তোমরা নিশ্চয়ই পড়াশোনার গুরুত্ব সম্পর্কে ভালোই জানো। কারণ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে সর্বপ্রথম যে বাণীটি পাঠিয়েছিলেন তা হচ্ছে ‘ইক্করা’ অর্থাৎ ‘পড়’।

শুধু কি তাই? হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পরপরই মহান আল্লাহ একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। একদিকে সকল ফেরেশতা অপরদিকে হযরত আদম একা। আল্লাহ ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার বিচারক। প্রতিযোগিতায় বিষয়বস্তু ছিল ‘জ্ঞান’। আমাদের আদি পিতা আদম (আ.) ওই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন বলেই আমরা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ খেতাব পেয়েছি।

তবে 'জ্ঞানের শহর' হিসেবে পরিচিত রাসূল (সা.) জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেছেন,‘তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন কর।’

এ হাদিস থেকে আমরা জানতে পারলাম,জ্ঞানার্জনের কোনো বয়স নেই। চেষ্টা-সাধনা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে যেকোনো বয়সে জ্ঞানার্জন করা সম্ভব। 

বন্ধুরা,আজকের আসরে আমরা এ সম্পর্কেই কয়েকটি সত্য কাহিনী শোনাব। এরপর থাকবে একটি গান। আর সবশেষে থাকবে ভারতের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তাহলে প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

এক দেশে সাক্কাকী নামে এক দক্ষ কারিগর ছিলেন। তিনি খুব সুন্দর সুন্দর জিনিস বানাতেন। একবার তিনি খুব চমৎকার একটি দোয়াত তৈরি করলেন সেদেশের বাদশাহকে দেয়ার জন্য। তার আশা ছিল- বাদশাহ তার হাতের কাজ দেখে প্রশংসা করবেন এবং তাকে মূল্যবান পুরস্কার দেবেন।

দোয়াতটি নিয়ে একদিন তিনি বাদশাহ’র দরবারে গেলেন। বাদশাহ সেটি হাতে নিয়ে এর চমৎকার কারুকাজ দেখতে লাগলেন। তিনি সাক্কাকীকে কিছু বলতে যাবেন ঠিক এ সময় এক সৈন্য এসে খবর দিল যে,একজন বড় আলেম ও সাহিত্যিক এসেছেন বাদশাহর সঙ্গে দেখা করতে। এ কথা শুনে বাদশাহ দ্রুত তাকে দরবারে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই আলেমকে দরবারের হাজির করা হলো।

বাদশাহ তাকে স্বাগত জানানো ও তাঁর সঙ্গে কথাবার্তায় এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে,সাক্কাকী ও তাঁর চমৎকার দোয়াতের কথা ভুলে গেলেন। এ অবস্থায় সাক্কাকী মনে কষ্ট পেলেন এবং তার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিল। তিনি বুঝতে পারলেন যে,বাদশাহ যেভাবে আলেমকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাতে তার কাছ থেকে এ মুহূর্তে কোনো কিছু আশা করে লাভ নেই। এরপর একরাশ হতাশা নিয়ে রাজদরবার ত্যাগ করলেন সাক্কাকী।

বাড়ি ফিরে যেতে যেতে ভাবলেন, যেভাবেই হোক তিনিও ওই আলেমের মত জ্ঞানার্জন ও সাহিত্য চর্চা করবেন। তাহলে বাদশাহর দরবারে সম্মান পাওয়া যাবে।কিন্তু এ কাজটি একেবারে সহজ ছিল না। সাক্কাকী তিনি একজন বয়স্ক মানুষ। তিনি তার জীবনের বেশির ভাগ সময়ই ব্যয় করেছেন অন্য কাজে। এখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে পড়াশোনা করা কি সম্ভব?

সাক্কাকীর মনে মনে এসব প্রশ্ন আসলেও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। তিনি এক মাদ্রাসায় গিয়ে ভর্তি হলেন। প্রথম প্রথম বেশ সমস্যায় পড়লেন তিনি। কোন কিছুই ঠিকমত মনে থাকত না তার। এ সময় একটা বিব্রতকর ঘটনা ঘটল:

ঘটনাটি এ রকম- শাফেয়ী মাজহাবের এক ওস্তাদ তাকে একটি মাসআলা শেখালেন। মাসআলাটি হচ্ছে- “ওস্তাদের আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে যে,কুকুরের চামড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শুকানোর পর তা পবিত্র হয়ে যায়।”

