আমরা গত আসরে সদাচার এবং প্রফুল্ল থাকার ইতিবাচকতা সম্পর্কে কথা বলেছিলাম। বলা হয়েছে, সদাচার হলো আলোকরশ্মির মতো। ওই আলোকরশ্মি ব্যক্তির নিজের পাশাপাশি সঙ্গী-সাথীসহ আশেপাশের ওপরও আলো ছড়ায়। প্রকৃতপক্ষে সুন্দর ও কল্যাণময় আচরণ কেবল যে ব্যক্তির নিজেকেই আনন্দময় করে তোলে তা নয় বরং পরিবারের অপরাপর সদস্যাকেও সেই আনন্দ উপহার দেয়।

সদাচারের পর আজ আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো সত্যবাদিতা নিয়ে। সত্য কথা বলা, সৎ থাকা ইত্যাদি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপায়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে কেউ যদি সত্যবাদী হয়, সদাচারী হয় সে অবশ্যই অসংখ্য উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর ঝামেলা থেকে মুক্তি পায়। এর কারণ হলো বেশিরভাগ দু:খ-কষ্ট আর ঝামেলার উৎস হলো মিথ্যা এবং অহমিকা। সুতরাং সত্যবাদিতাই জীবনের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের নিয়ামক শক্তি। আজকের আসরে আমরা এই সত্যবাদিতার ইতিবাচকতা নিয়ে আরও কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

 

একত্রে জীবনযাপন মানে সহাবস্থানের রীতিনীতি মেনে চলা এবং অপরকে মূল্যায়ন করা-এগুলোকে উন্নত মানবিক চরিত্রের গুণাবলি বলে মনে করা হয়। এইসব গুণাবলি মানবীয় মর্যাদা এবং ব্যক্তির অনন্য স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক। এ ধরনের উন্নত গুণাবলি সম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক বেশ গভীরে উন্নীত হতে পারে। ব্যক্তির এই গুণাবলির প্রভাব কিন্তু কর্মক্ষেত্রের মধ্যেই নয় সীমিত নয় বরং তার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ফলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের সকল পর্যায়েই সেই প্রভাব শক্তিশালী ও দৃঢ়তার সাথে বিস্তৃতি পায়। আর এই উন্নত মানবীয় গুণাবলির ভিত্তি হলো 'সততা ও ন্যায়পরায়ণতা'।

 

 

সততা মানে হলো অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ও কাজ-কারবারের ক্ষেত্রে যথার্থ ও সত্য কথা বলা, সঠিক কাজটি করা। মনোবিজ্ঞান গবেষণায় দেখা গেছে নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তি যদি সত্য বলে তাহলে তার প্রভাব অন্যদের ওপর ব্যাপকভাবে পড়ে। বিশেষ করে শ্রোতা ভাবে বক্তা তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানে তাদেরই একজন। এ ধরনের আন্তরিক একটা যোগাযোগ ও সম্পর্ক খুব সহজেই গড়ে ওঠে। সততার কারণেই এই সম্পর্ক বা ভালো লাগার বিষয়টি বক্তার ওপর শ্রোতাদের আনমনেই ঘটে যায়। কিন্তু এই সততার পরও যদি কোনো শ্রোতা বক্তার কথা গ্রহণ না করে এবং তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখে তাহলে বুঝতে হবে ওই লোকেরা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উপযোগী নয় এবং তাদের উপস্থিতির চেয়ে উপস্থিত না থাকাই উত্তম।

বর্তমানে সততাকে মানসিক সুস্থতার একটি মাপকাঠি হিসেবে মনে করা হয়। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সততা মানুষকে বিচিত্র দু:খ-কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়। কারণটা হলো মিথ্যা এবং অহমিকা বহুরকমের বিরক্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়। জীবনে হাসি-খুশি,আনন্দ ও সাফল্যের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় এই অসততা। এই সত্য উপলব্ধি করার জন্য নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আপনি যখন টেলিভিশন দেখতে বসেন এবং হাস্যরসাত্মক অনুষ্ঠান,নাটক কিংবা আপনার প্রিয় কোনো পারিবারিক সিরিয়াল দেখতে বসেন, তখন আপনি আপনার মনোযোগ খানিকটা যদি বাড়িয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন ফিল্মে বা সিরিয়ালে যত সমস্যা দেখানো হচ্ছে, সেগুলো এমন কারো আচরণ থেকে উৎপত্তি হয়েছে যিনি বা যারা সততার নীতিমালাগুলো মেনে চলেন নি।

 

যার অসততার কারণে ওই সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে তার অসততার পরিমাণ কত বেশি কিংবা মাত্রা কতোটা ছোট বড় তা দেখে লাভ নেই। শুধু অততার কারণে যে ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে হয়েছে সেদিকে নজর দিন,দেখবেন আপনি বিস্মিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাবেন। এই সিদ্ধান্তে আপনি উপনীত হতে বাধ্য হবেন যে যদি সত্যিই কোনোরকমের অসততা কিংবা মিথ্যা বা অহমিকার অস্তিত্ব না থাকতো তাহলে কোনো ধরনের ড্রামা বা নাটক তৈরিই হত না। পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে সততা মানুষের প্রকৃতি ও স্বভাবের অনুগামী। মানুষের পবিত্র আত্মা ও স্বভাবই বাধ্য করে সুস্থ স্বাভাবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে। অন্তর ও মুখের অভিন্নতা এবং ভেতরে-বাইরে এক হতে। সেইসাথে যা সে বিশ্বাস করে তাই মুখেও উচ্চারণ করতে। তার মানে মুখে এক কাজে আরেক-এরকম যেন না হয়।

কথায় কাজে অন্তরে বাইরে এক ও অভিন্ন হবার কথা বলছিলাম আমরা। পবিত্র কুরআনের সূরায়ে যমারের ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:'আর যে ব্যক্তি তার সঙ্গে সত্য নিয়ে এসেছে এবং যারা তাকে সত্য ও ন্যায় বলে মেনে নিয়েছে তারাই প্রকৃত পরহেজগার'।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনদেরকে তাকওয়ার দিকে আহ্বান করার পাশাপাশি সত্যবাদীদের সহযোগী হবারও আহ্বান জানিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সহযোগী হও'।

সুতরাং সত্যবাদিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আল্লাহ সত্যবাদীদের সঙ্গে রয়েছেন। আমরাও যেন সর্বাবস্থায় সততার চর্চা করতে পারি, সত্যবাদীদের সহযোগী হতে পারি-সেই তৌফিক কামনা করে পরিসমাপ্তি টানছি আজকের আসরের।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/ ১০

২০১৮-০৫-১০ ১৫:৫৭ বাংলাদেশ সময়
মন্তব্য