গত আসরে আমরা ইরানের ঐতিহ্যবাহী পণ্য কার্পেট নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে কার্পেট বোণার ইতিহাস এবং এই শিল্পটির সঙ্গে জড়িত জনসমষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করার চেষ্টা করেছি।

কথা অসমাপ্ত রেখেই আসর গুটিয়ে নিতে হয়েছিল সময়ের স্বল্পতার কারণে। তাই আজকের আসরেও আমরা ইরানের ঐতিহ্যবাহী এই পণ্যটি মানে গালিচা বা কার্পেট নিয়েই কথা বলার চেষ্টা করবো। বলেছিলাম যে ইরানি গালিচার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। আগে ছিল হাতে বোণা কার্পেট। এখন হাতে বোণার কার্পেটের পাশাপাশি মেশিনে তৈরি কার্পেটও ব্যাপকভাবে উৎপাদন হচ্ছে। ইরানি কার্পেট কেবল একটি পণ্যই নয় এটি একটি শিল্প, সৃজনশীল শিল্প। ইরানের কার্পেট শিল্প দেশের ইতিহাসের মতোই বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজও তার অস্তিত্ব সগর্বে ঘোষণা করে যাচ্ছে। আরেকটু অগ্রসর হয়ে বরং বলা ভালো বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে, আধুনিকতার স্পর্শে এই কার্পেট এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শৈল্পিক এবং নান্দনিক হয়ে উঠেছে। চলুন ঐতিহাসিক এই ইরানি শিল্পটি নিয়ে আজকের আসরেও খানিকটা কথা বলা যাক। আপনারা আমাদের সঙ্গেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।             

ইরানের কার্পেট শিল্পের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। অন্তত কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই ইরানে কার্পেট তৈরি হয়ে আসছে। কালের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কার্পেটের রঙ এবং ডিজাইনসহ বুননেও এসেছে পরিপূর্ণতা ও বৈচিত্র্য। একটু আগেই বলেছি যে ইরানের জাতীয় ইতিহাসের বহু উত্থান পতনের মতো এই কার্পেট শিল্পের ইতিহাসেরও রয়েছে চড়াই উৎরাইময় ইতিহাস। তারপরও এই কার্পেট এখনও সগৌরবে তার ঐশ্বর্য তুলে ধরছে দেশে এবং দেশের বাইরে। কার্পেট ডিজাইনার এবং বিশিষ্ট লেখিকা মিসেস শিরিন সুরে ইস্রাফিলের ভাষ্য অনুযায়ী: "ইরানি কার্পেটের মৌলিক ডিজাইনগুলো বিশেষ করে যেগুলো ইরানের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত সেগুলো কোনোদিনই পুরোনো হবে না কিংবা নিশ্চিহ্ন হবে না। ইস্ফাহানের মসজিদের ফিরোজা রঙের গম্বুজের নকশা, পাথরের ডিজাইন কিংবা পার্সপোলিসের পিলারগুলো অথবা রেজা আব্বাসির ঐতিহ্যবাহী মিনিয়েচার শিল্পগুলোর ওপর যেমন কোনোদিন প্রাচীনত্বের ছাপ পড়বে না"।

 

ঐতিহাসিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি,জলবায়ু, নতুন নতুন উদ্ভাবনী, সৃজনশীলতা ইত্যাদি কার্পেটের মতো আরও বিচিত্র শিল্প সৃষ্টিতে ইরানি শিল্পীদের প্রেরণা জুগিয়েছে। তার মানে কার্পেটের ডিজাইনে উঠে এসেছে প্রাচীন ইতিহাস, বোধ বিশ্বাস, আচার প্রথা,সংস্কৃতি ও সমাজের চিত্র। ইরানের কার্পেটগুলোকে মূল্যায়ন করতে গেলে চারটি বিষয় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষণীয়। ঐতিহ্যবাহী এবং স্থানীয়, প্রাকৃতিক এবং ভেষজ রঙের ব্যবহার, কারিগরি দিক এবং এগুলোর গুণগত মান এবং ইরানি কার্পেটের বুণন কৌশল। রঙের দিক থেকেও ইরানি কার্পেট অসাধারণ। কার্পেটের সূতাগুলো স্বয়ং রঙীন হতে পারে আবার রং করাও হতে পারে। স্বয়ং রঙীন সূতাগুলোতে রঙ লাগানো হয় না। কিন্তু রং করা কার্পেটে রঙীন যেসব সূতা ব্যবহার করা হয় সেইসব রঙের উৎস ভেষজ,খনিজ কিংবা রাসায়নিকও হতে পারে।

