বিশিষ্ট ইরানি কবি আবুল হাসান আবু ইসহাক কিসায়ি মার্ভাজি’র পরিচিতি সংক্রান্ত আলোচনা শুরু করেছিলাম। তার পরিচিতি তুলে ধরার সুবিধার্থে ইরানের প্রাচীন শহর মার্ভের অতীত ইতিহাসের গৌরবময় ও বিয়োগান্তক কিছু দিকের কথা শুনেছি আমরা।

আজ আমরা এই ইরানি কবির পরিচিতি ও জীবন সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য তুলে ধরব এবং সময় থাকলে আরও একজন ইরানি মনীষীর পরিচিতি তুলে ধরব।

 

গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি যে, সামানীয় রাজবংশের গুণ-কীর্তনই ছিল প্রাচীন ইরানি কবি কিসায়ি মার্ভাজি’র কাজ। কিন্তু সামানিয়দের পতনের পর কিসায়ি মার্ভাজির বিশ্বাস ও চিন্তাধারাও বদলে যায় এবং সেইসব গুণকীর্তনের জন্য তিনি অনুতপ্ত হন।

 

এরপর থেকে কিসায়ি মার্ভাজি ধর্মীয় সংযম সাধনায় মশগুল হন। এ সময় ধর্মীয় উপদেশ প্রচার এবং মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রশংসা ছাড়া তিনি অন্য কোনো ধরনের সাহিত্য-চর্চা করতেন না।

 

কিসায়ি মার্ভাজি’র কাব্য-সংকলন ষষ্ঠ হিজরি তথা খ্রিষ্টিয় দ্বাদশ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর দৃশ্যত ওই সংকলনের সব কপি ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কেবল তার কিছু কবিতার পঙক্তি টিকে আছে।

 

যেসব ঐতিহাসিক কিসায়ি’র কাব্য-সংকলনটি দেখেছিলেন তারা লিখেছেন, কিসায়ির সমস্ত কবিতাই ছিল বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রশংসা বা গুণ সম্পর্কিত। আওফি তার ‘লুবাবুল আলবাব’ বইয়েও লিখেছেন যে, কিসায়ির বেশিরভাগ কবিতা উপদেশ ও আহলে বাইতের  গুণাবলী সম্পর্কিত।

 

যাই হোক, কিসায়ির যেসব কবিতা টিকে আছে সেসবের ওপর নজর বুলালেই বোঝা যায় যে তিনি ছিলেন তার যুগের অন্যতম সেরা কবি। কবিতার বিষয়বস্তু নির্বাচনে অভিনবত্ব, অর্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতা এবং সাদৃশ্য বা মিল ও উপমা সৃষ্টিতে তার অসাধারণ দক্ষতা তার নামকে ফার্সি সাহিত্যের একজন বড় কবি হিসেবে অমর করে রেখেছে। 

 

সাহিত্য বিষয়ক গবেষক, সমালোচক ও বিশ্লেষকদের মতে কবিতায় প্রকৃতির ছবি আঁকার ক্ষেত্রে কিসায়ি মার্ভাজি ছিলেন একজন নিপুণ শিল্পী। এ ছাড়াও বর্ণনার ক্ষেত্রে সুস্পষ্টতা ও প্রাণবন্ততা এবং তুলনা বা সাদৃশ্যের শিল্পে তার সরল, কোমল ও মনোহর সৃষ্টিগুলো এই কবিকে দিয়েছে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার সুখ্যাতি। কিসায়ি মার্ভাজি ভোর, নার্গিস ফুল, বৃষ্টির ফোটা, নীলপদ্ম ও আরও বহু উপাদানকে ফার্সি কবিতায় এমন শৈল্পিক সৌন্দর্যের আভরণ দিয়েছেন যে ফার্সি কবিতায় এমন নান্দনিক সৌন্দর্য খুব কমই দেখা যায়। 

 

