বলেছিলাম ক্যাভিয়ার মাছের চামড়া নিয়েও বিচিত্র গবেষণা হচ্ছে। ক্যাভিয়ার মাছের পাখা, পেটের ভেতরের নাড়িভুড়ি ইত্যাদি ফিশ পাউডার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। ক্যাভিয়ার জাতীয় মাছের খামারে এগুলো ব্যবহৃত হয়।

এভাবে ক্যাভিয়ার মাছ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক যোগান দেয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পণ্য হিসেবে পরিগণিত। জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন সাইটসের পক্ষ থেকে ক্যাভিয়ার মাছের বাণিজ্যের ভাগ বা কোটা ঘোষণা করা হয়। সেইসঙ্গে ক্যাভিয়ার এভং ক্যাভিয়ার মাছের মাংস এমনকি আঙুল পরিমাণ ক্যাভিয়ার মাছের পোনা রপ্তানির কোটাও প্রকাশ করা হয়।

 

ক্যাভিয়ার মাছের ব্যবসায়িক সাফল্য এবং অর্থকরী দিক বিবেচনা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন এই মাছের উৎপাদন, চাষ এবং কৃত্রিমভাবে প্রজননের ব্যবস্থা করেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, আমেরিকা, চীন, ইতালি, জাপান, উরুগুয়ে, ম্যাক্সিকোসহ আরও অনেক দেশ। তবে ইরানের চাষ করা ক্যাভিয়ার অন্যান্য দেশের চাষ করা ক্যাভিয়ারের তুলনায় অনেক উন্নতমানের। এর কারণ অনেক। যেমন ক্যাভিয়ার মাছের বেড়ে ওঠার জন্য প্রাকৃতিকভাবে যে উষ্ণতার প্রয়োজন তা রয়েছে ইরানের বিভিন্ন এলাকায়। দ্রুত বর্ধনশীল মাছের পোনার সহজলভ্যতাসহ এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুব্যবস্থা রয়েছে ইরানে। এর বাইরেও ক্যাভিয়ার মাছের উৎপাদন খরচও তুলনামূলকভাবে কম। এই মাছ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পুকুর তৈরির খরচও কম। সর্বোপরি ক্যাভিয়ার মাছ চাষের খামারে যারা কাজ করে সেইসব শ্রমিকদের পারিশ্রমিকও তুলনামূলকভাবে কম।    

বিশ্বে এখন চাষকৃত ক্যাভিয়ার এবং ক্যাভিয়ার মাছ ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে। এর বাইরেও প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ক্যাভিয়ারও প্রচুর শিকার হচ্ছে। এতো প্রাচুর্য সত্ত্বেও বিশ্ব বাজারে এই ক্যাভিয়ার বাণিজ্যে কোনো ভাটা পড়ে নি মানে এই ক্যাভিয়ারের গুরুত্ব এতোটুকুও কমে নি। মৎস্য ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী কাস্পিয়ান সাগরের ইরান অংশটুকুর গভীরতা বেশি হওয়ায় এখানকার ডিমগুলোর গুণগত মান কাস্পিয়ানের উত্তরাংশের ক্যাভিয়ারের ডিমগুলোর তুলনায় অনেক ভালো।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ক্যাভিয়ার চোরাচালান ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। বিশেষ করে কাস্পিয়ানের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলো যেমন রাশিয়া, কাজাখস্তান,আজারবাইজান এবং তুর্কমেনিস্তানে আঁশবিহীন এই ক্যাভিয়ার শিকার বেড়ে যায়। এর ফলে কাস্পিয়ানে ক্যাভিয়ারের পরিমাণ কমে যায়। এ ছাড়া কারখানার বর্জ্য,কৃষিকাজের বিচিত্র বিষাক্ত পদার্থ,ড্রেনের ময়লা পানি ইত্যাদি এসে এই সমুদ্রে পড়ার কারণে কাস্পিয়ানের প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ে। ক্যাভিয়ার মাছের ডিম পাড়ার জায়গাগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া,কাস্পিয়ান সাগরের পার্শ্ববর্তী নদীগুলোর উপর বাঁধ বা ব্রিজ তৈরি করা,তেল ক্ষেত্রের উন্নয়ন ইত্যাদি কারণে এই কাস্পিয়ানে ক্যাভিয়ার মাছ এখন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

ক্যাভিয়ার মাছের বিলুপ্তির আশঙ্কা নিয়ে কথা বলছিলাম। এই আশঙ্কা থেকে মুক্তির উপায় দেখিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, ডিম থেকে পোনা ফুটানো এবং প্রজনন থেকে প্রতিপালনের মাধ্যমে ক্যাভিয়ার মাছের মাংস উৎপাদনসহ ক্যাভিয়ার উৎপাদন পর্যন্ত সকল কার্যক্রম মৎস্য খামারে বৈজ্ঞানিকভাবে করতে হবে। ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় শহর রাশতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম ইরানিয়ান ফিশারিজ সায়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে ক্যাভিয়ারসহ অন্যান্য মৎস্য সম্পদ রক্ষার উপায় নিয়ে গবেষণা করার লক্ষ্যে।

 

১৯৯৫ সালে গড়ে উঠেছে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। ক্যাভিয়ার নিয়ে কাস্পিয়ান তীরবর্তী দেশগুলো তো বটেই বিশ্বের মধ্যেই গবেষণা করার প্রথম প্রতিষ্ঠান এটি। এই প্রতিষ্ঠানটি সবসময় চেষ্টা করেছে বিশ্বের মধ্যে আঁশবিহীন মাছ নিয়ে গবেষণার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গবেষকদের গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে। গবেষণামূলক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা, তথ্য আদান প্রদান করা ইত্যাদির মাধ্যমে ক্যাভিয়ার মাছ সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে বহু বিভাগ। সকল বিভাগই নিজ নিজ কার্যক্রম নিয়ে সক্রিয় রয়েছে।

এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ফলে পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। ক্যাভিয়ার মাছ শিকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। প্রজননের ব্যবস্থা করে পোনা ফুটিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ক্যাভিয়ার মাছের পোনা কাস্পিয়ান সাগরে ছেড়ে দিয়ে এই মাছের বংশ বিস্তারের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। এই সাগর এখন ক্যাভিয়ার মাছের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/৬

ট্যাগ

২০১৮-০৪-০৬ ১৭:৩৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য