উল্লেখ্য যে খ্রিষ্টিয় বিশ শতকের প্রাথমিক পর্ব পর্যন্ত ইরানে রং করার ব্যবস্থাটা প্রাকৃতিকই ছিল। কারণটা হলো ইরানের বিভিন্ন এলাকার আবহাওয়া প্রাকৃতিক রঙের ব্যবস্থার অনুকূল ছিল এবং ইরানের বিভিন্ন এলাকায় বিচিত্র উদ্ভিদ ছিল সহজলভ্য। তাছাড়া সমগ্র ইরানের বনাঞ্চলগুলোতেও বিচিত্র জন্তু-জানোয়ারের বাস ছিল। আল্লাহর দেওয়া এইসব প্রাকৃতিক দান বা নিয়ামতের পাশাপাশি ইরানে খনিজ সম্পদের মজুদও বেশ সমৃদ্ধ। রঙ শিল্পী এবং বিশেষজ্ঞদের জন্য এইসব দান-নিয়ামত তাদের প্রতিভাকে কাজে লাগানোর একটা সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তারা তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় রঙ তৈরি করে কার্পেটসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন। নি:সন্দেহে ইরানি কার্পেটের গুণগত মানের একটি কারণ হলো কার্পেটের সূতোয় যথাযথভাবে রং করার নৈপুণ্য।

রঙের কাজের বিশেষজ্ঞগণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেখা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত কমপক্ষে তিন হাজারের মতো রঙ তৈরি করা হয়েছে ইরানে। ইরানের ইয়াজদ, কাশান এবং ইস্ফাহান শহরের মতো আরও অনেক শহরে এখন অসংখ্য ডাইং হাউজ রয়েছে। এই ডাইং হাউজগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে এবং ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া হাতের সাহায্যেও রং তৈরি করা হয়ে থাকে। মজার বিষয় হলো, বর্তমানে রাসায়নিক উপায়ে তৈরি রঙের মজুদ সত্ত্বেও কার্পেট শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী মানে প্রযুক্তির ব্যবহারহীন প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি রঙের ব্যবহার করছেন।

তাবরিজের গালিচা

 

ইরানের ঐতিহ্যবাহী কার্পেটের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর ডিজাইন। গালিচা বুণন শিল্পের বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে ইরানি কার্পেটগুলোকে নকশা ও ডিজাইনের ভিত্তিতে ১৯ ভাগে স্তরবিন্যাস করা যেতে পারে। শাহ আব্বাসি ডিজাইন, ইসলামি ডিজাইন, শিকারের স্থান, উপজাতীয়, জ্যামিতিক ডিজাইন, পুরাতাত্ত্বিক ডিজাইন, ঐতিহাসিক ভবন ডিজাইন ইত্যাদি ডিজাইন এই স্তরবিন্যাসের অন্তর্ভুক্ত। একটি কার্পেটে এ ধরনের একাধিক ডিজাইনেরও ব্যবহার হতে পারে। যেমন শাহ আব্বাসি ডিজাইনেরই বেশ কয়েকটি মডেল রয়েছে। লতাগুল্মের যে ডিজাইনগুলো শাহ আব্বাসি ফুল নামে পরিচিত সেই ডিজাইনগুলো এরকম একাধিক মডেলের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে।#

 

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ৮

২০১৮-০৫-০৮ ২০:০৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য