গত আসরে বলেছি ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ঝোকপ্রবণতার কারণে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব জোরালো হচ্ছে। এক গবেষনায় দেখা গেছে,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে উঠতি-বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যেসব বিষয়ে কথাবার্তা হয় তার বেশিরভাগই যৌনতা সম্পর্কিত।

উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা অনেক সময়ই বাবা-মায়ের অজান্তে রাত জেগে এ ধরনের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে যা মুসলিম সমাজে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আজকের আসরে আমরা সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় গঠনের ওপর ইন্টারনেটের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অনেকেরই সঠিক ধারণা নেই। অনেকেই মনে করেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরি, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তথ্য চুরি, প্রতারণা এবং তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার মতো দৈনন্দিন কিছু বিষয়ের মধ্যেই এর প্রভাব সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইন্টারনেট যে একটি সমাজ, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তির আত্মপরিচয়কে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে তা অনেকেই এখনও উপলব্ধি করতে পারেন না। কাজেই তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন এমন এক জগতে প্রবেশ করছে, যে জগত সম্পর্কে অনেক অভিভাবকেরই তেমন কোনো ধারণা নেই। নতুন এ জগতকে অনেকেই 'সেকেন্ড লাইফ' বা 'দ্বিতীয় জীবন' হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। এই দ্বিতীয় জীবনে প্রবেশের পর অনেকেই অবচেতনভাবেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিকার হন। নিজেদের মধ্যে আত্মপরিচয় সংকটের সৃষ্টি হয়।

আমরা এর আগেও বলেছি ভার্চুয়াল জগতের ওপর অতিনির্ভরতা, পরিবার-কেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিবারের সদস্যদের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বন্ধুদেরকে বেশি আপন মনে হচ্ছে অনেকের কাছে। তাদের কথায় জীবন গড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে তরুণ প্রজন্ম। টিনএজার বা কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই ইন্টারনেটের প্রতি ঝোকপ্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টিনএজ থেকেই ছেলে-মেয়েদের মধ্যে আইডেনটিটি বা আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে। আর এই আত্মপরিচয় গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে পরিবার। একটি ছেলে বা মেয়ে যখন নতুন পরিস্থিতি বা প্রশ্নের সম্মুখীন হয় তখন তার পারিবারিক শিক্ষাটিই প্রথম কাজে লাগে। অনস্বীকার্য বাস্তবতা হলো, পরিবারের সদস্যরা বিশেষকরে বাবা-মা ও ভাই-বোনের শিক্ষা হয় অকৃত্রিম।

পরিবারের সদস্যরা যা শিক্ষা দেয় তা তার কল্যাণের জন্য। বাবা-মা কখনোই সন্তানের ক্ষতি চান না। কিন্তু যখনই কেউ এই শেকড় ছেড়ে অন্য কোনো ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে চায় তখন এই বড় নেয়ামতটি থেকে বঞ্চিত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েই  অনেক সময় ধর্মের প্রয়োজনীয়তা ইস্যুতে দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায় এবং অসহায়বোধ করে। পরিবার থেকে শুধু এটুকুই জানতে পারে যে, তারা মুসলমান। কেন সে মুসলমান, কেনইবা এ ধর্ম অনুসরণ জরুরি- এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়াটা স্বাভাবিক। পরিবার থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়ার আগেই ধর্মবিরোধী চক্রের কবলে পড়লে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়।

ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতে শিশু-কিশোরদের নিয়ন্ত্রণহীন প্রবেশ এ আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। শিশু-কিশোররা সাধারণত ধর্মবিরোধী প্রচারণা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মোকাবেলা করতে পারে না। পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় পাল্টা যুক্তি  ও অবস্থান  তুলে ধরতেও তারা ব্যর্থ হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। কখনো কখনো তাদের কাছে নাস্তিকদের বক্তব্যকে বেশি যৌক্তিক বলে মনে হয় এবং তারা নাস্তিকদের দলে ভিড়ে যায়। এছাড়া অনেকের ধর্মীয় বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে সন্তানের সবচেয়ে মারাত্মক সর্বনাশ ঘটে যায় বাবা-মায়ের অজান্তে।

একজন শিশু বা কিশোর তথ্য ও জ্ঞানের দিক থেকে পিছিয়ে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এ ঘাটতি পূরণ করতে হবে বাবা-মা ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে। এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে একদিকে যেমন পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিশু-কিশোরদেরকে যুগোপযোগী ধর্মশিক্ষা দিতে হবে ঠিক তেমনি তাদেরকে কলুষিত পরিবেশ ও জগত থেকে দূরে রাখতে হবে।  একইসঙ্গে বাবামা-কে সন্তানের সাথে অনেক বেশি ভালো বন্ধু হতে হবে। বন্ধুত্বটা এমন হতে হবে যে,সন্তানেরা যাতে বাবা-মাকে সর্বোত্তম বন্ধু বলে মনে করে। শিশু-কিশোররা সাধারণত খুবই অনুসন্ধিৎসু হয়। এই অনুসন্ধিৎসু মন যাতে নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মহাবিপদে পড়ে না যায়, সেদিকে অভিভাবকদেরকেই খেয়াল রাখতে হবে।

শিশু-কিশোরদেরকে বোঝাতে হবে আমাদের একটা পরিচিতি রয়েছে। আমরা ধর্মের অনুসারী। তবে তাদেরকে জটিল প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না। তাদের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। তবে যার যার বয়স ও মন-মানসিকতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার ভিত্তিতে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বাস্তবতা হলো, শিশু-কিশোররা ওই বয়সে হয়তো সব কিছু উপলব্ধি করতে পারবে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে তাদেরকে ধর্মের খুঁটিনাটি বিষয় বুঝাতে হবে। প্রথম শ্রেণীর একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে যদি পঞ্চম শ্রেণীর গণিতের শিক্ষা দেয়া হয় তাহলে তা কখনোই সে বুঝতে পারবে না। পঞ্চম শ্রেণীর গণিত বুঝতে হলে তাকে আগের ক্লাসগুলো পার করে আসতে হবে। এসব দিক বিবেচনায় সচেতনতার সঙ্গে শিশুদেরকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। মানসিক পরিপক্কতা অর্জনের আগ পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। #

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/৯  

ট্যাগ

২০১৮-০৪-০৯ ২০:৪৬ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য