আমরা গত আসরে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি টেনে আসরের সমাপ্তি টেনেছিলাম। যেখানে ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, মানসিক প্রশান্তির জন্য, জীবনকে প্রফুল্লতা ও আনন্দে ভরে তোলার জন্য, সর্বপ্রকার বিষণ্ণতা ও মানসিক চাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য পবিত্র এই গ্রন্থ যত বেশি সম্ভব পাঠ করা উচিত।

একটি আনন্দঘন সুখি পরিবারের জন্য ধর্মীয় শিক্ষায় বলা হয়েছে স্বামী স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকে তাদের পারিবারিক সম্পর্কে ঈমান, হাসি, সহানুভূতিপূর্ণ ও উদার দৃষ্টি পোষণ করা উচিত। স্বামী স্ত্রী যদি এই বৈশিষ্ট্যগুলো লালন করে তাহলে তাদের সন্তানদের ওপর সেই ইতিবাচকতার সুফল ও প্রভাব পড়বে। নিশ্চয়ই আপনারা এমন কিছু লোককে দেখে থাকবেন যারা এই সদগুণাবলির বিপরীত চরিত্রের অধিকারী। পৃথিবীর সর্বত্রই এরকম লোকের বসবাস রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো এই শ্রেণীর লোকেরা এমন পরিবারে বেড়ে উঠেছেন যারা জীবনের আনন্দ ও সুখের ছোঁয়া কোনোদিন পায় নি। পরিবারের কর্তা পরিবারে হাসি আনন্দ সৃষ্টির ব্যাপারে নৈপুণ্য দেখাতে পারেন নি কিংবা পরিবারের কর্ত্রীও সেরকম কোনো ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে পারেন নি যার ফলে সুখ ও আনন্দের পায়রারা সেখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যেসব শিশু একটি হাসি আনন্দময় সংসারে বেড়ে ওঠে তারা সকল বিচারেই সফলতা অর্জন করে।

 

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সুখি মানুষ সুপরিকল্পিত জীবনযাপন করে এবং সর্বাবস্থায় নিজস্ব লক্ষ্যে কেন্দ্রীভূত থাকে। সুখি মানুষের কাছে সময় এবং জীবনের মূল্য রয়েছে। তারা সময়ের মূল্য বোঝে বলেই জীবনের সকল সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উপকৃত ও সমৃদ্ধ হতে চেষ্টা করে। তারা সবসময় হাসিখুশি থাকে এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারে সবসময় আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকে তাদের এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারে বিশ্বাসী তারা। সুখি মানুষেরা কর্মতৎপর থাকেন এবং জীবনকে সুন্দর করে সাজাতে তারা অবহেলা করেন না। সর্বোপরি তারা আল্লাহর অনুগ্রহ সমূহের জন্য শুকরিয়া আদায় করেন। এদের চেহারা সবসময় থাকে হাস্যোজ্জ্বল ও প্রফুল্ল। এই সহাস্য অবস্থা যে কেবল নিজের ভেতরেই প্রফুল্লতা সৃষ্টি করে তা নয় বরং অন্যদের ওপরও তার ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মনোবিজ্ঞানে হাসিকে এক ধরনের চিকিৎসা মাধ্যম বা ট্রিটমেন্ট বলে মনে করা হয়।                     

 

একটি পরিবারে মা-ই হলেন সবচেয়ে সক্রিয় সদস্য। পরিবারের অপরাপর সদস্যের বেড়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাঁর। সমাজে সফল পরিবার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পেছনেও মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। এমনকি পরিবারে হাসি-আনন্দ, সুখ-শান্তির আবহ তৈরির পেছনেও প্রধান ভূমিকা মায়েরই থাকে। পরিবারের সকল সদস্যের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। সুতরাং মায়ের আচরণ ও অনুভূতি পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। একজন মা পারেন তার সন্তানদের জন্য উপযুক্ত একটি পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে প্রশান্তিময় ও নিরাপদ একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে। এই মহতী পরিবেশ সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে মা তাঁর সন্তানদেরকে বিচিত্র সামাজিক সংকট ও অবক্ষয়মূলক পরিস্থিতিতে নিমজ্জিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন।

হাসিখুশি ও প্রফুল্ল রমণীরা জানেন কী করে অপরকে ভালোবাসতে হয়। সদানন্দ এই নারীদের সমগ্র জীবনজুড়ে ওই ভালোবাসার অকৃত্রিম সুষমা পরিলক্ষিত হয়। এ কারণেই স্বামী-সন্তানেরা তার কাছে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি বোধ করে সবসময়।

 

অবশ্য পরিবারের উচিত নিজেদের সন্তান সন্ততিদের নিয়ে মাঝে মাঝে একটু আনন্দ বিনোদনে সময় দেওয়া। মানুষ প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখে, রঙ-বেরঙের ফুল দেখে, ফুটন্ত ফুলের হাসি দেখে, সবুজ বৃক্ষরাজি দেখে, নিরন্তর বহমান ঝরনাধারা দেখে, পাহাড়-পর্বতসহ আরও বিচিত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে আবেগে আনন্দে আপ্লুত হয়ে যায়। অ্যারিস্টটল এ সম্পর্কে বলেছেন: "আনন্দ হলো সর্বোত্তম জিনিস এবং এই আনন্দের গুরুত্ব এতো বেশি যে মানুষের অন্যান্য লক্ষ্যগুলো তার মাধ্যমে অর্জিত হয়"।

কাছের মানুষদের সঙ্গে সুন্দর ও ভালো আচার আচরণ করা অপর একটি ইতিবাচক দিক যার ফলে পারিবারিক সুখ-শান্তি ও আনন্দের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সেকাতুল ইসলাম কুলাইনির উসূলে কাফি নামক গ্রন্থে রাসূলে আকরাম (সা) এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে: আচ্ছা তোমাকে কি অনেকটাই আমার মতো একজন মানুষের কথা বলবো? জবাবে বলা হলো: জি রাসুলে খোদা! রাসূল (সা) বললেন:"যে সদাচারী, উত্তম চরিত্রবান, নম্র, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারকারী, দ্বীনী ভাইদের সঙ্গে আন্তরিক বন্ধুসুলভ, সত্যের ওপর ধৈর্যশীল,উত্তেজনা প্রশমনকারী এবং সুখে-দুখে-রাগের মধ্যেও ভারসাম্যপূর্ণ।"

সদাচার হলো আলোকরশ্মির মতো। ওই আলোকরশ্মি ব্যক্তির নিজের পাশাপাশি সঙ্গী-সাথীসহ আশেপাশের ওপরও আলো ছড়ায়। প্রকৃতপক্ষে সুন্দর ও কল্যাণময় আচরণ কেবল যে ব্যক্তির নিজেকেই আনন্দময় করে তোলে তা নয় বরং পরিবারের অপরাপর সদস্যকেও সেই আনন্দ উপহার দেয়। কিন্তু সুন্দর আচরণ কী জিনিস? জাফর সাদেক (আ) "গোরারুল হেকাম" নামক গ্রন্থে এই প্রশ্নের জবাবে লিখেছেন: সদয় ও নম্র হও, কথাবার্তায় শালীন হও এবং তোমার ভাইদের সঙ্গে প্রফুল্ল থাকো"।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/ ৮

২০১৮-০৪-০৮ ২০:০২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য