হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম তথা খ্রিষ্টিয় দশম ও একাদশ শতকের কবি আবুল হাসান আলী ইবনে জুলুগ্ব ফাররুখি সিস্তানি ছিলেন সুলতান মাহমুদ গজনভির রাজ-দরবারের অন্যতম বড় কবি।

ব্যক্তি বিশেষের প্রশংসাসূচক কবিতা লেখার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তার জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ খুব একটা স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হয় ফাররুখি জন্ম নিয়েছিলেন হিজরি চতুর্থ শতকের শেষের দিকে। কারো কারো মতে হিজরি  ৩৭০ সন মোতাবেক ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তার জন্ম হয়েছিল সিস্তান অঞ্চলে। আর তিনি মারা যান গজনিতে খুব সম্ভবত হিজরি ৪২৯ সন মোতাবেক ১০৩৮ বা ১০৩৯ খ্রিস্টাব্দে। কবি নিজামি আরুজির ভাষ্য অনুযায়ী ফাররুখি খুব সুন্দর সুন্দর কবিতা বলতেন ও ‘চাঙ্গ’ নামক বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। ফাররুখি গজনির সুলতান মাহমুদের রাজ-সভার অন্যতম কবি ছিলেন। গজনির সুলতানদের গুণ-কীর্তন ছিল তার কাজ। গজনভি বংশের সুলতান মাসউদের পরের কোনো সুলতানের  প্রশস্তি দেখা যায়নি ফাররুখির কাব্যে। সুলতান মাসউদ মারা গিয়েছিলেন ৪৩২ হিজরিতে। তাই এটা স্পষ্ট যে ফাররুখি সুলতান মাসউদের আগেই মারা গিয়েছিলেন।

বিশিষ্ট ইরানি কবি আবুল হাসান ফাররুখি সিস্তানি

 

ফাররুখির বাবা ছিলেন সিস্তানের  সাফ্ফারিয়ান বংশের শেষ আমির খালাফ ইবনে আহমাদের অন্যতম দাস। ফাররুখি যৌবনে নানা বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন। যৌবনে বাদ্য-যন্ত্র বাজাতেও তিনি দক্ষতা অর্জন করেন।  অর্থ সংকট তাকে নিয়ে এসেছিল সিস্তানে। সে সময় চোগানিয়ান রাজ্যের শাসক নিজ দরবারে লেখক ও কবিদের বিশেষভাবে সমাদর করতেন। ফাররুখিও সুযোগ বুঝে তার কাছে যান। এখানে তিনি দুই বছর ধরে ব্যক্তির প্রশংসাসূচক কবিতার চর্চা করেন। এরপর তিনি গজনির  সুলতান মাহুমুদের রাজ-দরবারের কবি হন।  সুললিত কবিতা ও সঙ্গীত চর্চা করে ফাররুখি এখানে বিপুল অর্থ ও বিত্তের অধিকারী হন।

ফাররুখি সুলতানের খুব ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হয়ে পড়ায় সফরে ও রাজ-দরবারে নিয়মিত তার সঙ্গে থাকতেন। সুকণ্ঠের অধিকারী ফাররুখি খুব ভালভাবে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। আর এসব বিষয় তার কবিতাকে আরও সুন্দর করত। ফাররুখির কবিতার ছন্দের মিল ও শব্দের শ্রুতিমধুরতা ছিল খুবই মনোহর। মধুর সম্ভাষণ ও আকর্ষণীয় ভঙ্গির প্রশংসা ছিল  তার কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য।

রাজা ছাড়াও আমির-ওমরাহ, মন্ত্রী ও বড় ধরনের সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশংসাসূচক বহু কবিতা লিখেছেন ফাররুখি।  তিনি প্রায় ২৫ ব্যক্তির জন্য এ ধরনের কবিতা লিখেছেন। আর গজনভী শাসনামলের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের প্রশংসা করে ফাররুখি ৪৫টি কাসিদাও লিখেছেন।