আধুনিক যুগের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদিউজ্জামান ফুরুজানফার কিসায়ি মার্ভাজি’র কবিতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, কিসায়ি মার্ভাজি ইরানের একজন মস্ত বড় কবি। তার অতি অল্প যেসব কবিতা টিকে আছে সেসবই এই কবির চিন্তার ব্যাপক প্রশস্ততা, লাগসই কল্পনা, সুরম্য অলংকারিকতা ও বর্ণনা-ভঙ্গীকে তুলে ধরে। আর এইসব বিষয়ে, বিশেষ করে কবিতায় লাগসই তুলনা ও কোমলতার ক্ষেত্রে খুব কম কবিকেই তার সমকক্ষ বলা যেতে পারে। বিখ্যাত দার্শনিক ও কবি নাসের খসরু নানা ক্ষেত্রে কিসায়ি মার্ভাজি’র নাম নিয়েছেন এবং ছন্দের বিষয়ে তার কিছু সমালোচনাও করেছেন। 

 

ফার্সি সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক ডক্টর শাফিয়ি কাদকানি কবিতায় চিত্রময়তা ব্যবহারের বিষয়ে তার লেখা একটি বইয়ে কিসায়ি মার্ভাজি সম্পর্কে লিখেছেন, প্রকৃতির বিষয়ে নানা ধরনের কল্পিত চিত্র বা চিত্র-কল্প তুলে ধরার ক্ষেত্রে কিসায়ির কবিতা হিজরি চতুর্থ শতকের শ্রেষ্ঠ ফার্সি কবিতা। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে এই কবির কাব্য সংকলন হারিয়ে গেছে এবং কেবল তার ক’টি ছড়ানো-ছিটানো কবিতা টিকে রয়েছে। আর এই কয়েকটি কবিতাই হিজরি  চতুর্থ শতকের কবিতার উচ্চতর বৈশিষ্ট্যগুলোকে করেছে পুরোপুরি স্পষ্ট।

 

কিসায়ি মার্ভাজি কবিতায় গুণ-কীর্তন আর প্রশংসার শিল্প ছাড়াও উপদেশ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী প্রচারের শিল্পেও ছিলেন এক সুদক্ষ কুশলী। হিজরি  চতুর্থ শতক তথা খ্রিস্টিয় দশম শতকে এই দুই শিল্পকে পরিপূর্ণতা দান করেছিলেন তিনি। আর তার এই শৈল্পিক-ধারার পটভূমিতেই গড়ে উঠেছেন নাসের খসরুর মত বড় কবি।

 

ইরানি কবি কিসায়ি মার্ভাজি’র কবিতাগুলোর ধর্মীয় দিকের গুরুত্বের কথা বাদ দিলেও কাব্যিক ও শৈল্পিক দিক থেকেও সেগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এইসব কবিতা তৎকালীন ইরান ও তারও আগের ইরানি সমাজের নানা ইতিহাস তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবেও খুবই গুরুত্বের দাবি রাখে। সেই সুদূর অতীতে খোরাসানে যেসব মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়েছিল তার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে কিসায়ি মার্ভাজি’র কবিতার গুরুত্ব অপরিসীম। তার কবিতাগুলোতে উঠে এসেছে সমসাময়িক যুগের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাসহ সেই সময়কার আরও অনেক বিষয়। তাই কিসায়ি মার্ভাজি’র এসব কবিতা নিয়ে ব্যাপক ও জোরালো গবেষণার অবকাশ রয়েছে।

 

ভাইবোনেরা, এবারে আমরা আলোচনা শুরু করব প্রাচীন ইরানের আরও এক বড় কবির প্রাথমিক পরিচিতি সম্পর্কে। এই কবির নাম আবুল হাসান আলী ইবনে জুলুগ্ব ফাররুখি সিস্তানি। খ্রিষ্টিয় দশম ও একাদশ শতকের এই কবি ছিলেন সুলতান মাহমুদ গজনভির রাজ-দরবারের অন্যতম কবি। ব্যক্তি বিশেষের প্রশংসাসূচক কবিতা লেখার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তার শৈশব ও যৌবন সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি এবং এমনকি তার জন্ম-তারিখও স্পষ্ট নয়। ফাররুখি সিস্তানি সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব এই ধারাবাহিকেরই আগামী পর্বে। আশা করছি তখনও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১১

২০১৮-০৪-১১ ১৯:০০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য