আজকের আসরে আমরা ইরানের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো। এই পণ্যটির নাম গালিচা বা কার্পেট। ইরানি গালিচার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। আগে ছিল হাতে বোণা কার্পেট।

এখন হাতে বোণার কার্পেটের পাশাপাশি মেশিনে তৈরি কার্পেটও ব্যাপকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। ইরানি কার্পেট কেবল একটি পণ্যই নয় এটি একটি শিল্প, সৃজনশীল শিল্প। ইরানি জাতীয় সংস্কৃতির সমষ্টিগত একটি অভিব্যক্তি ও প্রতীক এই কার্পেট। ইতিহাসের দীর্ঘ কাল পরিক্রমায় এই শিল্পটি ইরানের ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রেখেছে। আজকের আসরে আমরা ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটির সঙ্গে খানিকটা পরিচিত হবার চেষ্টা করবো। 

 

ইরানি কার্পেট

 

"ইরানের হাতে বোণা কার্পেটের বিশ্বকোষ"-এটি একটি গবেষণালব্ধ গ্রন্থ। লিখেছেন বিখ্যাত গবেষক ও লেখক ডক্টর হোসাইন তাজাদ্দোদ। এই বইটির ভূমিকায় লেখক লিখেছেন: সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্ববাসী ইরানকে চেনে দুটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের কারণে। একটি কবিতা আরেকটি কার্পেট। অন্যভাবে বলা যায় ইরানিদের সৌন্দর্যজ্ঞান ও রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায় কবিতার মধ্যে। আর বস্তুগত দিক থেকে বিচার করলে সেই অভিরুচির পরিচয় ফুটে ওঠে কার্পেটের রং, রূপ ও ডিজাইনের মধ্যে। সর্বোপরি যে বিষয়টি এই দুই শিল্পের ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য সত্য তা হলো কার্পেট এবং কবিতার মধ্যে একটি মানে কবিতা হলো একান্তই ব্যক্তিগত প্রতিভার বিষয় আর কার্পেট হলো সমষ্টিগত মেধা ও প্রতিভার বিষয়।

 

কার্পেট বুণনে ইরানি নারীরা

 

ফার্সি ভাষায় কার্পেটকে বলে ফার্শ্। যা কিছুই বিছানো হয় যেমন মাদুর, গালিচা এ জাতীয় সবকিছুই ফার্শ্। তবে যখন কার্পেট অর্থ বোঝানোর চেষ্টা করা হয় তখন আর বিছানো সব কিছুকে বোঝানো হয় না। বাংলায় আমরা যাকে গালিচা বলি কার্পেট বলতে সেই গালিচাকেই বোঝানো হয়। বিচিত্র রঙের তুলার সূতা, পশমি সূতা, রেশমি সূতায় তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের গালিচা বা কার্পেটকেই বোঝানো হয়। এই গালিচা বুণন শিল্প ইরানে বেশ ঐতিহ্যবাহী। বলা যায় ইরানের প্রাচীনতম শিল্পগুলোর একটি হলো কার্পেট তৈরি শিল্প। ইতিহাসের কাল পরিক্রমায় সৌন্দর্য এবং শৈল্পিক বুণন রীতি ও কৌশলের দিক থেকে এই শিল্পটি ইরানে ধীরে ধীরে উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করতে করতে এখন চরম শিখরে উপনীত হয়েছে। এ নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো খানিক মিউজিক বিরতির পর।

ইরানি কার্পেট

 

