মসজিদ হচ্ছে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের মিলনস্থল। জামায়াতের সঙ্গে ফরজ নামাজ আদায়ের জন্য তারা এখানে সমবেত হন। এখানে মুসল্লিরা পরস্পরের খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি দেশ ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে মতবিনিময় করেন বলে মসজিদ কখনো কখনো রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর কেন্দ্রেও পরিণত হয়।

আজকের আসরের প্রথম অংশে আমরা মসজিদের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করব। আর শেষাংশে ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমের আ’যাম মসজিদকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

যে সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত সেখানে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো দূরত্ব থাকা উচিত নয়। সেখানে সাধারণ মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং এ ব্যাপারে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে পারেন। সেইসঙ্গে তারা নিজেদের সুচিন্তিত মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করতে পারেন।

মদীনায় নব্য ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বনবী (সা.) ইসলামের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি তাদেরকে শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের উদ্যোগ নেন। আগে থেকেই মসজিদ ছিল মুসলমানদের মিলনমেলা। রাসূলে খোদা এই মসজিদকে রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে পরিণত করেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, পরবর্তী সময়েও মসজিদের এই ভূমিকা প্রচলিত ছিল এবং তৎকালীন বেশিরভাগ রাজনৈতিক তৎপরতা মসজিদেই সম্পন্ন হতো। নতুন খলিফার নাম ঘোষণা, তার সঙ্গে জনগণের বায়াত বা আনুগত্যের শপথ, বিভিন্ন এলাকার গভর্নরসহ অন্যান্য কর্মকর্তার নিয়োগ বা বরখাস্ত, উপদেষ্টাদের বৈঠক, মুসলমানদেরকে জিহাদে যেতে উদ্বুদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো মসজিদেই সম্পন্ন করা হতো। এভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র সময় থেকে শুরু করে আব্বাসীয়দের শাসনামলের গোড়ার দিক পর্যন্ত মসজিদ মুসলিম বিশ্বের সব রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

মদীনায় ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাসূলে আকরাম (সা.) সব রাজনৈতিক কার্যক্রম মসজিদে বসেই পরিচালনা করতেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধিদেরকে তিনি মসজিদে স্বাগত জানাতেন এবং এখানে বসেই তাদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হতেন। এসব বৈঠকে ইসলামকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পাশাপাশি এই ধর্মের নীতিমালা বিদেশি প্রতিনিধিদের বুঝিয়ে দিতেন আল্লাহর রাসূল। মসজিদে নববীর যে স্তম্ভের পাশে বসে বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করতেন সেই স্তম্ভের নাম দেয়া হয়েছে ইস্তাওয়ানাতুল উফুদ বা প্রতিনিধিদের স্তম্ভ।

পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের প্রসার ঘটার পর মসজিদ ছিল ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতীক। মুসলমানরা নতুন নতুন এলাকা বিজয়ের পর সবার আগে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করতেন। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় ও প্রধান মসজিদটি নির্মাণ করা হতো শহরের শাসক বা গভর্নরের বাসভবনের পাশে। শাসকের আবাসিক দপ্তরকে তখন বলা হতো দারুল ইমারাহ। কোনো কোনো শহরে দারুল ইমারাহ ও মসজিদ এত কাছাকাছি নির্মাণ করা হতো যে, দু’টি ভবনকে আলাদা করাই কঠিন হয়ে যেত। সবার মাঝে সে সময় এই ধারনা প্রচলিত ছিল যে, শাসকের হাতেই রয়েছে সব রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব।  প্রকৃতপক্ষে ইসলামি শিক্ষার চেতনাও ঠিক তাই। ইসলামে ধর্ম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। মুসলিম শাসক রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি ধর্মীয় নেতার দায়িত্বও পালন করতেন এবং ওই দু’টি কাজই পরিচালিত হতো ধর্ম ও রাজনীতির মিলনকেন্দ্র এই মসজিদে বসে। মসজিদের সঙ্গে রাজনীতির গভীর সম্পর্কের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে- ইসলামি শাসনের যুগে বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদে সংরক্ষিত থাকত।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমের আ’যাম মসজিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

এই মসজিদ পবিত্র নগরী কোমের অন্যতম বৃহৎ ও একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এখানে হাজার হাজার মুসল্লি ও জিয়ারতকারী প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে আদায় করেন। ১৩৭৪ হিজরি মোতাবেক ১৯৫৪ সালে তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদির উদ্যোগে হযরত মাসুমা সালামুল্লাহি আলাইহার মাজারের পাশে মসজিদটি নির্মিত হয়। আয়তনে বিশাল হওয়ায় এর নাম দেয়া হয়েছে বড় মসজিদ বা মসজিদে আ’যাম।

