আজকের আসরে আমরা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে মসজিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি কোমের বিখ্যাত জামকারান মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব।

গত আসরে আমরা মসজিদের রাজনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছি। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে মসজিদ নামাজ আদায়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক ও শিক্ষা কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এরপর গত ১৪শ’ বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে মসজিদ। প্রাথমিক যুগের সবগুলো কাজ এখন আর মসজিদে সম্পন্ন না হলেও  অনেকগুলো কাজ এখনো চলছে। ফরাসি চিন্তাবিদ গুস্তাভ লে বোন তার ‘আরব ও ইসলামি সভ্যতা’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন: “মুসলমানের জীবনযাপনের প্রকৃত কেন্দ্র হচ্ছে মসজিদ। মুসলমানরা মসজিদকে কখনো ইবাদত, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে আবার কখনো এর ভেতরেই বসবাস করে। খ্রিস্টানদের গির্জার মতো তারা মসজিদকে শুধুমাত্র ইবাদতের কাজে ব্যবহার করে না। ” মসজিদে বসবাস বলতে তিনি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মুসলমানদের এতেকাফে বসাকে বুঝিয়েছেন।

মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে মসজিদের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। মুসল্লিরা যখন জামায়াতে সারিবদ্ধভাবে নামাজ আদায় করেন তখন সমাজের এই মানুষগুলোর সামষ্টিক আচরণ প্রকাশ পায়।  ধনী-গরীব, উঁচু-নিচু নির্বিশেষে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজে দাঁড়ালে এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। পাশাপাশি অন্য সময়ে যখন মুসল্লিরা আলাদা আলাদাভাবে এই মসজিদে উপস্থিত হন তখনও তারা সতর্কতার সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত আচরণ ও কথাবার্তা নিয়ন্ত্রণ করেন। মসজিদে কেউ কোনো অবস্থায় স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেন না এবং এখানকার এই প্রশিক্ষণটি মানুষের সমাজে চলার উত্তম পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায়কারী একজন মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার স্বভাব-চরিত্রের খারাপ দিকগুলো বর্জন করে উন্নত গুণাবলী অর্জন করতে থাকেন।  এটি একটি দীর্ঘ ও চলমান প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত মসজিদে যাতায়াতকারী ব্যক্তি সমাজের আদর্শস্থানীয় মানুষে পরিণত হয়ে যান। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের উপাসনালয়ের এরকম কোনো বৈশিষ্ট্য নেই।

নিয়মিত মসজিদে যাতায়াতকারী একজন মানুষ প্রতিনিয়ত ঈমানদার, নামাজি, মুত্তাকি ও ধার্মিক ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ পান। এসব ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমান ও আমল সবার সামনে উন্মুক্ত। ধর্মভীরু এসব মানুষ সাধারণভাবে সমাজে সবার শ্রদ্ধাভাজন হন। পারিবারিক ও সামাজিক কাজেকর্মে এমনকি অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও এই মানুষগুলোর কথা ও দিক-নির্দেশনাকে সবাই সম্মান জানায়। পক্ষান্তরে মসজিদের সঙ্গে সম্পর্কহীন মানুষেরা ইসলামি সমাজে কোনো অবস্থাতেই এরকম শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে না।  সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হয়ত মানুষ বাইরে বাইরে সম্মান জানায় কিন্তু সেটাকে কোনো অবস্থায়ই একজন মুত্তাকি ব্যক্তি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে যে শ্রদ্ধা লাভ করেন তার সঙ্গে তুলনা করা চলে না।  

মসজিদের সঙ্গে সম্পর্কহীন মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক আচরণ সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা থাকে না বলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তাদের কথার কোনো মূল্য নেই।  ঠিক এ কারণেই রাসূলে আকরাম (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি জামায়াতে নামাজ আদায় করে না তার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বলবে, তাকে আমি চিনি না।” এর অর্থ হচ্ছে, তার কথা, কাজ, আচরণ ও প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।  যারা মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং জামায়াতে নামাজ আদায়ের প্রতি যাদের ভ্রুক্ষেপ নেই এই হাদিস তাদের জন্য এক ধরনের শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরানের কোম নগরীতে অবস্থিত জামকারান মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব।

কোমের বিখ্যাত জামকারান মসজিদ

ধর্মীয় নগরী কোম থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে জামকারান গ্রামের কাছে এই মসজিদ অবস্থিত। অতীতে এই মসজিদটি ‘কাদামগাহ’ মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে জামকারান গ্রামের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে ধীরে ধীরে এর নাম হয় জামকারান মসজিদ। এ ছাড়া, শিয়া মাজহাবের ১২তম ইমাম, ইমাম মাহদি (আ.)’র সঙ্গে সম্পর্কিত বলে এই মসজিদকে ‘সাহেবুজ্জামান মসজিদ’ও বলা হয়। কোনো কোনো ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে, ইমাম মাহদি (আ.)’র আবির্ভাবের পর তাঁর শাসনকার্য পরিচালনার অন্যতম কেন্দ্র হবে এই মসজিদ।

