসক লোকটি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন যে আজ সবাইকে ডেকে বিষয়টা জানিয়ে দেবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর কাছের লোকজন যারা ছিল তাদের কয়েকজনকে তাঁর কাছে ডাকলেন। কয়েকজন যখন এল তিনি তাঁদেরকে সুন্দর করে বললেন: “দ্যাখো! তোমরা সবাই আমার নিকটজন! একান্তই আপন! তোমাদের সবাইকেই আমি বিশ্বাস করি, তোমাদের ওপর আমার একান্ত আস্থা আছে। সে জন্যেই আমি চাচ্ছি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তোমাদের সাথে পরামর্শ করব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে তোমাদের ওপর যে তোমরা কিছুতেই বিষয়টা নিয়ে কারো সাথেই আলাপ আলোচনা করবে না, কাউকে জানাবে না। তোমাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, তোমার তোমাদের একেবারে কাছের মানুষের সাথেও এ বিষয়টা নিয়ে কথা বলো না! তোমাদের নিজেদের পরিবার পরিজনের সাথে তো নয়ই এমনকি আমার নিজের পরিবারের কারো সাথেও না। তোমরা কথা দাও আমি যে বিষয়টা নিয়ে তোমাদের সাথে কথা বলব, তার রহস্যটা তোমরা সারাটা জীবন নিজেদের মনের ভেতরে লুকিয়ে রাখবে, যতোদিন তোমরা এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে ততোদিন কারো সাথে তা নিয়ে কথা বলবে না, রহস্যটা কারো কাছে ফাঁস করে দেবে না।”

শাসকের একান্ত আপনজনদের একজন বলল: “হুজুর! আমাদের ওপর আপনি নিশ্চিন্তে আস্থা রাখতে পারেন। আপনি যা বলতে চান একেবারে কোনো চিন্তা ভাবনা না করে বলে ফেলুন! আপনি আমাদের ওপর একশ’ ভাগ বিশ্বাস রাখতে পারেন যে আমরা কারো কাছেই আপনার রহস্যের কথাটা নিয়ে আলাপ আলোচনা করবো না। আমরা আমাদের প্রিয় শাসকের পথে নিজেদের প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে রাজি আছি! আর সামান্য একটা রহস্যের কথা তো ছাই।”

শাসক বললেন: “ব্যাপারটা হলো যে আমার মনের ভেতরে একটা গূঢ় রহস্য আছে। অনেক কষ্টে অনেক যত্ন করে এতোদিন আমি সেটা আমার মনের ভেতরে পুষে রেখেছি। পুষে রাখতে রাখতে এটা এখন বহন করা আমার জন্যে কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমাকে ভীষণভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে। আমি এখন সেটা তোমাদেরকে জানিয়ে একটু হালকা হতে চাচ্ছি। যদি শুনি তোমাদের কেউ রহস্যটা কারো কাছে ফাঁস করে দিয়েছ, তাকে নির্দয়ভাবে মেরে ফেলব, কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না।”

শাসকের হুমকি শুনে পণ্ডিতের স্বজনরা তাঁকে কথা দিল যে কোনোভাবেই তারা তাদের নিকটজনদের কাছেও ফাঁস করবে না। কথা পেয়ে পণ্ডিতও এক এক করে রহস্যটা তাঁর বিশ্বস্ত স্বজনদের কাছে ফাঁস করল। তারপর এক করে সবার দিকে তাকিয়ে বলল: “যে কথা দিয়েছ! তা রক্ষা কর! যারা কথা দিয়ে কথা রাখবে না, তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে কঠিন মৃত্যু। এই রহস্যটা আমি গত এক বছর ধরে নিজের মনে পুষে রেখেছি, কাউকে বলিনি।”

রহস্যের কথা ফাঁস করে দেওয়ার পর ঘটল আসল ঘটনা। শাসক যে রহস্যটা একটি বছর নিজের ভেতর পুষে রেখেছিলেন, স্বজনদের কাছে ফাঁস করে দেওয়ার পরদিনই তা পুরো এলাকায় চাউর হয়ে গেল। ফলে সবাই সেই রহস্যটা জেনে গেল। শাসক যখন জানতে পারলেন যে স্বজনরা কথা রাখে নি, রহস্যটা ফাঁস করে দিয়েছে তখন মনে মনে বললেন: “আমার আপনজনেরা আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখল না। এমনকি যে রহস্যটা এতোদিন আমি পুষে রেখেছিলাম অন্তত একটা দিনও তারা তা পুষে রাখতে পারল না, অথচ ফাঁস করবে না বলে তারা আমাকে কথা দিয়েছিল। সুতরাং তাদের সবাইকে জল্লাদের হাতে সঁপে দেবো।”

