মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী মসজিদকে ভালোবাসে এবং মসজিদে প্রবেশ করলে তার আত্মা প্রশান্তি অনুভব করে। ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেমগণ তাদের বক্তব্যে মসজিদকে মুমিন ব্যক্তিদের আশ্রয়স্থল বলে উল্লেখ করেছেন।

এটি এমন এক স্থান যেখানে গেলে মানুষ পার্থিব জীবনের সব ব্যস্ততা এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভুলে এক ঐশী প্রশান্তি অনুভব করে। আজকের আসরে আমরা মানুষের রোগমুক্তিতে মসজিদের অবদান নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি ইরানের ধর্মীয় নগরী কোমের ইমাম হাসান আসকারি (আ.) মসজিদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব।

 কোমের বিখ্যাত হাসান আসকারি (আ.) মসজিদ

 

বিগত আসরগুলোতে আমরা বলেছি, মসজিদ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য জামায়াতে নামাজ আদায়সহ অন্যান্য ধর্মী বিধিবিধান পালন করা। সিজদা থেকে মসজিদ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এখানে মুমিন বান্দারা আল্লাহ তায়ালার সামনে সিজদায় অবনত হন বলে এর নাম রাখা হয়েছে মসজিদ। সিজদা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার দাসত্বের সর্বোচ্চ নিদর্শন। মানুষ আল্লাহর প্রতি নিজেদের দাসত্বের চরম সীমা প্রকাশের জন্য তাঁর সামনে নিজের শরীরের সবচেয়ে দামী অংশ অর্থাৎ মস্তককে লুটিয়ে দেয়। সে ঘোষণা করে, হে আল্লাহ! আমার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে আমি তোমার মহানুভবতার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। নামাজ মুমিন ব্যক্তির আত্মার খোরাক যোগায়।

 কোমের বিখ্যাত হাসান আসকারি (আ.) মসজিদ

 

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, দুনিয়ার ব্যস্ত জীবনে মানুষ অনেক সময় আত্মিক দিক দিয়ে চরম মর্মপীড়ায় ভোগে; ফলে তার আত্মা স্বস্তি ও প্রশান্তিদায়ক কোনো স্থানে গিয়ে শান্তি পেতে চায়।  তার এই মর্মমেদনা উপশমের অন্যতম প্রধান উপায় হচ্ছে মহান সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। নামাজে এই সম্পর্ক স্থাপিত হলে এবং আল্লাহর কাছে নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলো পূর্ণ হলে মহান এই সত্ত্বার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়। আর এ কারণেই মানুষ মসজিদকে ভালোবাসে এবং আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করলে প্রশান্তি অনুভব করে।

 

ইমাম জাফর সাদেক (আ.) মুসলমানদের উদ্দেশ করে বলেছেন, “পৃথিবীতে চলার পথে যখনও দুঃখ-দুর্দশা ও সমস্যায় পড়বে তখনই নামাজ ও মসজিদের কাছে আশ্রয় নেবে।”

ইসলামের প্রাথমিক যুগে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে আহত যোদ্ধাদের জন্য স্বাভাবিক চিকিৎসার সব আয়োজন রাখা হতো। সেইসঙ্গে মানসিক আঘাত সারিয়ে তোলার জন্য তাদেরকে মসজিদে নিয়ে যাওয়া হতো। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) নিজে মসজিদকে মুসলিম যোদ্ধাদের চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন।

বর্তমান সময়ে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য মসজিদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি বলে মনে হয়। মানুষ আজ নানা ধরনের সামাজিক উত্তেজনা, রাজনৈতিক সংকট, যান্ত্রিক জীবনের অস্বস্তি’র মধ্যে ডুবে থাকে।  দৈনন্দিন কর্মব্যস্ত জীবনে এখন আর মানসিক প্রশান্তি লাভের কোনো স্থান নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় পরোক্ষভাবে হলেও মসজিদই হতে পারে মানুষের রোগমুক্তির অত্যন্ত কার্যকর স্থান।

ফ্রান্সের বিখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. অ্যালেক্সিস কার্ল তার ‘প্রেয়ার’ গ্রন্থে  মানুষের রোগমুক্তির ক্ষেত্রে ইবাদত-বন্দেগির ভূমিকা উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন: “অতীতকাল থেকেই বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা হিসেবে প্রেয়ার বা ইবাদতের ভূমিকা মানুষের কাছে একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।  ইতিহাসে মহান স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে রোগমুক্তির ভুরি ভুরি উদাহরণ পাওয়া যায়।” কাজেই আমরা আমাদের নানা সমস্যা সমাধান ও রোগমুক্তির জন্য এমন স্থানের সন্ধান করতে পারি যেখানে মহান আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। সে স্থান হিসেবে ধরার বুকে আল্লাহর ঘর অর্থাৎ মসজিদের মতো আর কোন জায়গা হতে পারে না।