ইরানের প্রখ্যাত সমাজসেবক সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ আগাযাদেহ ১৯৫৫ সালে জামকারান মসজিদ পুনর্নির্মাণ করেন। মসজিদ পুনর্নির্মাণের সময় এটির দক্ষিণের আঙিনায় ছয়টি স্তম্ভের উপর ১৭ মিটার লম্বা ও চার মিটার চওড়া একটি হল নির্মাণ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল মসজিদের প্রধান ফটক। সে সময় মসজিদে একটি শিলালিপি সংযুক্ত ছিল যাতে মসজিদটির আগের পুনর্নির্মাণের তারিখ উল্লেখিত ছিল। এর আগে মসজিদটি ১৭৫৩ সালে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানেও এই শিলালিপিটি জামকারান মসজিদে সংরক্ষিত আছে।

মসজিদের পূর্বপাশের আঙিনায়ও রয়েছে ১৩ মিটার লম্বা ও চার মিটার চওড়া একটি হল। এই হলটির সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সাত রঙের টাইল ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ১৯৫২ সালে মসজিদটির পুনর্নির্মাণকারী সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ আগাযাদেহ’র নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে।

কোমের বিখ্যাত জামকারান মসজিদ

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর এই মসজিদের মুসল্লি ও জিয়ারতকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে থাকে। ফলে এর আয়তন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ কারণে মসজিদের মূল ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলে প্রখ্যাত ফকিহ ও মারজায়ে তাকলিদ আয়াতুল্লাহ মারআশি নাজাফির তত্ত্বাবধানে জামকারান মসজিদের নতুন সীমানা নির্ধারণ করা হয়। মসজিদের চারপাশের কৃষিজমি কিনে মসজিদের সীমানার অন্তর্গত করা হয়। সব মিলিয়ে ৪০ হেক্টর জমি মসজিদের নামে ওয়াক্‌ফ করা হয় যার মধ্যে সাড়ে ৫ হেক্টর বরাদ্দ দেয়া হয় মসজিদের আঙিনা বা খোলা প্রান্তরের জন্য।

মসজিদের নতুন ভবনের নাম দেয়া হয় মসজিদে মাকাম। এবারের মসজিদ তৈরি করা হয় আধুনিক সব উপকরণ ব্যবহার করে। মসজিদের মেঝে ও দেয়ালে বসানো হয় চমৎকার কারুকার্যশোভিত টাইলস। এটিতে প্রবেশের জন্য তিনটি প্রধান ফটক স্থাপন করা হয়। এসব ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমে সামনে দেখা যাবে জামকারান মসজিদের বিশাল আঙিনা। আঙিনা পেরিয়ে মসজিদের মূল প্রবেশপথের উপরে চোখে পড়বে বিশাল একটি গম্বুজ এবং দুই পাশে রয়েছে ৬০ মিটার উঁচু দু’টি মিনার।  ফিরোজা রঙের টাইলসে মোড়ানো এবং চমৎকার ক্যালিগ্রাফিতে সমৃদ্ধ গম্বুজ ও মিনার দু’টি দেখলে যে কোরো চোখ জুড়িয়ে যাবে। জামকারান মসজিদের ভেতরের বিশাল হল আট কোণবিশিষ্ট।  মসজিদের উত্তর পার্শ্বে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ এবং দক্ষিণ পার্শ্বে স্থাপন করা হয়েছে আরো দু’টি দরজা।  মসজিদের ভেতরের হল থেকে উপরের দিকে তাকালে গম্বুজের ভেতরের অংশ দেখতে পাওয়া যায় যার সৌন্দর্য বাইরের আবরণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

কোমের বিখ্যাত জামকারান মসজিদ

সমসাময়িক যুগে জামকারান মসজিদের সমৃদ্ধি ও প্রসারে যাদের অসামান্য অবদান রয়েছে তাদের মধ্যে চতুর্দশ হিজরির বিশিষ্ট মুজতাহিদ আলেমে দ্বীন আয়াতুল্লাহ মোহাম্মাদ তাকি বাফেকি অন্যতম। তাঁর আগে হাতে গোনা কয়েকজন আলেম ও মুসল্লি নামাজ আদায়ের জন্য এই মসজিদে যেতেন।  কিন্তু আয়াতুল্লাহ বাফেকি প্রতি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোমের তালেবুল এলমদের এক বিশাল দল নিয়ে দীর্ঘ ছয় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে জামকারান মসজিদে যেতেন এবং মাগরিব ও এশার নামাজের পর সারারাত ইবাদত-বন্দেগি শেষে ফজরের নামাজ পড়ে শহরে ফিরে আসতেন।  এভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই মসজিদের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্ট হয় এবং মসজিদের নাম ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।  বর্তমানে হাজার হাজার শিয়া মুসলমান প্রতি মঙ্গলবার রাতে এবং প্রতি ১৫ শাবানের আগের রাতে ইবাদত বন্দেগি করার জন্য জামকারান মসজিদে যান।

কোমের বিখ্যাত জামকারান মসজিদ

 

এই মসজিদে বর্তমানে অনেকগুলো বিভাগ রয়েছে। এগুলোর  মধ্যে গণযোগাযোগ বিভাগ, পাঠাগার, প্রকাশনা বিভাগ, দান সংগ্রহ ও বণ্টন বিভাগ অন্যতম। প্রতি বছর এই মসজিদ জিয়ারত করতে আসেন প্রায় দেড় কোটি মানুষ।

কোমের বিখ্যাত জামকারান মসজিদ

বন্ধুরা, দেখতে দেখতে আজকের আসরের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। যাওয়ার আগে বলে রাখছি, আগামী আসরে আমরা ইরানের কোম নগরীর আরেকটি বিখ্যাত মসজিদ- ইমাম হাসান আসকারি (আ.) মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। আশা করছি সে আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাবো। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ২৮

২০১৮-০৩-২৮ ১৯:২৯ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য