আমরা পরিবারের ওপর ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের ধ্বংসাত্মক প্রভাব নিয়ে খানিকটা কথা বলেছি। আজকের আসরে আমরা মানুষের নীতি-নৈতিকতা ও চরিত্রের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

আমরা সবাই জানি, ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয়েছে পাশ্চাত্যের আধুনিক সমাজ থেকে। আর এ কারণে পাশ্চাত্যের আধুনিক সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থা ও তাদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে সব কিছু সাজানো হয়েছে। মোট কথা ইন্টারনেট জগতে পাশ্চাত্যের আদর্শ ও সংস্কৃতির একচেটিয়া প্রাধান্য রয়েছে। আর এ বিষয়টিই মুসলিম পরিবার ও সমাজের জন্য নৈতিক ও সাংস্কৃতিক হুমকি সৃষ্টি করেছে। মুসলিম পরিবারের সদস্যরাও ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে এমন সব দৃশ্য ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে যেগুলো পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে নিষিদ্ধ। ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে এ ধরনের পরিবার ও সমাজে এমন সব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি থেকে শুরু করে সন্তানদের আচার-আচরণে নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইন্টারনেটের প্রভাবে।

 

ইন্টারনেটের সুবাদে যোগাযোগ সহজ হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর সুবাদে বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে আলাপচারিতাও। কিন্তু সেই আলাপচারিতা কতটুকু কাজের আর কতটুকু অকাজের তা কি কখনো আমরা ভেবে দেখেছি। শুধু তাই নয় শিশু-কিশোররা যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে বা যাদের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটাচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের পরিচয় আমরা জানি না। পরিচয় না জেনেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার কারণে নানা দুর্ঘটনা ঘটছে। অল্প বয়সীরা এমন অনেকের সঙ্গেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন যারা আসলে প্রতারক। নাম, পরিচয় ও বয়স গোপন করে অল্প বয়সী এবং অনভিজ্ঞদের প্রতারিত করাই যাদের প্রধান কাজ। সন্তানদের আচার-আচরণ ও চলাফেরার ওপর নজর রাখা এখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষকরে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা সহজেই প্রতারিত হচ্ছে।

এক গবেষনায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যেসব বিষয়ে কথাবার্তা হয় তার বেশিরভাগই যৌনতা সম্পর্কিত। উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা অনেক সময়ই বাবা-মায়ের অজান্তে রাত জেগে এ ধরনের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে যা মুসলিম সমাজে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কারণ ইসলাম ধর্মে এ ধরনের সম্পর্ককে হারাম বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ভার্চুয়াল জগতের মূল নিয়ন্ত্রকরা যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিরোধী। কারণ তারা পুঁজিবাদী এবং যৌনতাকে মুনাফা অর্জনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার বলে মনে করে। তাদের এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যৌনতাকে সব বয়সের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে নৈতিক সীমারেখা বিলিন হয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি ধর্মীয় সংস্কৃতি বিশেষকরে ইসলামি সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি। দুঃখজনকভাবে এ পরিস্থিতির কারণে তরুণরা পর্নো ছবি দেখে এবং অশ্লীল গল্প পড়ে, পূর্ণ বয়সী হয়ে ওঠার আগেই এমন একটি বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠছে যা পুরো সমাজ ব্যবস্থাকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

স্মার্ট ফোন সহজলভ্য হওয়ায় ইন্টারনেটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। অনেকেই ইন্টারনেটে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষনের পেছনে প্রধানত পাঁচটি কারণ কাজ করে। এক- যৌন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি ঝোকপ্রবণতা; দুই- ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রবল আগ্রহ; তিন- জুয়াসহ এ ধরনের নেশা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন খেলার প্রতি ঝোকপ্রবণতা; চার- নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহের মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ এবং সর্বশেষ কম্পিউটার গেইমের নেশা। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত ব্যক্তিরা সাধারণত সামাজিক তৎপরতা কমিয়ে দেয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ হ্রাস পায়। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারে বাধা পেলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

ইন্টারনেটের প্রতি নেশাগ্রস্তদের মধ্যে অনেকেই সাধারণত দিনে ছয় ঘন্টারও বেশি সময় কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল বা ট্যাবলেটের সামনে বসে সময় কাটায়, তাদের সমবয়সী বা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মেশার তেমন কোন আগ্রহ তাদের মধ্যে থাকে না। তারা মনে করে, তাদের সামনে থাকা যন্ত্রটিই তাদের বড় বন্ধু। আসলে যখন মানুষের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার সবচেয়ে উপযুক্ত বয়স ঠিক সে বয়সেই যদি তারা দিনের এতটা সময় কম্পিউটার গেইম বা যৌন বিষয়ক ওয়েবসাইট নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায় তাহলে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়া খুব কঠিন। তরুণদের মধ্যেই এ প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। আসলে তরুণরা  অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে বাস্তব জীবনে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। এ অবস্তায় এ ধরনের ছেলেমেয়েদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে।  ছেলেমেয়েদেরকে কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিলেই চলবে না, পাশাপাশি সামাজিক হয়ে ওঠার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় বাস্তব জীবনের অনেক সমস্যাই তারা আর সমাধান করতে পারবে না। ইন্টারনেট তথা ভাচুর্য়াল জগতের প্রতি অতিনির্ভরতার কারণে জীবনের প্রকৃত সাধ উপভোগ করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।#

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/২৯  

ট্যাগ

২০১৮-০৩-২৯ ১৬:২০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য