 

 

বন্ধুরা, শুরুতে যেমনটি বলেছিলাম, আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরানের কোম নগরীর অন্যতম প্রাচীন মসজিদ- ইমাম হাসান আসকারি মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব।  কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হিজরি তৃতীয় শতকে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র পবিত্র বংশধর ইমাম হাসান আসকারির নির্দেশে এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। ইমাম হাসান আসকারি (আ.) কোমে হযরত মাসুমা সালামুল্লাহি আলাইহার মাজারের কাছে এই মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুসারী ‘আহমাদ বিন ইসহাক আশআরি’ মসজিদটি নির্মাণ করেন। আশআরি ইমামের কাছ থেকে মসজিদ নির্মাণের সব খরচ গ্রহণে করে ইরানে আসেন এবং কোম নদীর তীরে হযরত মাসুমার মাজারের কাছে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মসজিদের পবিত্রতা নিয়ে ইতিহাসে অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা মাজলেসি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত তাসকিরাতুল আয়েম্মে গ্রন্থে লিখেছেন: “৩২ হিজরিতে তৃতীয় খলিফা ওসমানের শাসনামলে মুসলিম বাহিনী কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে ইরান চলে এসেছিল। এই বাহিনীতে ছিলেন আল্লাহর রাসূলের দুই প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.)। তারা দুই ভাই কোমে পৌঁছে বর্তমানে যেখানে ইমাম হাসান আসকারি মসজিদ রয়েছে সেখানে নামাজ আদায় করেছিলেন। ”

সপ্তদশ শতাব্দির ফরাসি পর্যটক জন তবারনিয়া’র সফরনামায় লেখা হয়েছে: “কোম নগরীতে যে বিষয়টি আমার দৃষ্টি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে তা হলো এখানকার একটি বিশাল মসজিদ। ইরানিরা এই মসজিদকে অত্যন্ত সম্মান জানায়।” এরপর তিনি এই মসজিদের নির্মাণশৈলি এবং এখানে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে লেখেন: এই মসজিদের প্রধান ফটকের মুখে রয়েছে একটি বিশাল ময়দান যেখানে রয়েছে একটি অতিথিশালা এবং বহু দোকানপাট।  মসজিদের একপ্রান্তের দেয়াল কোম নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত যেখানে দাঁড়িয়ে নদীর মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। মূল প্রবেশপথ দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলে হাতের ডানে চোখে পড়বে ছোট ছোট অনেকগুলো কক্ষ। মসজিদের দানের অর্থে প্রস্তুত করা খাবার খাওয়ার জন্য প্রতিদিন অসহায় মানুষেরা এখানে ভিড় করে এবং এসব কক্ষে বসে খাবার খেয়ে চলে যায়।

 

 কোমের বিখ্যাত হাসান আসকারি (আ.) মসজিদ

অবশ্য ১১ শতাব্দি আগে আহমাদ বিন ইসহাক যে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন তা বর্তমানের মসজিদটির চেয়ে অনেক ছোট ছিল। পরবর্তীতে বহুবার এই মসজিদ মেরামত ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। ইমাম হাসান আসকারি মসজিদটি ১৯৭৬ সালে ইরানের জাতীয় পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমান মসজিদের সবচেয়ে পুরনো অংশ হচ্ছে এটির দক্ষিণ দিকের ছাদযুক্ত বারান্দা। এটি নির্মাণ করা হয় ১৭১৬ খ্রিস্টাব্দে।  ১৪ মিটার উঁচু এই বারান্দাটি ইরানে সাফাভি রাজবংশের শাসনামলের শেষদিকে শাহ সুলায়মান সাফাভির মা ‘মাহদে আলিয়া’র উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল। এখানকার টাইলসের উপর সুন্দর হস্তাক্ষরের ক্যালিগ্রাফি আজও দর্শণার্থীদের আকৃষ্ট করে।

সাফাভি শাসনামল শেষে কাজার রাজবংশের শাসনামলে একবার প্রবল বন্যায় ইমাম হাসান আসকারি মসজিদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় ফতেহআলী শাহ কাজারের উদ্যোগে মসজিদটি পুনর্নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে নাসিরউদ্দিন শাহ মসজিদের আয়তন আরো অনেক বড় করেন।  বিংশ শতাব্দিতে মরহুম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ রেজা গোলপায়গানি এই মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেন। তিনি মসজিদের চারপাশের আরো কিছু জায়গা কিনে মসজিদের আয়তন আরো বাড়িয়ে দেন।  তাঁর মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ লুৎফুল্লাহ সাফি গোলপায়গানি এই মসজিদকে সর্বশেষবারের মতো মেরামত ও সংস্কারের কাজ করেন যা ২০১৫ সালে মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ৭

২০১৮-০৪-০৬ ২০:২৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য