মসজিদটি স্থাপনের পর এখানে অনেকগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। এর একটি হচ্ছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী (রহ.) ১৯৬৪ সালে তাঁর শাহ বিরোধী বিখ্যাত ভাষণটি এই মসজিদে বসে দিয়েছিলেন।  কোমের বিশ্বখ্যাত মাদ্রাসা- ‘হৌযে এলমিয়ে’র অনেক ক্লাস এই মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। আয়াতুল্লাহিল উজমা ওয়াহিদ খোরাসানি, আয়াতুল্লাহিল উজমা মাকারেম শিরাজি, আয়াতুল্লাহিল উজমা সোবহানি, আয়াতুল্লাহিল উজমা যানজানি, আয়াতুল্লাহিল উজমা নুরি হামেদানি, আয়াতুল্লাহিল উজমা জাওয়াদি আমুলি ও আয়াতুল্লাহ আলাভি’র মতো প্রখ্যাত আলেমগণ প্রতিদিন এখানে ক্লাস নেন। প্রতি বছর এই মসজিদে এ’তেকাফে বসেন শত শত মুসল্লি।

মাশহাদ শহরে ইমাম রেজা (আ.)’র মাজার সংলগ্ন গওহরশাদ মসজিদ নিয়ে আমরা গত কয়েকটি আসরে আলোচনা করেছি। এই মসজিদ দেখে কোমে হযরত মাসুমা’র মাজারের পাশে আ’যাম মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন মরহুম আয়াতুল্লাহিল উজমা হোসেইন বোরুজেরদি। এ ছাড়া, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই আলেমে দীন ‘হৌযে এলমিয়ে কোমের’ ক্লাস অনুষ্ঠানের জন্য বিশাল একটি স্থানের কথা মাথায় রেখেছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন, সে সময়কার মাদ্রাসা ভবনগুলোতে দেশ-বিদেশ থেকে আগত হাজার হাজার তালেবুল এলমের স্থান সংকুলান হবে না। কাজেই মাজারের পাশে একটি বড় মসজিদ স্থাপন করলে একসঙ্গে এই সবগুলো প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে। এই মসজিদ নির্মাণের খরচের একাংশ আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদি নিজেই বহন করেন। বাকি অর্থ আসে জনগণের সাহায্য থেকে।

কোমের আ’যাম মসজিদের আয়তন ১২ হাজার বর্গমিটার এবং এটি এই নগরীর সবচেয়ে বড় ও সর্বোৎকৃষ্ট ধর্মীয় স্থাপনা। তৎকালীন ইরানের শ্রেষ্ঠ প্রকৌশলি হাজি হোসেইন লোরযাদেহ’র তত্ত্বাবধানে মসজিদটি নির্মিত হয়। তিনি প্রাচীন নির্মাণশৈলি ব্যবহার করে ইট-সুরকি দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন যাতে অন্তত কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত ভবনটি টিকে থাকে। ইসলামি রীতিতে নির্মিত মসজিদটিতে রয়েছে একটি বিশাল গম্বুজ। এই গম্বুজের আয়তন ৩০ বর্গমিটার। মসজিদের ছাদ থেকে এর উচ্চতা ১৫ মিটার এবং ভূমি থেকে এটি ৩৫ মিটার উচুতে অবস্থিত। মসজিদটির উত্তর পার্শ্বে একটি ছোট টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে যাতে রয়েছে একটি বিশাল ঘড়ি। ঘড়িটি চারদিক থেকেই দৃশ্যমান। মসজিদে নামাজ আদায়ের জন্য বিশালকায় অনেকগুলো কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে মূল কক্ষ চারটি।

গম্বুজের নীচের কক্ষের আয়তন ৪০০ বর্গমিটার এবং আর চারপাশের কক্ষগুলোর প্রতিটির আয়তন ৯০০ বর্গমিটার করে। মসজিদের উত্তর পার্শ্বে বিশাল ঘড়ির নীচে রয়েছে আরেকটি কক্ষ যার আয়াতন ৩০০ বর্গমিটার। এসব কক্ষের প্রতিটির ছাদ ভূমি থেকে ১০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ওজুখানা এবং খাদেমদের বিশ্রামের ঘর। কোমের আ’যাম মসজিদে রয়েছে বিশাল এক পাঠাগার। জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা এখানে তাদের ধর্মীয় জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে পারেন। আসলে আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদি কোম নগরীতে একটি স্বতন্ত্র পাঠাগার স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই মসজিদ নির্মাণের কাজ যখন সমাপ্তির পথে তখন বিশিষ্ট আলেমগণ তাকে মসজিদের ভেতরেই পাঠাগার স্থাপনের পরামর্শ দেন।

আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদি ১৯৬০ সালের ৩০ মার্চ ইন্তেকাল করন এবং তাকে তাঁরই নির্মিত আ’যাম মসজিদের পশ্চিম প্রান্তে দাফন করা হয়। তার কবরের স্থানটিতে মসজিদ নির্মাণের আগে ৬০ বর্গমিটার আয়তনের ছোট একটি ঘর ছিল। ঘরটি ছিল আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদির পৈত্রিক সম্পত্তি। মসজিদ নির্মাণের পর তিনি এখানে নিজের কবরের স্থান চিহ্নিত করেন। এরপর ওই ৬০ বর্গমিটার জায়গার বাকিটুকু মসজিদে দান করে যান।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ২৩

২০১৮-০৩-২৩ ১৭:৪৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য