সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সহযোগিতায় মুসলিম সমাজেও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার স্বীকৃতি নেই।

মুসলমানের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি কাজের জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর প্রভাবে এখন অনেক অপসংস্কৃতিই মুসলিম যুবসমাজের কাছে সহনীয় হয়ে যাচ্ছে। বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের মতো নানা পশ্চিমা আচার-আচরণ ইসলামি সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগত নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছে। অতীতের সব গণমাধ্যমের বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করার পাশাপাশি নতুন নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে এই জগত। তবে তা নিষ্কন্টক নয়। ভার্চুয়াল জগতের একটি আকর্ষনীয় দিক হলো, এখানে বাস্তবিক অর্থে কোনো বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা করতে হয় না। প্রয়োজনে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই সব কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার নির্দিষ্ট কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করলেও বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে তা এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় এ জগতে। এর মধ্যদিয়ে একজন ইউজার মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে স্বস্তি লাভ করতে সক্ষম হন। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, ইন্টারনেটে একজন ব্যক্তি স্বাচ্ছন্দে নতুন এক পরিচিতি গড়ে তুলতে পারে এবং এর ফলে তার মধ্যে নতুন ধরণের সুখানুভূতি জাগ্রত হয়। তবে বাস্তবতা হলো, ভার্চুয়াল জগতে একজন ব্যবহারকারী যে স্বাধীনতা ভোগ করেন এবং সুখানুভূতিতে আপ্লুত হন, তা আসলে প্রকৃত সুখ ও স্বাধীনতা নয়।

ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই নিজের সঠিক পরিচয় গোপন করেন এবং নিজেকে বড় কোনো ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশ করেন। গবেষকরা বলছেন, এ ধরনের কাজের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছেন। এটা ঠিক যে, অনলাইনে নিজের নানা তথ্য গোপন করে সহজেই নিজেকে বড় হিসেবে প্রকাশ করা যায় এবং এর মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতের অনেকের কাছে সম্মানও পাওয়া যায়। কিন্তু এ ধরনের কাজ মানসিক চাপ ও বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করে।  আর এই বাড়তি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ, নানা রোগ সৃষ্টি করতে পারে। সামাজিকভাবেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমরা সাধারণত বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারি না।

 

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব তাসমানিয়ার গবেষক র‌্যাচেল গ্রিভ ও জারাহ ওয়াটকিনসন তাদের গবেষণাপত্রে জানিয়েছেন, ফেসবুকে নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা উচিত। এর ফলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং মানসিক চাপ কম থাকে। নিজের সঠিক পরিচয় প্রকাশ করা হলে আত্মবিশ্বাস যেমন বাড়ে তেমন ইতিবাচক মানসিকতাও গড়ে ওঠে এর মধ্যদিয়ে মানসিক শান্তিলাভ করা যায়। ওই দুই গবেষকের মতে, নিজের প্রকৃত অবস্থা পাল্টে ফেললে তা উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশান্তি কমে যায়। এতে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিও তৈরি হয়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা নিজের পরিচয় গোপন রাখতে পারে বলে সহজেই যে কাউকে হুমকি দিতে পারে। ভুয়া সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য ধারণ করে বিভিন্ন অনলাইন সাইটে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ অনায়াসেই করতে পারে পরিচয় গোপনকারী অপরাধীরা। পরিচয় গোপন করার ফলে অপরাধপ্রবণতাও বাড়ে অনেকের মধ্যে।

 

ইন্টারনেটের ভালো ও মন্দ দু'টি দিকই রয়েছে। তবে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। অনেক অভিভাবকই ইন্টারনেট সম্পর্কে অজ্ঞ হওয়ায় এ ধরণের নিয়ন্ত্রণহীনতা দিনে দিনে বাড়ছে। শিক্ষার পরিবর্তে কখনো কখনো কুশিক্ষা গ্রহণ করছে। শিশু-কিশোরদের একটি প্রবণতা হলো নিজেকে প্রকাশ করা এবং অন্যকে অনুসরণ করা। আত্মপ্রকাশ ও অনুসরণের প্রবণতা তাদেরকে কৌতূহলপ্রিয় করে তুলে। কৌতূহলের বশে তারা নতুন কিছু জানতে চায়, শিখতে চায়। এ স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্খাকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে হবে। আর তাহলেই ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ জীবনে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে সফল মানুষ হতে পারবে। এর বিপরীতে শিশু-কিশোর বয়সে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ না করলে এবং পুরোপুরি তার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিলে  তারা নানাবিধ অন্যায়-অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি। শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেটে কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলছে এ বিষয়ে মাতা-পিতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে খোঁজ-খবর রাখতে হবে। 

শিশুরাই হচ্ছে গোটা বিশ্বের ভবিষ্যৎ কর্ণধারআর তারাই যদি ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে বিপথে পরিচালিত হয়, তবে তা গোটা বিশ্বকেই গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। আসলে কোনো মানুষই অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে মানুষের আবেগও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না করলে মাতা-পিতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অজান্তেই তারা ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হতে পারে।

পার্সটুডে/সোহেল আহম্মেদ/মো: আবুসাঈদ/ ৩  

ট্যাগ

২০১৮-০৫-০৩ ২০:৫০ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য