গত দুই আসরে আমরা বলেছি, নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র হিসেবেও মসজিদের ভূমিকা অনন্য। এখানে মুসল্লিরা পরস্পরের খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি দেশ ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে মতবিনিময় করেন।

আজকের আসরের প্রথম অংশে আমরা মসজিদের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করব। আর শেষাংশে ইরানের ইস্পাহান নগরীর ইমাম মসজিদকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার শুরুতে মসজিদকে মুসলমানদের প্রধান সমাবেশস্থল হিসেবে ঘোষণা করেন।  তিনি মদীনায় প্রবেশ করেই মসজিদে নববী নির্মাণের নির্দেশ জারি করেন এবং নিজে এটির নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করেন। ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই মসজিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নামাজ আদায় ছাড়াও এখানে আরো যেসব কাজ হতো সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ইসলামি শাসনকাজ পরিচালনা, বিচারকার্য সম্পাদন, ইসলামি বিধিবিধানের শিক্ষাকেন্দ্র এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের সমাবেশস্থল। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ইসলাম আবির্ভাবের পর থেকেই মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত উভয় ক্ষেত্রে মসজিদের একটি নিয়ামক ভূমিকা ছিল। ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে আমরা এ বিষয়টির সত্যতা উপলব্ধি করতে পারি।  মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বহু ঘটনা এই মসজিদে বসে ঘটেছে এবং খোদাদ্রোহী শাসকদের বিরুদ্ধে বহু বিদ্রোহ এই মসজিদ থেকেই শুরু হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লব ছিল এর উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ।

 

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের দিনগুলোতে বিপ্লব পরিচালনার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।  এ সম্পর্কে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক হামিদ আলগার বলেন, “ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তিই ছিল মসজিদ। এই বিপ্লবে মসজিদ আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পায় এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগের মতো মুসলমানদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে ভূমিকা পালন করতে থাকে। অন্যান্য সমাজে মসজিদকে দুনিয়াবি তৎপরতা থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিরত থেকে শুধুমাত্র নামাজ আদায় ও ধর্মীয় মাসলা-মাসায়েল শোনার স্থানে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবে সরকার বিরোধী গণজাগরণের কমান্ডিং পোস্ট হিসেবে মসজিদ ব্যবহৃত হয়েছে।  মোদ্দা কথা, বিশ্বনবী (সা.)’র যুগে মসজিদ যেসব ভূমিকা পালন করত ইরানের ইসলামি বিপ্লবে তার সবগুলো ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এই পবিত্র স্থান। ”

ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের মাধ্যমে ইরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মসজিদকে আরো কার্যকরভাবে এসব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। মসজিদগুলোতে আলেমগণ তাদের মূল্যবান বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে বিদ্যমান দুর্নীতি, জুলুম, বৈষম্য এবং অন্যায়-অবিচার সম্পর্কে জনগণকে সজাগ করে তোলেন। তখনো বিপ্লব পরবর্তী নতুন সরকার সমাজ থেকে এসব অপকর্ম পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।  স্বৈরাচারী শাহ সরকার বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে যেমন মসজিদ কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে তেমনি বিপ্লব পরবর্তী সময়ে মানুষকে তাদের নৈতিক ও চারিত্রিক ভুলগুলো সংশোধনের সুযোগ করে দিয়েছে এই মসজিদ।  সাধারণ মানুষ মসজিদের মাধ্যমে নিজেদের ইসলামি পরিচিতি সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছে।

 

 

এ বিষয়টি শুধু ইরানে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা অন্যান্য মুসলিম দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।  উদাহরণ হিসেবে ফিলিস্তিনি জনগণের কথা উল্লেখ করা যায়। তারা দীর্ঘদিন ইহুদিবাদীদের হাতে নিপীড়ন-নিষ্পেষণের শিকার হওয়ার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দখলদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে; নিজেদের অধিকার আদায়ের প্রত্যয় জেগেছে তাদের মধ্যে।  মসজিদকেন্দ্রীক তৎপরতার মাধ্যমেই ফিলিস্তিনিরা ইহুদিবাদীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছে।  তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে যে, আমেরিকা বা ইসরাইলের মতো বৃহৎ শক্তিও অপরাজেয় নয়।

