আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে ২০১৭ সালকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা "বিষন্নতার বছর" বলে ঘোষণা করেছে। তাদের ঘোষণা থেকে মনে করা যেতেই পারে যে আমাদের জীবন থেকে বুঝি সকল আনন্দ, হাসি-উল্লাস হারিয়ে গেছে।

সেজন্য সবাই বিষন্নতায় ভুগছে এবং হাসি আনন্দ খুঁজে বেড়াচ্ছে। আসলে ছোট্ট একটি প্রাণবন্ত হাসি আপনার আশেপাশে যারা রয়েছে তাদের ভেতরের সকল অশান্তি এবং অস্থিরতা দূর করে দিয়ে মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিতে পারে অনাবিল প্রশান্তি। এ কারণেই মুসলমানদের মুখে সবসময় একটি সুন্দর হাসি রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণটা হলো এই হাসি ব্যক্তির নৈতিক সৌন্দর্যকে চেহারায় ফুটিয়ে তোলে।

আনন্দ, খুশি এসব সচেতনতা, সৃজনশীলতা এবং কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করে। শুধু তাই নয় হাসি আনন্দ স্বাস্থ্য সুরক্ষা করার পাশাপাশি মানুষের আয়ুও বৃদ্ধি করে। সুখি মানুষ সুস্থ, জ্ঞানী, দ্বীনদার এবং ইতিবাচক দৃষ্টির অধিকারী। সুতরাং প্রেম এবং আনন্দের প্রকাশ কেবল ব্যক্তির মানসিক সুস্থতার জন্যই কল্যাণকর নয় বরং অন্যদের মাঝেও আনন্দের বিস্তার ঘটায়। এর কারণ হলো যার সঙ্গে আপনি আনন্দ প্রকাশ করছেন, হেসে হেসে কথা বলছেন সেই ব্যক্তিও কিন্তু একইভাবে হেসে হেসেই আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আনন্দ প্রফুল্লতা আমাদেরকে সামাজিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে উদ্যমী করে তুলতে সাহায্য করে। প্রফুল্লতার হাসি আঠার মতো যার সাহায্যে সমাজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকা যায়।প্রফুল্লতার একটা গুণ হলো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হলে আমাদের মানসিক সুস্থতা রক্ষা করে এবং দুশ্চিন্তাসহ অপ্রত্যাশিত প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।

 

প্রফুল্লতার ইতিবাচকতা আমাদের চিন্তার সীমা মানে মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতার চেয়েও বেশি। অবশ্যই মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য প্রফুল্ল থাকা খুবই জরুরি। কেননা অস্থির, বিষন্ন কোনো ব্যক্তি সুস্থ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। সে কারণেই উচ্চতায় পৌঁছা কিংবা উন্নতির শিখরে আরোহন করার পথ খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টিতে মানসিক প্রফুল্লতা খুবই প্রয়োজনীয়। এ নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো খানিক মিউজিক বিরতির পর।

প্রফুল্লতার ইতিবাচক দিক নিয়ে কথা বলছিলাম। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রফুল্লতার জেনেটিক শেকড় থাকাটা বিচিত্র নয়। তবে আনন্দ ও তুষ্টির অনুভূতি এমন একটা গুণ বা বৈশিষ্ট্য যা সমস্ত শরীরে প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে হাসিখুশি প্রাণোচ্ছ্বল মানুষের হার্টবিট অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। তাছাড়া এই শ্রেণীর মানুষের ব্লাডপ্রেসারের ওঠানামা অনেক কম দেখা যায়। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে কানাডার গবেষকদের মাধ্যমে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে আনন্দ ও প্রফুল্লতার মতো ইতিবাচক অনুভূতির ফলে করোনারি হার্ট ডিজিজের মতো রোগের আশঙ্কা শতকরা অন্তত ২২ ভাগ কমে যায়। মুখে হাসির রেখা লেগে থাকা প্রফুল্লতার বাহ্যিক লক্ষণ। তবে মানুষের আত্মা ও মানসিকতার সঙ্গে প্রফুল্লতার অলঙ্ঘণীয় ও সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে। 

হতে পারে কেউ একটু মিউজিকের শব্দ শুনেই আনন্দিত হয়ে পড়ে আবার কেউ ক্ষমা বা ত্যাগের মাধ্যমেও সুখ পায়। কিন্তু যদি গভীরভাবে দৃষ্টি দেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে আরও বিভিন্ন পরিস্থিতি ও উপাদান মানুষের মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। ধরা যাক আপনি নামাজ পড়েছেন কিংবা দোয়া করেছেন,আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। যারা ক্রীড়া পছন্দ করেন তারা তাদের পছন্দের খেলা খেলে বা দেখে আনন্দ অনুভব করেন। অনেক পুরোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ আলাপ আলোচনা হলেও মন ভালো হয়ে যায়। পছন্দের কোনো বই পড়লেও একটু প্রফুল্লতার অনুভূতি ছেয়ে যায় মনের ভেতর। বন্ধু-বান্ধবদের সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার মাধ্যমেও অনেকের মন ভালো হয়ে যেতে পারে। আবার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হলেও অনাবিল এক আনন্দ বয়ে বেড়ায় মনোরাজ্যে। এসবই প্রফুল্লতার অনুভূতিকে আরও চাঙ্গা করে তুলতে সাহায্য করে।

মনোবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ মিনা তোরাবি'র একটি উদ্ধৃতি এখানে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। এই ভদ্র মহিলা বলেছেন: "একজন মানুষ যখন আনন্দানুভূতিময় অবস্থার মধ্যে থাকে,তখন তার মাথায় যেসব চিন্তা উঁকি মারে তা একান্তই ইতিবাচক। ওই চিন্তা তার কল্যাণ অনুভূতি ও প্রশান্তি বাড়িয়ে দেয়। ওই মানুষটি তখন সবার ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়ে যায়। এ ধরনের মানুষের সঙ্গে অন্যরা কথাবার্তা বলতে ইচ্ছা পোষণ করে এবং নিজেদের কাজের ব্যাপারে তার সঙ্গে পরামর্শ করতে চায়"। তিনি ইতিবাচক চিন্তাকে প্রফুল্লতার একটি উপাদান বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়: শুভ ও ইতিবাচক চিন্তা থাকার মানে হলো আশেপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে সবসময় সৌন্দর্য সন্ধানী হওয়া। সেইসঙ্গে ইতিবাচক দৃষ্টি নিয়ে পার্শ্ববর্তীদের প্রতি তাকানো এবং অন্যদের সঙ্গে কোথায় কোথায় অমিল রয়েছে তা না খুঁজে মিলগুলো খুঁজে ফেরা ইতিবাচক চিন্তার সুফল।  

আনন্দ ও প্রফুল্লতার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিও এরকমই ইতিবাচক। এ সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতগুলোকে বেহেশতিদের একটি চিহ্ন বলে মনে করা হয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে জীবনের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি মানসিক চাপ কমিয়ে আনন্দ ও প্রফুল্লতায় উপনীত হবার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/২৭

ট্যাগ

২০১৮-০৩-২৭ ১৬:৩৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য