ফাররুখি ইরানের অন্য অনেক বড় কবির বিপরীতে বিশেষ কোনো সামাজিক লক্ষ্য অনুসরণ করতেন না। নিজ যুগের মানুষের অবস্থা নিয়ে তিনি কখনও কোনো আগ্রহ দেখাননি। যেমন, গজনভী শাসনামলে কৃষক ও সাধারণ পেশার জনগণকে খুব বড় অংকের কর দিতে হত। আর সুলতান মাহমুদ এই বিপুল অংকের করের আয়কে ব্যয় করতেন দেশে দেশে সেনা অভিযান পরিচালনার কাজে, কিংবা সরকারি কোষাগারে জমা থাকত করের আয়। আর কখনও কখনও এই আয়ের এক বড় অংশ পুরস্কার বা ভাতা হিসেবে দেয়া হত দরবারি কবিদেরকে। কিন্তু ফাররুখি এই জুলুমের বিরুদ্ধে বা জনগণের অন্য কোনো সমস্যার দিকে কখনও নজর দেননি। তার কবিতা ও সাহিত্যে এইসব বিষয়ের কোনো প্রভাবও দেখা যায় না।

আসলে গজনভী শাসনামলে দরবারি কবিদের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। আর এই কবিদের  তৎপরতা  ছিল কেবলই আমির-ওমরাহর গুণ-কীর্তন। তাই এ যুগের কবিতায় নৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে খুব কমই বক্তব্য এসেছে। অন্য কথায় এ যুগের কবিদের কবিতা ছিল কেবল রাজা-বাদশাহ ও আমির-ওমরাহদের কাহিনী-কেন্দ্রীক। ফলে এসব সাহিত্য কেবল শাসকদের জীবন- ইতিহাসের উৎস হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। আর ফাররুখির কবিতাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তার কবিতার প্রায় দশ হাজার পংক্তির সবই ছিল রাজা-বাদশাহ আর আমির-ওমরাহ’র গুণ-কীর্তন মাত্র।

ফাররুখির জীবন ও সাহিত্যের সমালোচনা হিসেবে তার দরবার-নির্ভরতাকে যতই দায়ী করা হোক না কেন তার কাসিদাগুলোকে ইরানের শ্রেষ্ঠ কাসিদা বলে মনে করা হয়।

ফাররুখির প্রায় দশ হাজার পংক্তির কবিতার  মধ্যে কাসিদা ছাড়াও রয়েছে কিছু গজল, চতুর্পদী কবিতা ও মিশ্র-ছন্দের কবিতা। দরবারি এই কবি তার বেশিরভাগ কাসিদাই লিখেছেন রাজ-দরবারে থেকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ফাররুখির কাসিদাগুলো একদিকে যেমন প্রাঞ্জল ও সহজ-সরল তেমনি তাতে রয়েছে কোমল প্রশান্ততা ও সুদৃঢ় আবহ। সাধারণ বিষয়কে প্রাঞ্জল, সুমিষ্ট ও ঝরঝরে ভাষায় বর্ণনার দিক থেকে ফাররুখিকে সাদি’র সমপর্যায়ের দক্ষ কবি বলে মনে করা হয়। সাদির গজল আর ফাররুখির কাসিদা এ দিক থেকে একই পর্যায়ের।

ফাররুখির গজলগুলোতেও রয়েছে সূক্ষ্মতা ও কোমলতা। তার গজলগুলো যেন যৌবনের প্রফুল্লতায় ভরপুর। এসব গজল যে আনন্দময় পরিবেশে লেখা হয়েছে তা সহজেই গজলের ভাষা ও সুর থেকে ফুটে ওঠে। তার গজলের ভাষা কবির প্রকাশ-ক্ষমতা ও কল্পনা-শক্তির নান্দনিক দক্ষতার উচ্চ মাত্রাকে তুলে ধরে। ফলে গজলের ভেতরে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে অতিরঞ্জিত প্রশংসা থাকলেও পাঠক বা শ্রোতা কবির প্রকাশ-ভঙ্গীর দক্ষতায় সৃষ্ট নান্দনিকতায় ডুবে যান এবং কবির কল্পনা-শক্তির উচ্চ-ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে যান।

ফাররুখির কবিতার সরল ও প্রাঞ্জল ভাষা কবি রুদাকি ও শহীদ বালখির কবিতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এ দুই কবি ছিলেন ফাররুখির আগের যুগের কবি। তাদের ভাষার ভঙ্গি প্রভাব ফেলেছে ফাররুখির ওপর। তিনি তার এই পূর্বসুরিদের ভাষার প্রাঞ্জলতা ও সরলতাকে পছন্দ করতেন। কিন্তু বিষয়বস্তু নির্বাচনে ফাররুখির নিজস্ব শক্তি ও দক্ষতার কারণে তার কবিতার ওপর অতীতের এই দুই কবির প্রভাব সহজেই বোঝা সম্ভব হয় না বলে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩০

২০১৮-০৪-৩০ ১৬:২২ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য