বলছিলাম ইরানে কার্পেট শিল্পের ক্রম উন্নয়ন ও অগ্রগতির কথা। এই উন্নতির কথা বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এবং ভ্রমণবিদরাও তাঁদের লেখায় উল্লেখ করে গেছেন। তাঁরা ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে যে গালিচা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে সে বিষয়েও ইঙ্গিত করেছেন। ইরানের আজারবাইজান, ফার্স, খুজিস্তান, ইস্ফাহানসহ বিভিন্ন এলাকায় এইসব কারখানা গড়ে ওঠার কথা উল্লেখ করেছেন। কার্পেট বুণন শিল্পীরা এইসব কারখানায় তাঁদের মেধা, শ্রম ও ভালোবাসার প্রয়োগ করে অসাধারণ এই শিল্পটিকে দিয়েছেন অসামান্য মর্যাদা। বিশ্বব্যাপী আজ তাই ইরানের কার্পেট শিল্পের খ্যাতি অনন্য। গ্রিক ইতিহাসবিদ গাজানফুন তাঁর বইতে একটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছেন: 'ইরানিরা তাদের বিছানা নরম করার জন্য চাদরের নীচে কার্পেট বিছিয়ে দেয়'।

ইরানি কার্পেট

 

এই একটিমাত্র বাক্য থেকেই বোঝা যায় ইরানে গালিচা শিল্পের পরিসর কত বিস্তৃত। সেইসঙ্গে ইরানিদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এই কার্পেট যে অবশ্যম্ভাবী একটি বিষয় তাও অনুমান করা যায় এই বক্তব্য থেকে। কোনো ইরানির ঘরে কার্পেট নেই-এটা ভাবাই যায় না। কার্পেটবিহীন ইরানি বাসা মানেই প্রাণহীন, প্রেমশূন্য একটি জীবন বৈ ত নয়। তার মানে কার্পেট হলো ইরানিদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইরানের প্রাচীনতম শিল্পের প্রতীক হলো কার্পেট। স্বদেশের ঐতিহ্যবাহী সেই কার্পেট ইরানিদের জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে অঙ্গাঙ্গিভাবে।

আগেই বলেই কার্পেট শিল্পটি একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টার অংশ। একাকি এই শিল্পটি গড়ে ওঠে নি। এটি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা অর্থাৎ দলবদ্ধভাবে সম্পাদিত একটি কাজ। সমষ্টির শিল্পবোধ, মেধা, সৃজনশীলতা ও চেষ্টা প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ইরানের জাতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী প্রতীক এই কার্পেট তৈরি হয়েছে। একটি কার্পেট তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা। রঙ করা, নকশা বা ডিজাইন করা, নকশার সফটওয়্যার তৈরি করা, সেই ডিজাইন অনুযায়ী কার্পেট বোণা, হাতে নকশা করা, বুণন করা, তৈরি কার্পেট কোথাও নষ্ট হয়ে গেলে সেটাকে রিপু করা মানে মেরামত করা ইত্যাদি বিচিত্র কাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ জড়িত রয়েছে।

 

ইরানি কার্পেট

একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে যে ঠিক কোন্ সময়টাতে এবং কোন‌্ এলাকার কোন‌্ জাতি সর্বপ্রথম কার্পেট তৈরি করেছিল-‌এই প্রশ্নটির অকাট্য বা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য কিন্তু জানা নেই। এর একটা কারণ হলো যখন কার্পেট তৈরি হয়েছিল তখন মেশিনপাতি ছিল না। বাড়ি কিংবা ঘরের ভেতরে প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ হাতের সাহায্যে কার্পেট বুনেছিল তখন। প্রাথমিক পর্যায়ে তো এখনকার মতো সূতোর ব্যবহার ছিল না কারণ তখন সূতোই আবিষ্কার হয় নি। সে সময় লতাগুল্ম, খেজুর পাতা কিংবা গাছের ছাল বাকলকে পিটিয়ে নরম করে মানুষ বিচিত্র সাজি বা ঝুড়ি তৈরি করতো। পরবর্তীকালে মাদুর জাতীয় জিনিস তৈরি করেছে। তারও অনেক পরে পশুর চামড়া এবং পশম ব্যবহার করে মাদুর বানিয়েছে। মেষ বা দুম্বা জাতীয় পশুকে পোষ মানিয়ে লালন পালন করার মধ্য দিয়ে কার্পেট শিল্পীরা ধীরে ধীরে ওইসব পশুর পশম ব্যবহার করে পশমি কার্পেট নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। #               

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ১২

ট্যাগ

২০১৮-০৪-১২ ১৮:১৮ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য