তো বন্ধুরা, শুরুতেই যেমনটি বলেছিলাম আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরানের ইস্পাহান শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইমাম মসজিদকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।  ইরানে সাফাভি রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত এই মসজিদটি অতীতে শাহ মসজিদ, নয়া সুলতানি মসজিদ এবং জামে আব্বাসি মসজিদ নামেও পরিচিত ছিল। হিজরি একাদশ শতাব্দির ইসলামি স্থাপনার নির্মাণশৈলি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এই মসজিদে।  হিজরি ১০১৯ সাল মোতাবেক ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ইরানি শাসক শাহ আব্বাস সাফাভির নির্দেশে ইস্পাহানের ঐতিহাসিক নাকশে জাহান চত্বরের দক্ষিণ প্রান্তে এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।  ১০২৫ হিজরিতে মসজিদটিতে স্থাপিত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, শাহ আব্বাস নিজের ব্যক্তিগত হালাল সম্পদ থেকে দেয়া অর্থ দিয়ে এই মসজিদ নির্মাণ করেন এবং এর সওয়াব বখশিশ করেন নিজের পিতা শাহ তাহমাসেব-এর আত্মার ওপর। শুরু থেকেই মসজিদটি শাহ ও তার পারিষদবর্গের পাশাপাশি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

 

 

অনিন্দ্য সুন্দর বিশাল এই মসজিদটিতে সাদামাটা আধ্যাত্মিক পরিবেশ বজায় রাখা হয়েছে। এর ভেতরে বিশিষ্টজনদের জন্য আলাদা কোনো স্থান সংরক্ষণ করা হয়নি। যেকোনো কেউ যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। সেইসঙ্গে মসজিদে অনুষ্ঠিত কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শাহ’সহ তার যত বড় পারিষদই উপস্থিত থাকুক না কেন তাদের জন্য বিশেষ কোনো উঁচু স্থান বা দেয়াল ঘেরা জায়গা রাখা হয়নি। তারা সাধারণের সঙ্গে মিলেই এখানে ইবাদত বন্দেগি করতেন।  এটি ঠিক যেন সেই ইসলামের প্রাথমিক যুগের একটি মসজিদ। ইমাম মসজিদে প্রবেশের মূল দরজা নাকশে জাহান চত্বরের দিকে স্থাপিত। কিন্তু কিবলার সঙ্গে সমন্বয় করে এই দরজা এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে, এটি দিয়ে প্রবেশ করার পর মুসল্লিরা বুঝতেই  পারেন না যে, তারা ৪৫ ডিগ্রি কোণ ঘুরে মসজিদে প্রবেশ করেছেন।

 

ইমাম মসজিদের এই মূল ফটকের দুই পাশে শোভা পেয়েছে সুউচ্চ দু’টি মিনার। এই ফটকের বহির্ভাগে সুদৃশ্য ডিজাইনে বসানো হয়েছে চমৎকার কারুকাজসমৃদ্ধ টাইলস। এগুলোর উপরে বেশ কয়েকটি রং ব্যবহার করে আঁকা হয়েছে গাছা-পালা ও লতাপাতাসহ নানা প্রাকৃতিক দৃশ্য। মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিম কোণে রয়েছে দু’টি ছাদযুক্ত বারান্দা। পূর্ব প্রান্তের বারান্দাটি বড় হলেও এখানকার দেয়ালে তেমন কোনো কারুকাজ চোখে পড়ে না। তবে পশ্চিম প্রান্তের বারান্দাটি চমৎকার সাত রঙের টাইলস বসিয়ে একটি দর্শনীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া, এই বারান্দার মেহরাবটি ইস্পাহানের অন্য সব মসজিদের তুলনায় স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

 

মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে দু’টি মাদ্রাসা। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত মাদ্রাসার নাম নাসেরি মাদ্রাসা যার মধ্যে তালেবুল এলমদের থাকার জন্য রয়েছে ছোট ছোট কক্ষ। আর অন্য মাদ্রাসাটির নাম সোলায়মানিয়া মাদ্রাসা। মসজিদের দক্ষিণ প্রান্তের উন্মুক্ত কিছু অংশে সুউচ্চ ছাদ রয়েছে যার উচ্চতা ৩৩ মিটার। এই অংশের দুই পাশের দু’টি মিনারের প্রতিটির উচ্চতা ৪৮ মিটার।

ইস্পাহানের ইমাম মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এটির মূল গম্বুজের নীচে যেকোনো শব্দের প্রতিধ্বনি।  ৪০০ বছর আগে এই গম্বুজটি এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, এটির ঠিক নীচের যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে খুব আস্তে শব্দ করলেও তার প্রতিধ্বনি অনেক উচ্চস্বরে শোনা যায়। অতীতে মাইক বা লাউড স্পিকার না থাকার কারণে আজান দেয়া এবং ধর্মীয় বক্তৃতা করার জন্য এই স্থানকে ব্যবহার করা হতো। এরকম একটি আশ্চর্যজনক গম্বুজ নির্মাণের ঘটনা গণিত ও পদার্থবিদ্যায়  ইরানি  স্থাপত্যশিল্পীদের গভীর জ্ঞানের বিষয়টি ফুটে ওঠে।

 

তো বন্ধুরা, এরইসঙ্গে শেষ করছি ধরণীর বেহেশত মসজিদের আজকের আয়োজন। আগামী আসরে নতুন কোনো মসজিদকে আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার আশা রইল।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ৫

২০১৮-০৫-০৫ ২০:৫৪ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য