শাসক রহস্য ফাঁসকারীদের সবার মুণ্ডুপাত করার আদেশ দিলেন। এবার শাসকের নিকটজনেরা কান্নাকাটি শুরু করে দিল। অনুনয় বিনয় করতে লাগল। একজন বলল: “হে মহান শাসক! আমরা অন্যায় করে ফেলেছি, আমাদের ক্ষমা করে দিন! যাঁরা মহান তাঁরাই তো ক্ষমা করেন। আমরা জানি আমরা যে অন্যায় করেছি সে জন্যে আমাদের মাথা কেটে ফেলা উচিত। কিন্তু তুমি তো মহান শাসক! তুমি মহত্ব দেখিয়ে আমাদের ক্ষমা করে দাও! আমাদেরকে জল্লাদের হাতে তুলে দিও না। শয়তান আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। আমরা কথা দিচ্ছি আর এমন ভুল করব না।”

কিন্তু শাসকের মন গলল না। তিনি বললেন: “চুপ করো! আগেও তোমরা কথা দিয়েছিলে! কিন্তু কথা রাখনি। তোমরা জানতে কথা ভঙ্গ করার শাস্তি মৃত্যু। তারপরও কথা ভঙ্গ করেছ। তোমার ওপর আমার আর কোনো আস্থা কিংবা বিশ্বাস নেই। তোমরা রহস্যের কথা ফাঁস করে দিয়ে জনগণের কাছে আমার মাথা হেঁট করে দিয়েছ, আমাকে অপমান করেছো। আমি বলেছিলাম কথা দিয়ে কথা না রাখলে অবশ্যই হত্যা করা হবে। তোমাদের মৃত্যু হয়তো অন্যদের জন্যে শিক্ষণীয় হবে। এই বলে শাসক জল্লাদের দিকে তাকিয়ে বললেন: তরবারি হাতে নাও! আর একেক করে এই বিশ্বাসঘাতকদের সবার মাথা কেটে ফেল।”

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের মাঝে এক বয়োবৃদ্ধ লোক ছিলেন। তিনি বললেন: “কেন আমাদের হত্যা করছো! তুমি নিজেই তো অন্যায়কারী।”

শাসক বিস্ময়ের সাথে বললেন: “কী বললে! কথা ভঙ্গ করেছো তোমরা আর অন্যায় করেছি আমি! কিন্তু কীভাবে?”

বৃদ্ধ বললেন: “হে মহান শাসক! তোমার অন্তর ছিল রহস্যের ধারায় পূর্ণ। তুমি ওই ঝর্ণাপ্রবাহের মুখে বাঁধ না দিয়ে সেই বাঁধ বরং ভেঙে দিয়ে কয়েকজনের মাঝে তা জারি করে দিয়েছো। ঝর্ণার সেই ধারা নদীতে পরিণত হলো আর নদীর জোয়ারে বন্যা দেখা দিল। এখন এই বন্যাকে তুমি কী করে ঠেকাবে?”

শাসক বললেন: “কিন্তু আমি তো তোমাদের বিশ্বাস করেছিলাম। তোমরা আমার আপনজন। আমি কি জানতাম যে তোমরা বিশ্বাসভঙ্গ করবে!”

বৃদ্ধ বললেন: “গুপ্তধন গোপন গোলাতেই রাখতে হয় আর গোপন রহস্য পুষতে হয় নিজের ভেতরেই। রহস্যের কথা মুখে না আনা পর্যন্তই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু একবার মুখ খুললেই তা আর নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য থাকে না।”

শাসক গভীর মনোযোগ দিয়ে বৃদ্ধের কথাটা শুনে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। ভাবলেন, সত্যিই তো, যে রহস্য নিজেই পুষে রাখতে পারলাম না, আরেকজন পুষে রাখবে, সেটা ভাবি কী করে! এই ভেবে তাঁর নিকটজনদের উদ্দেশ্যে বললেন: “এই অভিজ্ঞ বৃদ্ধ যথার্থই বলেছেন। ভুলটা আসলে আমারই ছিল। তোমাদের কাছে আমাদের মনের ভেতরের গোপন রহস্যটা ফাঁস করা ঠিক হয় নি। তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। তবে তোমরা আর আমার স্বজন থাকবে না, কেবল এই বৃদ্ধ ছাড়া। কারণ এই বৃদ্ধ আমাকে পথ দেখিয়েছে।”

বন্ধুরা, তোমরা কি কেউ বলতে পার, রহস্যটা কী ছিল? হ্যাঁ, যে কথাটা বলা হয় নি এবং যা নিয়ে তোমরা এখন ভাবতে বসেছো.. তাকেই বলে রহস্য। এ গল্পটি থেকে আমরা দু’টি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।

প্রথম শিক্ষাটি হলো- আমাদের এমন কথা বলা উচিত না যা নিজেরা করি না।

দ্বিতীয় শিক্ষাটি হলো- কেউ বিশ্বাস করে কাউকে কোনো গোপন কথা বললে তা কোনোভাবেই প্রকাশ করা উচিত নয়। আমরা যেন এ শিক্ষা দু’টি আমাদের জীবনে কাজে লাগাতে পারি এ কামনা করছি।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/ মো:আবু সাঈদ/২৩

ট্যাগ

২০১৮-০৩-২৩ ১৭:১৫ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য