সাক্কাকী এ বাক্যটি কমপক্ষে দশবার পড়ে মুখস্থ করলেন যাতে পরীক্ষায় প্রশ্ন করা হলে সঠিকভাবে জবাব দিতে পারেন। কিন্তু পরীক্ষার সময় যখন তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তখন তিনি বললেন,“কুকুরের আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে যে,ওস্তাদের চামড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও শুকানোর পর তা পাক হয়ে যায়।” এমন উল্টো উত্তর শুনে উপস্থিত সবাই হাসতে লাগলেন। তারা মনে মনে ভাবলেন- বৃদ্ধ লোকটার লেখাপড়া করার কোনো যোগ্যতা নেই। ওস্তাদদের হাসি-ঠাট্টা দেখে সাক্কাকী খুব লজ্জা পেলেন। তিনি তখনি মাদ্রাসা ছেড়ে চলে গেলেন এক জঙ্গলে। ঘটনাক্রমে তিনি এমন একটা পাহাড়ের কাছে গিয়ে হাজির হলেন যেখানে দেখতে পেলেন যে,একটি পাথরের ওপর ফোঁটা ফোঁটা করে ওপর থেকে পানি পড়ছে। আর এ ফোঁটা ফোঁটা পানির কারণে শক্ত পাথরটিতে একটা ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে।

সাক্কাকী বেশ কিছুক্ষণ বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন। ব্যাপারটি তার অন্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করল। তিনি বললেন,আমার মন যদিও লেখাপড়ার প্রতি তেমন আগ্রহী নয় কিন্তু সেটাতো আর পাথরের মত শক্ত নয়। তাই আমিও যদি ঠিকমত লেখাপড়া করি,কঠোর পরিশ্রম করি তাহলে আমারও পক্ষেও একদিন বড় আলেম ও সাহিত্যিক হওয়া সম্ভব।

যেই ভাবনা সেই কাজ। সাক্কাকী জঙ্গল থেকে ফিরে গেলেন মাদ্রাসায়। আবার নতুন উদ্যমে লেখাপড়া শুরু করলেন। এক সময় দেখা গেল তিনি সে সময়কার একজন নামকরা আলেম ও সাহিত্যিকে পরিণত হয়েছেন।

বন্ধুরা,জ্ঞানপাগল বুড়ো সাক্কাকীর কাহিনীতো শুনলে। এবার আমরা একটি গান শোনাবো। গানটি গেয়েছে সিলেটের বন্ধু তাসফিয়া জাহান তাহিয়া।

চমৎকার একটি গান শুনলে। আসরের এ পর্যায়ে আমরা গ্রিসের এক বিখ্যাত বক্তা ও রাজনীতিকের কথা বলব যিনি প্রথম জীবনে ঠিকমত বুঝিয়ে কথাও বলতে পারতেন না। দুমুস্তেন্স নামেও ওই ব্যক্তি ও প্রখ্যাত দার্শনিক এরিস্টোটল একই বছর জন্মগ্রহণ এবং একই বছর মৃত্যুবরণ করেন।

দুমুস্তেন্স যখন ছোট তখন তার বাবা মারা যান। মারা যাওয়ার আগে দুমুস্তেন্সের বাবার তার সম্পত্তি দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেন এক লোককে। শর্ত ছিল দুমুস্তেন্স প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সব সম্পত্তি তার হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর দুমুস্তেন্স যখন তার সম্পত্তি বুঝিয়ে চাইল তখন লোভী লোকটি তা ফেরত দিতে অস্বীকার করল।

এ নিয়ে দুমুস্তেন্স পড়লেন মহা চিন্তায়। তবে একেবারে ভেঙে না পড়ে লোভী লোকটির বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চিন্তা করলেন তিনি। একদিন তিনি তার এলাকার গণ্যমান্য লোকদের একস্থানে ডাকলেন বিষয়টি জানাতে।

যথাসময়ে লোকজন এসে হাজির হলে দুমুস্তেন্স তার কথা শুরু করল। কিন্তু ঠিকমত গুছিয়ে কথা বলতে পারল না। লোকজনও তার বক্তৃতার খুঁত ধরতে লাগল। লোকদের কাছে নিজের সমস্যার কথা তুলে ধরতে না পারলেও হতাশ হলেন না তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন যেভাবেই হোক একজন ভালো বক্তা হতে হবে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি নির্জন জায়গা বেছে নিলেন তিনি। প্রতিদিন সেখানে গিয়ে অনুশীলন শুরু করলেন। উচ্চারণের ত্রুটি দূর করার জন্য মুখের ভেতর নুড়ি রেখে অত্যন্ত উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। শ্বাসকে দীর্ঘ ও শক্তিশালী করার জন্য বড় বড় কবিতাগুলো জোরে জোরে পড়তে শুরু করলেন। অধিকাংশ সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার অনুশীলন করতেন যাতে নিজেই নিজের বাচনভঙ্গী দূর করতে পারেন।

এভাবে কঠোর অনুশীলন ও চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে তিনি অল্প দিনের মধ্যেই গ্রিসের একজন বিখ্যাত বক্তায় পরিগণিত হলেন। #

 

পার্সটুডে আশরাফুর রহমান/ মো:আবু সাঈদ/২৯

ট্যাগ

২০১৮-০৩-২৯ ১৭:০৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য